বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।
এখন সামার ভ্যাকেশন চলছে তাই কিছুদিনের জন্য দেশে আসছে ওরা। ওদেশে যাওয়ার পর আর আসা হয়নি। সব গুছোতে আর সায়নের কাজের চাপেই কেটে গেছে এই কয়েকটা বছর।প্রায় তিন বছর বাদে দেশে ফিরছে ওরা। মা তো ফোন করেই কান্নাকাটি করে আজকাল,অথচ প্রতিদিনই ভিডিও কলে কথা হচ্ছে। পিউলের ভ্লগগুলোও দেখে মা,তারপরেও মায়ের মনখারাপ।
অনেকদিন বাদে দেশের মাটিতে পা রেখে অবাক হয় পিউল,শহরটা আগের থেকে বেশ সাজানো গোছানো। এখানে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে তাই চারদিকে বেশ সবুজ। কদিন মায়ের আদর খেয়ে হইহই করে সময় কাটলো। পিউলি অভিযোগ করল,'মা সারাদিন রান্নাঘরে এত কিছু রান্না কোর না। এত খাচ্ছি যে কী বলব?সব জামাকাপড় ছোট হয়ে যাবে এরপর।'
-' এতদিন বাদে এলি তারপর সায়ন খেতে ভালোবাসে একটু ভালোমন্দ না করলে হয়? আমার দাদুভাই সেও তো খেতে ভালোবাসে। দেখছিস না কেমন সুন্দর চিংড়ি মালাইকারি,ইলিশ সব খাচ্ছে।'
পিউলি হাসে,অবশ্য মায়ের আদর নিয়ে বেশ কিছু কনটেন্ট সে করে ফেলেছে। সবার খুবই পছন্দ হয়েছে। অনেকেই বলেছে মায়ের আদর এক আলাদাই জিনিস। আর কয়েকদিন বাদেই তো জামাইষষ্ঠী। সেদিন কিভাবে সেলিব্রেট করবে তার মোটামুটি একটা প্ল্যানও করে রেখেছে। তারপর কেনাকাটা নিয়ে একটা শর্ট ভিডিও তো বানাবেই।
অবশ্য মা মাঝেমধ্যে বিরক্ত হচ্ছে,' আচ্ছা সারাদিন তো এইসব নিয়েই ব্যস্ত আছিস। আমি তো তোকে কাছেই পাচ্ছি না। মাথার মধ্যে তো একটাই খেলছে রীল আর রীল। জামাই,নাতি আমরা সবাই তো তোর সাবজেক্ট হয়ে গেছি। সেদিনই সুলতা ফোন করে বললো একদিন আসবে চিংড়ি পুঁই পাতুরি খেতে। ইউটিউবে দেখেছে। ভিডিওটা নাকি ভাইরাল হয়েছে।'
'ওসব পাত্তা দিয়ো না একদম। তাহলে কিন্তু মুশকিলে পড়বে। আচ্ছা বলতো জামাইষষ্ঠীতে কী মেনু রাখছো? আমি আগে থেকেই একটা পোস্ট দিয়ে দেব জামাইষষ্ঠী লাইভ নিয়ে আসছি।'
-' তুই তো বলছিস বেশি না রাঁধতে। তাই ভাবছিলাম যা সায়ন ভালোবাসে তেমনি কিছু করব।'
-' মা কিছু আলাদা করো,একদম আলাদা। আর তোমার ঐ কুককে কাজে লাগাবে ওতো ভালোই রান্না করে। দরকারে একটা দুটো পদ ঐ রাখহরি মান্না থেকে আনিয়ে নেওয়া হবে। টেবিলটা কিন্তু একদম ভর্তি থাকবে। আর হ্যাঁ তুমিও একটু সাজবে। মানে সাবেকি রান্না আর সাবেকি সাজ। সেদিন কোন স্লিভলেস পরবে না কিন্তু।'
-' কী ভীষণ গরম! এরমধ্যে সাবেকি সাজ?তোর ভিডিও তুলতে তুলতে তো একদম ঘেমে নেয়ে যাবো।'
-' মা তুমি সত্যি! এর আগে দেখেছি একজনের শাশুড়ি স্লিভলেস পরাতে খুবই ট্রোলড হয়েছিল। লোকগুলোও সেই আদ্যিকালের সাজেই মেয়েদের দেখতে চায়,এমনকি মেয়েরাও।'
যাক সায়নের ব্যস্ততা,ছেলের দুষ্টুমি,মায়ের সাবেকি সাজে অনীহা,বাবার সমালোচনা সব একপাশে সরিয়ে পিউলের জামাষষ্ঠী ভ্লগটা ভালোই হয়ে গেল। যেমনটা চেয়েছিল ঠিক তেমনি হল। বাবা,জামাই,নাতি সবাই ম্যাচিং পরেছে আর মাকে একদম ট্র্যাডিশনাল সাজে সাজিয়ে নিজেও বাঙালী কন্যে ভাইবস্ রেখে সবটা উতরে দিল একদম মাখনের মত। রাতারাতি প্রচুর শেয়ার আর লাইকের বন্যায় আত্মতৃপ্তির ঝুড়ি ভরল পিউলের। রাতে তো ওর ঘুমই হল না ফলোয়ার্সদের রিপ্লাই দিতে দিতে। ভোরের দিকে চোখ বুজলো পিউল। সায়ন প্রথমটায় একটু বিরক্ত হলেও এখন আর কিছু বলে না। মানে পেরেও ওঠে না বৌয়ের সাথে।
বড়লোকের একমাত্র আদুরে সুন্দরী কন্যাকে বকবে এমন বুকের পাটা তার নেই। একটা সময় পিউলিকে পাওয়ার জন্য সব ছেড়েছিল। প্রথমটা বুকের বাঁদিক একটু চিনচিন করলেও পরে অভ্যেস হয়ে গেছে নিজের মধ্যবিত্ত মানসিকতার খোলসকে খুলে ফেলতে।
পরদিন বেশ বেলাতে ঘুম ভাঙলো পিউলির। কাল সারাদিন বেশ ধকল গেছে,আজ একটু রেস্ট নেবে। তবুও মনে মনে ভাবে আজ কী কনটেন্ট ক্রিয়েট করবে? আজ বরং ওর ছোটবেলার পুতুলের সাম্রাজ্য দেখাবে। বিছানার পাশে চার্জ দেওয়া আইফোনটা টেনে নেয় পিউল। কিছুটা সময় ওর বেস্টির সাথে কাটিয়ে উঠবে এখন।
ফোনটা খুলতেই শুভাস্ ডেইলি ভ্লগটা দেখে চমকে ওঠে পিউল। একরাতে কয়েক মিলিয়ন ভিউজ,সাবস্ক্রাইবার বেড়েছে কত উহ্ এত সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কী এমন পোস্ট করেছে?
-ওহ্ বৌমা ষষ্ঠী নিয়ে করেছে। ভক্তরা সব গলে গেছে তাতে। শাশুড়িমায়ের আদরে গদগদ শুভমিতা সেজেগুজে শাশুড়িমায়ের কোলের কাছে বসে ভালোমন্দ খাচ্ছে। কত পদ সাজিয়ে দিয়েছে শাশুড়িমা। তারপর সাধারণ করে পরা সাবেকি সাজে মাথায় ঘোমটা টেনে ওর শাশুড়ি ওকে খাইয়ে দিচ্ছে। আদরের ঘটা দেখে আদিখ্যেতা বলে মনে হয় পিউলের। আজকাল এই এক হয়েছে,এইসব গ্ৰামের ছবি দেখতে লোকে যে কী পছন্দ করে! নাইটি পরে বৌদি পুকুর পাড়ে বসে মাছ কাটছে ওহ্ সবাই বাহ্ বাহ্ করছে।
এইসব বৌমাষষ্ঠীর কথা কোন কালে কেউ শুনেছে? কোন এক লেখিকা একবার এই নিয়ে গল্প লিখলো ব্যাস শুরু আদিখ্যেতা। উহ্ গ্ৰাম,মাটির বাড়ি,পুকুর পাড় ভাবলেই কেমন যেন লাগে পিউলের। মনে পড়ে যায় কিছু পুরোনো কথা। সত্যি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
সে যাই হোক,কিন্তু ওর তো কিছু একটা করা উচিত। কিন্তু কিভাবে? শাশুড়ি তো ওরও আছে। কিন্তু তিনি তো থাকেন সেই...ওহ্ সেই জায়গাটাতে আর ও যেতে চায় না। সায়নও বেশি যাক সেটাও ও চায় না। যদিও আসার পর গাড়ি করে সকালে গিয়ে বিকেলে ঘুরে এসেছে সায়ন। ছেলে বায়না করেছিল যাবো বলে কিন্তু যেতে দেয়নি পিউলি। ঐ গ্ৰামের বাড়িতে কেউ যায় নাকি? আর পিউলি নিজেও চায় না বেশি গ্ৰ্যানি,গ্ৰ্যানি করে মাথা খারাপ করুক ঐ ছেলে।
ওর যখন চারবছর বয়েস তখন দেশ ছেড়েছিল ওরা। আর তখনও তো এই রাজ্যের বাইরে ভিন রাজ্যেই থাকত। পিউলি শ্বশুরবাড়ি গেছে হাতে গোণা দুতিনবার। সায়নকে ওর মেরিট দেখে পছন্দ করলেও ওর বাড়ি আর বাড়ির লোকজনকে পছন্দ হয়নি পিউলের। মা,বাবাও আপত্তি করেছিল তবে ও ভবিষ্যত দেখেছিল আগেই সুতরাং মাকে বুঝিয়েছিল যে শ্বশুরবাড়ির লোকজনে কী এসে যায়? কদিনই বা থাকবে ওখানে? তারপরেই তো হম তুম আর তুম হম।
এমনকি বিয়ের বৌভাতও ওখানে হোক সেটা নিয়েও আপত্তি করেছিল। তবে বেঁকে বসেছিলেন সায়নের স্কুল মাস্টার বাবা,বলেছিলেন যেখানে আজন্ম থেকেছি সেখান থেকেই ছেলে বিয়ে করতে যাবে আর বৌমাও এখানেই আসবে। সায়ন একটু শান্ত প্রকৃতির হলেও ওর বাবার তেজ ছিল ষোলোআনা। পিউলের বাবাও খুব রাগ করেছিলেন। বলেছিলেন,' বড্ড একগুঁয়ে তো লোকটা,অহঙ্কারীও বটে। ছেলেটা ভালো,তুই পছন্দ করেছিস তাই। নাহলে ওদের সাথে আমাদের কিসে যায় শুনি?'
তবে শুনতে হয়েছিল সায়নের বাবার কথাই আর সেইমত সব হয়েছিল। খুব রাগ হলেও সব মানতে হয়েছিল তাই ওদের দাপট দেখে শাশুড়ি আর শ্বশুরবাড়ির প্রতি কোন ফিলিংস ছিল না পিউলের।
শাশুড়ি ভদ্রমহিলা স্বামী অনুগত,কম বয়েসে বিয়ে হয়ে সংসারে এসেছেন তবে একটা দুটো বাচ্চা নষ্ট হবার পর শিবের দোর ধরা এই ছেলে তাই ছেলে অন্ত প্রাণ তার। পড়াশোনা মনে হয় তেমন জানেন না,মানে বাপমরা মেয়ে ছিলেন তাই শেখা হয়নি। তবে স্কুল মাস্টার স্বামীর ঘরণী হওয়ায় ছাত্রদের সম্মান পেয়েছেন গুরুপত্নীরূপে। এখনও নাকি তারাই আগলে রেখেছে তাঁকে। পিউলিরও মা হতে একটু দেরি হয়েছে তাই সায়নের বাবার নাতি দেখা হয়নি। তবে সায়ন মনে করে বাবাই এসেছেন ছেলে হয়ে। পিউল অবশ্য রেগে যায় খুব একথা শুনলে। ' শোন তোমার বাবা যা জেদী ছিলেন তেমন যদি ছেলে হয় তো দেখতে হবে না। ও আমার ছেলে,আমার মনের মত করে ওকে মানুষ করব।
বাবা মারা যাবার পর সায়ন বিদেশ যাবার আগে মাকে বলেছিল ওখানকার বাড়িঘর বিক্রি করে ওর শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি কোথাও একটা থাকতে। তাহলে ওরা একটু দেখাশোনা করতে পারতেন। মা রাজি হননি,যদিও ছেলের জন্য বুকটা হু হু করে উঠেছিল। দেশে থাকতে তো বছরে দুতিনবার আসত ছেলে,এখন তো তাও দেখতে পাবেন না। তবুও সায়নের বাবার কথা মনে করে শক্ত হয়েছিলেন...'গিন্নি আমরা হলাম গিয়ে বটগাছ,ওরা এইখেনে ছিল যতক্ষণ ছোট্ট ছানা ছিল। এখন ওরা উড়তে শিখেছে,মাঝেমধ্যে এসে হয়ত বসবে পুরোনো গাছটার ডালে। কিন্তু ওদের এখন আকাশ ডাকছে,তুমি মনখারাপ কোর না,ওকে ডানা মেলতে দাও।'
ছেলেকে ডানা মেলতে দেওয়াতে যে বৌমা কখনই একরাতও কাটাবে না এখানে তা ভাবেননি সায়নের বাবা। কখনও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোলেও শক্ত থেকেছেন। একটা সময় সবই অভ্যেস হয়ে গেছিল। সায়ন এলেও পিউলি আসত না নানা অজুহাতে।
এবারও তো এতগুলো বছর পর এসে সায়ন একবেলা থেকেই চলে গেছে পরে আসবে বলে। এখান থেকে নাকি তার কাজের অসুবিধা। অবশ্য মাকে কথা দিয়ে গেছে এবার এলে তার দাদুভাইকে নিয়েই আসবে। আর যাবার আগে মায়ের কাছে দুটো দিন থেকে যাবে। আশায় দিন গোণেন মিনতিদেবী,ছেলে চলে যাবার সময় মাথায় হাত ঠেকিয়ে দুর্গা দুর্গা বলেন। তারপর ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যে দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ বেয়ে।
আজ সারাদিন কেমন যেন মনটা খচখচ করেছে পিউলের,বারবারই চোখ গেছে শুভার ভ্লগে। বাপরে কত ভাইরাল হয়েছে ভ্লগটা! সারাদিন এটা ওটা করার ফাঁকে মাথায় ঘুরেছে একটাই কথা কী করা যায়? তাহলে কী সায়নকে বলবে?
পরক্ষণেই পিছিয়ে এসেছে। না না তা কী করে হয়? অজ পাড়াতে গিয়ে আমি থাকব না একরাতও আর একথা সে বারবারই বলে। তুমি যদি বল তো দেখা করে আসতে পারি। আর উনিও তো আসতে পারেন এই বাড়িতে। এত ইগো কেন ওনার? মা বাবা তো অনেকবার গেছে। এসব তো সেই বলেছে বহুবার।
সায়ন একটা কথাই বলেছে বারবারই,' পিউলি,আমি তোমাকে জোর করিনি তো। তবে আমাকে তো যেতেই হবে আর খোঁজখবর রাখতে হবে। মা তো আবার বড় ফোনও ব্যবহার করে না। ঐ ছোট ফোনেই যেটুকু কথা। এছাড়া বাবার আমলের ল্যান্ডফোন আছে।'
সেখানে এখন কি করে বলবে সায়ন আমিও যেতে চাই তোমাদের বাড়িতে। আমি অবশ্য যাচ্ছি ভ্লগ বানাতে। ইশ্! শেষে সারেন্ডার করা? একসময় গলা বাজিয়ে ও নিজেই বলেছিল তুমি যাও তবে আমাকে যেতে বোল না। আর তোমার বাবার তো আমাকে পছন্দই নয়।
সারাদিনই ভাবে পিউল,ফোন খুলতে ইচ্ছে করছে না আজ। আসলে ঐ শুভাটাকে তো ও চেনে,একসময় ওদের স্কুলেই পড়ত। কিছুই করতে পারেনি,বিয়েও হয়েছে গ্ৰামে। এখন সেটাকেই অ্যাসেট করে ভিডিও বানিয়ে একদম পপুলার ইউটিউবার হয়ে গেছে।
আজ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে পিউল,সায়ন অবাক হয় দেখে। ' কী হল? আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লে যে? এখন তো তোমার ফ্যানেদের হাওয়া খাওয়ার সময়৷'
অন্য সময় হলে দুটো কথা শোনাতো,আজ আর কিছু বললো না। ছেলেও দিদার কাছে শুয়েছে। কপালে হাত রাখে পিউলি,' তোমার সবেতেই ইয়ার্কি। মাথাটা ব্যথা করছে,কে জানে জ্বর আসবে কিনা? একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে?'
বৌয়ের শরীর খারাপ সুতরাং কিছু বলার নেই। সায়নের বুকে মাথা গোজে পিউলি। সায়ন ওর কপালে,চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। পিউলি আরও কাছে আসে। ধীরে ধীরে আরও ঘনিষ্ঠ হয় ওরা। ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তে আদরে ডুবে যেতে যেতে পিউলি বলে,' এই শোন না। তুমি বলছিলে না মা বেটুকে দেখতে চাইছে ওকে নিয়ে একদিন যাবে। ভাবছিলাম আমিও যাবো তোমাদের সাথে। মাও বকাবকি করছিল আমি যাই না বলে। তাই ভাবছিলাম..'
পিউলের এইটুকু কথাতেই গলে যায় সায়ন। কিছু না বলেই পিউলের ঠোঁটটা চেপে ধরে নিজের ঠোঁটে। যখনই গেছে একা একা। গ্ৰামের পরিচিত মানুষজন জিজ্ঞেস করেছে বৌমা আসেনি? নানা অজুহাত দিয়ে কাটিয়েছে। তারপর তো গত তিনবছর আসাই হয়নি। মা সেদিন চোখটা মুছে নাতিকে দেখার কথা বলাতে ও কথা দিয়ে এসেছিল নিয়ে আসবে ছেলেকে। মাকেও বলেছিল,' তুমি চলো না মা আমাদের সাথে ওখানে গিয়ে কয়েকদিন থাকবে।'
মা এড়িয়ে গেছিল,বলেছিল এই বাড়িঘর কে দেখবে বলতো? যতদিন আছি এই শ্বশুরের ভিটে আমিই সামলাই। কে জানত তোর বাবা এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে? রিটায়ার করার পর তো বেশিদিন বাঁচলোই না মানুষটা। অবশ্য রেখে গেছে কিছু ছাত্রদের যারাই আমার লাঠির মত। সারাক্ষণ খোঁজ নিচ্ছে। আবার মা চোখ মুছেছিল। আজ পিউলের যাবার কথা শুনে সায়নের মনটা কেন যেন খুশিতে ভরে গেল। জানে না কালই মত পাল্টে ফেলবে কিনা? তবে যদি যায় তো এবার একটা দুটো দিন থেকে আসবে।
-' সত্যি তুমি যাবে? নাকি ঘোরে বলছ? কিছু খাওনি তো? মানে মাথা ঠিক আছে তো?'
পিউল সায়নকে আরও জড়িয়ে ধরে,'সত্যি বলছি বাবা। ভাবলাম সেই গেছিলাম কত বছর আগে..তখন অনেককিছু জেদের মাথায় করেছি। কিন্তু সত্যিই আমার যাওয়া উচিত কারণ হাজার হোক শ্বশুরবাড়ি বলে কথা।'
-'কিন্তু তুমি থাকতে পারবে তো ওখানে? তোমার তো টয়লেট কিস্যা আছে। মানে ইস্যু তো হিসু।'
-''তুমি না একটা যাচ্ছেতাই একদম। হ্যাঁ টয়লেট প্রবলেম আছে কিছুটা। অভ্যেস বলে তো একটা কথা আছে।'
'আমি ভাবছিলাম মায়ের কাছে কয়েকদিন থাকবো।'
মনের কথা বলতে আর দেরি করে না সায়ন। বুঝেছে বৌয়ের মুড ভালো। সত্যি অশান্তি করে করে ও নিজেও ক্লান্ত।
-' হ্যাঁ থাকবো ভেবেছি তবে জানি না কয়েকদিন থাকতে পারব কিনা?যাই তো আগে। তেমন হলে আমি একদিন থেকে চলে আসবো। গাড়ি তো যাবেই। তুমি থেকো কয়েকদিন।'
আবছা আলোতে পিউলের মুখটা দেখার চেষ্টা করে সায়ন। সত্যিই কী মানুষ বদলায়? যখনই গ্ৰামে গিয়ে কয়েকদিন থেকেছে মেঘ জমেছে। গুরুত্ব না দিতে চাইলেও গুরুত্ব দিতে হয়েছে। ছেলের সামনে ঝগড়াঝাটি ভালো লাগে না। জিজ্ঞেস করে সায়ন..
-' কবে?'
-'কাল,পরশুর মধ্যে। কালও যেতে পারি।'
সায়ন অবাক হয়ে যায় এই মেয়ের হল কি?
আর পিউল মনে মনে গুছোতে থাকে ওর গল্পগুলো বরের আদর খেতে খেতে।
যথারীতি ওর মা,বাবাও শুনে অবাক হন। বাবা তো একটু আপত্তিই করছিলেন থাকার কথা শুনে। মা জোর দিলেন,'যাক,এসেছে এতদিন বাদে দেখা করে আসুক। ওনারও তো ছেলেবৌ আর নাতিকে পেতে ইচ্ছে করে।'
যা যা লাগবে প্যাক করে নিয়েছে পিউল। শাশুড়ির জন্যও দু তিনটে শাড়ি কিনেছে। দেখেছে তো খুবই সাদামাটা থাকেন। ছেলে তো লাফালাফি শুরু করেছে কান্ট্রিসাইডে ঠামুর বাড়ি যাবে বলে। ধমক লাগায় পিউল,ওখানে বিগ বিগ মসকুইটো আছে আর আছে...বাকিটা বলা হয় না সায়ন এসে যাওয়াতে।
'এই তোর মা তোকে কী বলছে?ওখানে অনেক ভালো ভালো জিনিস আছে। কত ফ্রুট ট্রী আছে,আমাদের পুকুরে মাছ আছে।'
-'পুকুর কী?'
'আরে পন্ড'-
-' 'আমরা ফিশিং করব পন্ডে।'
শুনেই ছেলে লাফিয়ে উঠল।
সুতরাং আর কী? ধিন ধিনা ধিন ধিন চলে এলো ঠামুর বাড়ি পৌঁছে যাবার দিন।
।
দুগ্গা দুগ্গা করে পিউলি রওনা দিল গাড়ি চড়ে শ্বশুরবাড়ি। ওর বাবা আবারও সাবধান করলেন মেয়েকে বলে দিলেন তেমন হলে আজই ফিরতে। মা বকুনি দিলেন,' তুমি থামোতো,সারাদিন ঐ রীল আর রীল। একটু মা মেয়ে একসাথে বসে গল্প করব সেটাও শান্তি নেই। নাইটি পরে বসে চা খাচ্ছি,মেয়ে সেটাও ভিডিও করে ফেলল। ওরে বাবা জীবনে প্রাইভেসি বলে আর কিছু রইল না।'
শ্বশুরবাড়ির গ্ৰামে ঢুকে অবাক হয়ে গেল পিউলি। এসে ঠিক মেলাতে পারল না ওর কয়েকবছর আগে দেখা গ্ৰামের সাথে। গ্ৰামের পথঘাট সব একদম চকচকে। রাস্তার পাশে গাছে গাছে কৃষ্ণচূড়ার মেলা। কত দোকান হয়েছে,খাবার দোকান তো আছেই। সাথে অনেক জামাকাপড়েরও দোকান। বাজারটা আরও বড় হয়েছে,ফলের দোকানে হরেক রকমের ফল। আগে একটা কিছু লাগলে ছুটতে হত কুড়ি কিমি দূরে শহরে।
'বাবা এতো একদম চেহারা পাল্টে গেছে গো! আমি তো চিনতেই পারছি না।'
সায়ন মুচকি হাসে। গাড়িটা আরেকটু এগোতেই সায়ন বলে,' এই দ্যাখ তোর দাদাইয়ের স্কুল। এখানে দাদাই পড়াতো। আমিও এখানেই পড়তাম।'
পিউল দেখে স্কুলটা কত বড় হয়েছে,সামনের মাঠে কত গাছ। বিশাল গেটে জ্বলজ্বল করছে স্কুলের নাম।
-' আমিও তাহলে এখানে পড়ব।'
'ছেলের বায়না দেখো,যেই শুনলো বাবা পড়েছে সাথে সাথে আমিও পড়ব।'
কিছু সময় পরেই ওদের গাড়িটা গাছগাছালি ঘেরা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ায়। মাকে দূর থেকে দেখতে পেয়েছে ওরা,ওদেরই অপেক্ষায় সামনের গাছটার নীচে বেদিটার অপর বসে আছে। ঠিক এইভাবে বাবাও বসে থাকত ওর অপেক্ষায়। মনটা হঠাৎই খারাপ হয়ে যায় সায়নের। গাড়িটা এসে দাঁড়াতেই মিনতি দেবীর চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,কতদিন বাদে নাতিকে দেখবেন! ছবি দেখে মনে হয়েছে একদম সায়নের বাবার মতই হয়েছে মুখখানা আর তেমনি লম্বা রোগা ডিগডিগে। কোথায় যেন নাতির মধ্যে মৃত স্বামীকে খুঁজতে চান মিনতি দেবী।
তবুও সেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে ভয় পান। বৌমা এসেছে এবার,তা খুব খুশির হলেও বৌমার সাথে সেই বন্ধনই তো তার হয়নি। বৌমা যে বড় অপছন্দ করে এ বাড়ির সবটুকু এমনকি তাদেরও তাও তিনি ভালো করে জানেন।
তাই মুখে হাসিটুকু মাখিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ওদের বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়। ঠামু বলে ছুটে আসে হঠাৎই ছোট ছেলেটা। মিনতি দেবী নিজেকে সংযত রাখতে পারেন না। ততক্ষণে সে তার শাড়িটা মুঠোতে ধরেছে। মিনতি দেবী তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরেন আর মুখটায় খোঁজেন কোন একদিন হঠাৎই চলে যাওয়া আপনজনের মুখ।
সায়ন আর পিউলি এসে দাঁড়ায়। মিনতি দেবী নাতিকে কোলের কাছে ধরে বলেন,' এসো বৌমা,অনেকটা পথ এলে কোন কষ্ট হয়নি তো?'
-' না মা কোন কষ্ট হয়নি,আপনি ভালো আছেন তো? বেশ রোগা হয়ে গেছেন।'
মিনতিদেবীর চোখের কোণে হঠাৎই একবিন্দু জল এসে আবার লুকোতে চায়,কিন্তু পারে না। এই এত বছর বাদে বৌমার মুখে মা ডাক শুনলেন তিনি। এর আগে যে দুএকবার এসেছে এখানে কখনও মা ডাক শোনেননি মুখে। বরং আন্টি বলেছে প্রথম দিকে,তবে গ্ৰামের মেয়েমহল অবাক হওয়ায় পরে কোন ডাকই ডাকত না।
পিউলের হাতটা ধরেন মিনতিদেবী,'এসো ঘরে এসো,বাবু দাদুভাইকে নিয়ে আয়। সে যে ছুট মেরেছে ঐ গাছতলায়। ওর জন্যই আমি এবার আম পাড়াইনি।'
চারদিকে চোখ রাখে পিউল,বাড়ির চারপাশে গাছ ছিলই আরও কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। ওপাশে ছাউনি দিয়ে সুন্দর একটা বসার জায়গা করা হয়েছে। ঠাকুরঘরের সামনেটা পাথর লাগানো হয়েছে। ফুলের গাছের সাদা ফুলগুলো টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে বারান্দায়।
আজকাল ইউটিউবে অনেক গ্ৰামের মাঝে বেড়ানোর জন্য এমন কটেজ বানাচ্ছে লোকজন। এই বাড়িটা তো এখন তেমনি হয়ে গেছে মোটামুটি।
পিউলের মুগ্ধতা মিনতিদেবীর চোখ এড়ায় না। ' কি দেখছো বৌমা? ঠাকুর বারান্দায় যাবে? প্রণাম করবে?'
আপত্তি করে না পিউল ঠাকুর প্রণাম করে বলে,' তুমি মানে আপনি একা হাতে এত কিছু পরিপাটি রেখেছেন?'
-' তুমিটাই থাক না বৌমা। কে বলেছে একা হাতে? আমার তো দশ হাত তারাই সব করে। এখন এসো তো ঘরে। একটু বোসো,সরবত খাও। আমার দাদুভাইও তো খাবে।'
কাঁসার গ্লাসে ঠান্ডা জল এনে দেন মিনতীদেবী তারপর ডাকেন ও কমলি সরবতটা নিয়ে আয়।
পিউলির হাতটা নিশপিশ করে ভিডিও করার জন্য। ফোনটা বের করতেই সায়ন ইশারা করে।
-' জলটা বেশ ঠান্ডা, ফ্রীজে ছিল নাকি? তাহলে ছেলেকে খেতে দেবে না।'
-' না না মাটির কুজোতে ছিল,মনে হয় কিছু হবে না। তবুও তুমি দেখে নাও বৌমা।'
সবকিছু পরিপাটি দেখে অবাক হয়ে যায় পিউলি,এমনকি যে বাথরুম নিয়ে তার এত সমস্যা ছিল তাও সুন্দর আধুনিক ব্যবস্থায় সাজানো। ঘরগুলোতে সুন্দর হাতের কাজের খাদির পর্দা সবেতেই যেন একটা রুচির ছাপ।
কয়েকবছর আগের শ্বশুরবাড়ির সাথে এই শ্বশুরবাড়ির মিল পেল না পিউল। যে শাশুড়ির তেমন কোন বলার মত কথা ছিল না,সবসময়ই স্বামী আর ছেলের কথাতে চলতেন। তিনি যেন নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছেন কয়েক বছরে।
সুন্দর মার্জিত কথাবার্তা,পরিপাটি ঘরদোর আর ঠাকুরের জায়গা। সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে দুই হাত কমলি আর বাসন্তী হুকুম করা মাত্রই তারা হাজির আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মত।
মিনতিদেবী রান্নাঘরে গেছেন,পিউল অবাক চোখে দেখে চারপাশ। সায়ন বলে,' বাথরুম, ঘরদোর সব ঠিক আছে তো? মানে কেমন যেন সবেতেই গ্ৰাম গ্ৰাম গন্ধ নেই তো?'
পিউল ওকে একটু ঠ্যালা দেয়,' কিন্তু এত কিছু কে করেছে? তুমিও তো সেই একবার এলে।'
-' মা করিয়েছে,আমিও অবাক হয়েছিলাম দেখে অ্যাটাচড বাথরুম। বাবা তো এগুলো পছন্দ করতেন না। পুরোনো সবটুকু নিয়েই থাকতে ভালোবাসতেন। মাকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল,করিয়ে রেখেছি কখনও যদি দাদুভাই আর বৌমা আসে তাদের অসুবিধা হবে। ভালো করেছে,মায়েরও সুবিধা হয়েছে।'
পিউল অবাক হয় আবার কে জানে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে এতদিন শাশুড়িমা। তবে গলার স্বর সেই আগের মতই নীচু শুধু তাতে দৃঢ়তা এসেছে কিছুটা।
সাজানো গোছানো ঝকঝকে কাঁসার থালা বাটিতেত লুচি,তরকারি,মিষ্টি,পায়েস। অবশ্য তার আগে মিনতিদেবী পিউলকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছেন সে লুচি খাবে কিনা? না হলে তাকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দেবেন।
একটু ধাক্কা খেয়েছিল পিউলি মনে পড়েছিল আগের কথা..তোমাদের জলখাবার বলতে তো সেই মুড়ি,রুটি না হলে লুচি আমি ওসব খাই না।
মনে পড়েছিল শ্বশুরমশাইয়ের কথা,এখানে এগুলোই পাওয়া যায়। খেয়ে দেখো ভালো লাগবে। এ মুড়ির স্বাদই আলাদা।
পিউলি মিনতিদেবীকে বলে,' এখানে স্যান্ডউইচ পাওয়া যায়?'
-' পাওয়া যাবে কেন? আমি বানিয়ে দেব সবই তো আছে। তাছাড়া কমলিও পারে।'
-' আমি লুচিই খাবো ঝামেলা করতে হবে না।'
জলখাবারের একটা ছোট ভিডিও বানিয়েই ফেলে পিউল সায়নকে পাত্তা না দিয়ে। ছেলে ততক্ষণে আহ বলে লুচি মুখি তুলেছে। সেটাও উঠে গেল।
জলখাবার খেয়ে রান্নাঘরে গেল পিউলি। এই ঘরটা আগের মতই আছে শুধু কিছুটা জায়গা জুড়ে আধুনিকতার ছোঁয়া। একটু হাসি পেল পিউলির তার সাথে অবাকও হল দেখে যে শাশুড়ির সংসারেও ঠাঁই পেয়েছে কিছু গ্যাজেট। উনারা নিতে না চাইলেও সায়ন যে টাকাপয়সা দেয় তা পিউল জানে। মনে মনে ভাবলো,স্বামী না থাকায় ভালোই আছেন। টাকা,পয়সা,জমি,জায়গা,বাগান অনেক কিছুই তো আছে যাক মোটামুটি ভালোভাবেই সেগুলো কাজে লাগাচ্ছেন। যাক ভালো থাকলেই ভালো। বাইরে থাকাতে একদিক দিয়ে ভালো এসব টুকটাক ঝামেলা ওকে নিতে হয় না। অনেকের কাছেই তো শোনে শাশুড়ি শ্বশুর নিয়ে ঝামেলা লেগেই আছে।
তার চেয়ে এই ভালো যে যার জগতে ভালো আছে।
পিউলি যে উদ্দেশ্যে এসেছে তা বিফলে যেতে দেয় না। হাতের আর মাথার কাজ সে করে যাচ্ছে নিজের মত করে। এখানে প্রচুর কন্টেন্ট আছে,গাছ ভর্তি পাকা আম,জামরুল,লিচু,কলাগাছে মর্তমান কলার থোকা মানে কী নেই? এই নতুন কিছু মুঠোতে ধরবে বলেই তো এখানে আসা।
গ্রামের মানুষজন অনেক বেশি কর্মঠ,খাওয়াদাওয়া নিয়ে তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। সবই টাটকা তাজা। বাসন্তি বসে কুচো মাছ কাটছে। প্যাকেটে প্রসেস করা সবজি আর মাছের গল্প নেই এখানে। কাতলা মাছটা লম্ফঝম্ফ করছে তখনও,তা দেখে ছেলের খুব আনন্দ। শাশুড়িমা ইলিশও জোগাড় করেছেন। শ্বশুরমশাইয়ের এক ছাত্র নাকি দিয়ে গেছে। কমলি সরষে বাটছে শিল নোড়াতে।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া করার পর ওদের বিশ্রাম নিতে বলেন মিনতিদেবী। শুয়ে গড়াগড়ি করতে করতে চোখ বুজে আসে। তারমধ্যে মাকে বাবাকে ছবি পাঠিয়েছে। বাবা তো বারবার বলছে চলে আসিস কালই। পিউলি বলেছে কাল হবে না। সায়নের ইচ্ছে দু তিনদিন থাকার। দেখা যাক...
-' সেকি! দু তিনদিন! খুব মশা না? আর ঝোপজঙ্গল চারদিকে।'
' না বাবা সেসব কিছু নেই। চারপাশ একদম ঝকঝকে,ঠিক যেমন তোমরা কোন একটা রূপসী গ্ৰামে বেড়াতে গেছিলে তেমন।'
কিছুটা সময় ফোনে ডুবে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমে ডুবে গিয়েছিল বুঝতেই পারেনি। ঘুম ভাঙতে বেশ অনেকটা দেরি হয়ে যায় পিউলের। অবশ্য কেউ ডাকেওনি ওকে। চোখ খুলে ছেলে,বর কাউকেই দেখতে পায় না।
একটু রাগই হয়,ওকে না ডেকে দিব্যি ছেলে নিয়ে মায়ের কাছে বসে আদর খাচ্ছে নিশ্চয় ওর বর।
বাইরে এসেও কাউকে দেখতে পায় না। একটু মুখ বাড়াতেই কমলিকে দেখে জিজ্ঞেস করে সায়নের কথা।
কমলি উত্তর দেয়,' সায়ন দাদা সাইকেল নিয়ে একটু গ্ৰামের দিকে গেছে গো আর তোমার ছেলে ঐ ওদিকে ঠাকমার ইস্কুলেতে।'
অবাক হয় পিউল,শাশুড়ি আবার পড়াশোনা শুরু করেছেন নাকি? কিসের স্কুল আবার?
একটু পা বাড়ায় সামনের দিকে, তুলসীতলা পেরিয়ে উঠোনের ওপাশে ওদের শ্বশুরবাড়ির আগের পুরোনো বাড়ির উঠোনটায় চোখ পড়ে যায় পিউলের।
অনেকগুলো মহিলা বসে,শাশুড়িমা তাদের মাঝে বসে আছেন। কী হচ্ছে ওখানে?
একটু আস্তে আস্তেই এগিয়ে যায় পিউল আর যা দেখে তাতে অবাকই হয়। একদল মহিলা বাধ্য ছাত্রীর মত বসে শাশুড়ির চারপাশে। কারও হাতে স্লেট পেন্সিল আবার কারও হাতে খাতা। কেউ বা ছুঁচ সুতো নিয়ে বসে সেলাইয়ের কাজ করছে। কিছু সমস্যা হলেই শাশুড়ির কাছে এসে দেখিয়ে যাচ্ছে। পিউল দেখে একজনের খাতায় লিখে দিচ্ছেন শাশুড়িমা। হাতের লেখাটা দেখে অবাক হল,ওনার কাছেই একসময় শুনেছিল বেশি পড়াশোনা শেখা হয়নি ওনার। তবে এখন তো দেখে অবাকই লাগছে যেভাবে ওদের শেখাচ্ছেন। সেলাইয়ের হাতও তো চমৎকার।
নাতিকেও রঙ পেন্সিল দিয়ে কোলের কাছে বসিয়ে ছবি এঁকে দিচ্ছেন।
গ্ৰাম আর গাঁইয়া শাশুড়িকে কোনদিনই পছন্দ করেনি পিউলি শুধু গ্ৰামের হীরের টুকরো ছেলেটাই পছন্দ ছিল। সেই গ্ৰামের এই সাধারণ মহিলাকে বেশ কয়েক বছর বাদে এসে দেখে সত্যিই অবাক লাগে ওর। বুঝতে পারে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সব জায়গাতেই। কিন্তু ওঁর এত প্রতিভার কথা তো জানতই না কখনও। সায়ন কিছু বলেনি কখনও।
ছেলে দেখতে পেয়েই ছুটে আসে মা মা করে। মিনতিদেবীও পেছনে তাকান। তারপর হেসে বলেন,' সায়ন ফিরেছে? তুমি উঠে এসেছো,আমাকে ডাকোনি কেন?'
-' আমি দেখছিলাম আপনি পড়াচ্ছেন তাই আর ডাকিনি।'
মিনতিদেবী ওদের দিকে তাকিয়ে বলেন,' আজ যা তোরা,কাল আর আসিস না। আবার পরশু হবে। কিছু বাকি থাকলে শেষ করে যা।'
************
কত প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক করে পিউলের,ইশ কাল ওদের কেন বারণ করলেন উনি! আগে তো মাথাতেই আসেনি একটা দারুণ কনটেন্ট হতে পারত শাশুড়ির ইস্কুলটা। আবার তো ওরা হয়ত পরশু আসবে। কিছু বলাও যাবে না। তখন মাথায় এলে বারণ করত।
সায়ন ফিরে এসেছে,চায়ের কাপ নিয়ে সবাই বসে। গরম গরম বেগুনি ভেজেছে কমলি। শাশুড়ি মুড়ি মেখে এনেছে প্রায় এক ধামা। ছেলে তো পারলে খুশিতে ওর মধ্যেই উঠে বসে। পিউল বলে,' কে খাবে এত মুড়ি?'
-' সবাই খাবে,দেখবে শেষ হয়ে যাবে।'
পিউলির হাত বেশি চলছে মুখের থেকে। এই ছোট ছোট মুহূর্ত সাজাবে কেমন করে ভাবছে।
সায়ন হঠাৎই বকা দেয়,' পিউল অনেক হয়েছে,এবার খাও। এখন তো মনে হচ্ছে ভিডিও করাই তোমার একমাত্র লক্ষ্য।'
একটু ধরা পড়ে গিয়ে অন্যদিকে কথা ঘোরায় পিউলি,শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে..'আচ্ছা ওরা এখানে পড়তে আসে রোজ? সেলাইও শেখে?'
-' হ্যাঁ আসে। আমার আজ কী কাজ বল তো দেখি। তাই কাজের ফাঁকে ওদের একটু শেখাই। ওরা অনেকেই সই করতে পারত না। এখন পারে,পড়তেও পারে।'
এতদিন শুনে এসেছে শাশুড়ি তেমন পড়াশোনা করতে পারেননি। দুএকদিন যা থেকেছে এখানে সেটাতে তেমনি ধারণা হয়েছে যে উনার তেমন কিছু আলাদা যোগ্যতা নেই,সংসার সামলানো ছাড়া।
আর ছেলের গরবেই গর্বিত সাধারণ মায়েদের মত তিনিও একজন।
অবশ্য এইটুকু পড়াশোনা আর সেলাই শেখাতে এমন কী শেখার দরকার আছে?
তবে পিউলের অনেক ধারণাই মিথ্যে হয়ে গেছিল যখন শুনলো কথা বলতে বলতে শাশুড়ি মুখে লজ্জা এনে বললেন,' আসলে সময় কাটে না একদম তোমাদের বাবা চলে যাবার পর। তাই ভাবলাম কিছু করি,পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকলেও তো হয়নি। তাই শুধু বসে না থেকে শুরু করলাম।'
'কী শুরু করলেন?'
মিনতিদেবী একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে শুরু করলেন,' ঐ একটু পড়াশোনা,কাটিংয়ের কাজ,তারপরে ছেলেই বলল..'
কেন যেন একটু রাগ হয় সায়নের ওপর পিউলির..ওহ্ ভেতর ভেতর এত কিছু!
মিনতিদেবী আবার শুরু করলেন একটু হেসে,' না সায়নের কথা বলছি না। তোমার শ্বশুরমশাইয়ের কয়েকজন ছাত্র ছিলেন তাঁর বড় কাছের। তিনি চলে যাবার পর তারা সারাক্ষণ আমাকে আগলে রাখে তারমধ্যে কমলেশ একজন। তোমার বাবাদের স্কুলেই এখন পড়ায়। সায়নের সাথেই পড়ত। খুব ভালো ছেলে। সত্যি কথা বলতে উনি চলে যাবার পর বড় অবসাদ এসে গিয়েছিল। তো ওর উদ্যোগেই আবার পড়াশোনা শুরু করলাম,সেলাইয়ের স্কুলে গেলাম। তারপর তো এই দেখছো। তোমরা অনেকটা দূরে থাকো,ছেলে আমার সময় পায় না কত কাজ থাকে ওখানে। তাই সবাইকে ভালো রাখতে তো আমাকে ভালো থাকতে হবে। অবশ্য এখনও এই গ্ৰামদেশে মানুষ একে অপরের সাথে ভালো আছে। শহরের মানুষেরা আরও একলা।'
কেন যেন মিনতিদেবীর কথাগুলো চুপ করিয়ে দিল পিউলিকে। স্বামীর আজ্ঞাবাহী মহিলা হঠাৎই অদ্ভুতভাবে নিজেকে বদলে ফেলেছেন কয়েকবছরে। হয়ত বা অনেক বেশি পরিণত,অভিজ্ঞ,শান্ত আর ব্যক্তিত্বময়ী।
দেখতে দেখতে দুটো দিনের বদলে তিন চারদিন কেটে গেল। বাবা তো বারবারই ফোন করছে,এমনকি একবার বলেই ফেললো, 'তোর শাশুড়িমা কোন জাদুতে আটকে রেখেছে তোকে? যে মেয়ে শ্বশুরবাড়ির মুখ দেখতে চাইতিস না সে দুদিন বলে চারদিন হতে চললো এখনও আছিস সেখানে?'
পিউল বাবাকে একটু ধমক দেয়,' বাবা এখন এখানে অসুবিধা হবার মত আর কিছু নেই। তোমার জামাই,দাদুভাই খুশি আছে। তাই ভাবলাম কদিন থেকে যাই। আর উনারও তো ছেলেকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে।'
বাবা গজগজ করে মা পাশ থেকে বলে,' যাক এতদিনে তোর সুবুদ্ধি হয়েছে।
পিউলির ঝুলি ভরে গেছে অভিজ্ঞতার মণিমুক্তায়। মনে মনে এক অদৃশ্য টান অনুভব করে জায়গাটার ওপর। ওদের সাজানো গোছানো জীবনের বাইরেও কত কী দেখার আর জানার আছে এই গ্ৰামে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা ভ্লগ বানিয়েছে,যেগুলো খুবই পছন্দ করেছে সবাই। আসলে সবাই বোধহয় সবকিছুর মধ্যে এই চিরন্তন সুন্দর জিনিসগুলো খোঁজে। তা সম্পর্কই হোক বা প্রকৃতিই হোক।
শ্বশুরবাড়ি থাকার দিন প্রায় শেষ,একটু মনটা খারাপ করে পিউলির। চলে আসার দিন মিনতিদেবীর চোখে জল দেখে পিউলি। হঠাৎই নিজের সন্তানের কথা ভেবেও বুকটা ভারী হয়। সন্তানকে ছেড়ে থাকা কতটা কষ্টের হয় তা একটু হলেও এখন বোঝে। যা এতদিন বুঝতেই চায়নি।
*******************
ছুটি শেষ করে ওরা ফিরে এসেছে প্রবাসে,যা এখন ওদের স্থায়ী থাকার দেশ। ফিরে এসে কদিন একদম সময় পায়নি। রাজ্যের কাজ সেরে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই কদিনে একটু বেশি আদর খেয়ে অভ্যেসও খারাপ হয়ে গেছে।
আজ বেশ কদিন বাদে সায়ন অফিসে বেরিয়ে গেলে ল্যাপটপ খুলে নিজের কাজ নিয়ে বসে পিউল।। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে একটু হারিয়ে যায় পিউল। কত ছবি আর ভিডিও সাথে কিছু সুখস্মৃতি। অনেকগুলো অচেনা মুখ হঠাৎই বড্ড চেনা হয়ে গেছে। সাদামাটা হাইপাওয়ারের চশমা পরা কমলেশদা যার মুখে সবসময় হাসিমাখা,যেন সব পেয়েছি দেশের মানুষ। শাশুড়ির কোলের কাছে বসে আদর খায় মা হারা কমলেশদা। শাশুড়ির আরেক ছেলে যাকে ছেলে বলেই ডাকেন উনি। সায়নকে বলেছিল,মায়ের তো এখন আরেক ছেলে গো,তোমার হিংসে হয় না?
সায়ন হেসেছিল,' কেন হিংসে করব? ও আছে বলে আমি কত নিশ্চিন্তে বিদেশে আছি। ভীষণ ভালো ছিল পড়াশোনায় ছেলেটা। আমার থেকেও অনেক এগোতে পারত। কিন্তু ছোটবেলায় মা বাবাকে হারিয়ে অনেকটাই অসহায়। তবে বাবা খুব ভালোবাসতেন। পড়াশোনায় ভালোবেসে করত,তাই এগিয়ে গেছে নিজের মত।'
-' আগে তো কখনও বলোনি ওদের কথা।'
-' তুমিও তো কখনও শুনতে চাওনি,এমনকি আসতেও চাওনি এখানে।'
পিউল চুপ করে গেছিল।
ছোট ছোট ক্লিপসগুলো বাছতে আর এডিট করতে শুরু করে পিউলি। বেশ কয়েকটা শর্টস পোস্ট করেছে এরমধ্যেই।
বেশ কিছুটা সময় কাজ করে ক্লান্ত লাগে ওর। এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় ওর প্রিয় জায়গাটাতে এসে বসে। আকাশ আজ যেন খুশিতে হাসছে। গাছের পাতায় পাতায় সোনালী আভা লেগেছে। শরৎ এসেছে তাই প্রবাসেও লেগেছে রঙের ছোঁয়া।
মা বাবা খুব বলেছিল দুর্গাপুজো পর্যন্ত থাকতে,কিন্তু সায়নের কাজের জন্যই ফিরে আসতেই হবে এমনটা বলেই গেছিল এখান থেকে।
এখানকার পুজোতে যদিও সেই গন্ধ তেমন নেই,তবুও যতটা পারে চেটেপুটে নেয় সবাই আনন্দের স্বাদ। আর তার সাথে চলে মেয়েদের শাড়ি,গয়না পরা আর নিত্যনতুন সাজগোজের ছবি পোস্ট করা। ভালো লাগে পিউলের সবটাই,এখানে অনেক বান্ধবীও হয়ে গেছে।
বেশ অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে ছেলে চলে যাবার পর। প্রথম কদিন খুবই খারাপ লেগেছে মিনতিদেবীর,তারপর কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন। মানুষ বোধহয় অভ্যেসের দাস,তাই নিজেকে ভালো রাখতে হলে কিছু অভ্যেসে বেঁধে রাখাই ভালো। সময়কে ফাঁকা রাখতে নেই,ফাঁকফোকর দিয়ে মনখারাপ ঢুকে পড়ে চটজলদি।
তাছাড়া সামনেই পুজো,যদিও সে পুজো গ্ৰামের সবার তবুও অনেক আগে থেকে আছেন সেই পুজোতে তাই অনেক ব্যস্ততা থাকে পুজো ঘিরে। নিজেকে গতানুগতিক যা করে এসেছেন তার মধ্যেই আটকে রেখেছেন বহুদিন,শুধু এই সময় কাটানোর জন্য আর ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য কিছুটা এগিয়ে যেতে হয়েছে..আর সবটাই কমলেশের হাত ধরে। কখন যে ছেলেটা অনেকটাই শূন্যতা পূরণ করে দিয়েছে বুঝতেই পারেননি।
রাতে শুয়ে আনমনা হয়ে যান মিনতিদেবী,জেগে থাকেন ছেলের ফোনের আশায়। আগে ছেলের সাথেই কথা হত,এখান থেকে যাওয়ার পর বৌমাও দুদিন এসেছে ফোনে। কিছুটা অবাক হলেও আনন্দ পেয়েছেন মিনতিদেবী,বুঝেছেন সময়ের সাথে সাথে হয়ত কিছু পরিবর্তন এসেছে বৌমার মধ্যেও।
প্রতিদিনই ভ্লগ বানালেও শ্বশুরবাড়ির কিছু স্মৃতি আর শাশুড়িমার কিছু ভিডিও এখনও পোস্ট করেনি পিউলি। বারবারই দেখেছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে,এডিট করেছে। কখনও অবাক হয়েছে,কখনও চুপ করে কিছু ভেবেছে। অথচ একটা সময়ে অদ্ভুত একটা বিরক্তি ছিল এই গ্ৰাম্য পরিবেশে গ্ৰাম্য মানুষজনের সাথে থাকা নিয়ে।
এবার নিজের কাজের জন্যই চলে গিয়েছিল সায়নকে অবাক করে,থেকেও গিয়েছিল বাড়তি কদিন। তাতে ক্ষতি কিছু হয়নি,আসলে মানুষ এখনও সাদামাটা জীবন পছন্দ করে,শুনতে ভালোবাসে গ্ৰামের কথা,দেখতে ভালোবাসে প্রকৃতি। তাই ওর ফলোয়ার্স বেড়েছে অনেক,ভিউজ বেড়েছে। তবুও শাশুড়িমাকে খুব একটা সামনে আনতে পারেনি এক অদ্ভুত সঙ্কোচে। কে জানে যদি সায়ন কিছু ভাবে? যদি ওনার কোন আপত্তি থাকে?
দিন কয়েক এডিট করে গেছে সময় পেলেই,কিছু কথা নিজে বলেছে কিছু মায়ের কথা। মা কথাটা বলে জিভটা কেমন হাল্কা হল,সত্যিই এতদিন সেটাও বলতে পারেনি ঠিক মত। অথচ ভিডিওগুলো দেবার খুব ইচ্ছে ওর..তাহলে কী সায়নকে একবার বলবে? না,ও যদি বিরক্ত হয়?
আর দুদিন বাদেই পুজো,এই কদিন ভেবে মনস্থির করেছে পিউলি আজ রাতে সে কথাটা বলবে। যাকে নিয়ে সে ভ্লগ বানাতে চায় তাকে জিজ্ঞেস করাটাই ভালো। অবশ্য এই কথাটা ওকে ওর মা বলেছে..' দ্যাখ ওনারা গ্ৰামের মানুষ, এতদিন তো ঘোমটার আড়ালেই থেকেছেন। এখনও মাথায় ঘোমটা দেন,পাড়া পড়শীর সাথে থাকেন। তাই কিছু ভাবতে পারেন। একবার জিজ্ঞেস করে নেওয়াই ভালো।'
-' মা এখন গ্ৰামের হাজার একটা মহিলা নেচে,গেয়ে রীল বানাচ্ছে। এসব নিয়ে কেউ ভাবে না এখন।বরং উনি সামনে এলে অনেকেই জানবেন ওঁর কাজের কথা,সমাজ সেবামূলক কাজের কথা।'
-' সবাই এক হয় না, তোর শ্বশুরমশাই রক্ষণশীল ছিলেন,উনি সেভাবেই অভ্যস্ত।'
-' আচ্ছা ঠিক আছে,তুমি তো আমার গাইড তাই সেটাই হবে। পারমিশন নিয়েই করব।'
----------------------
অন্য অনেকদিনই এই সময় কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে পিউলি। আজ একটু ছটফট করে,সায়নকে বলেই রেখেছে ও কথা বলবে। এর আগেও অবশ্য কথা বলেছে ওখান থেকে এসে।
সায়নের কথা শেষ হলে ফোনটা হাতে নেয় পিউলি,ওদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথা হয়। মিনতিদেবী সবসময়ই স্বল্পভাষী এবং সংযত,আরও বিশেষতঃ বৌমার কাছে। এত বছরে তো তেমন কোন বন্ডিং তৈরি হয়নি দুজনের মধ্যে তাই কিছু চেনা শব্দে হয় কুশল বিনিময়। পিউলি গলাটা ঝাড়ে একবার তারপর বলে,' আর তো দুদিন বাদেই পুজো ভাবছিলাম একটা ভ্লগ বানাবো। মিনতিদেবী বলেন,ভালোই তো..তুমি তো বানাও সেসব।'
' আমার আপনাকে মানে তোমাকে নিয়ে একটা ভ্লগ করার ইচ্ছে...কিছু ভিডিও করেছিলাম,সেগুলো দিয়ে। যদি সেটা পুজোতে পোস্ট করি মানে তোমার কাজকর্ম নিয়ে..তুমি যে সোশ্যাল ওয়ার্ক করো।'
অনেকটা কথা বলে পিউলি থামলো,আপনি না বলে তুমি বলতে অনেকদিন বলেছেন মিনতিদেবী আজ সেটাই বললো।
ওদিকে চুপচাপ,কোন কথা নেই। পিউলি আবার বলে,' কিছু বলবে না? তোমার ইচ্ছে না হলে করব না। তুমি দেখতেও পারো একবার পোস্ট করার আগে..দেখবে?'
একটু গম্ভীর শোনালো ওপাশের গলাটা,ফোনে ভেসে এল আমি বড়ই সাধারণ.. খুব বেশি পড়াশোনাও শিখিনি। ভালোবেসে সময় কাটাতে এগুলো করি। সবটাই কমলেশের জন্য। আমাকে আমার রিয়েল লাইফেই থাকতে দাও..একটা সাধারণ মানুষকে নিয়ে কী দরকার রীল বানানোর? তাছাড়া গ্ৰামে থাকি,তোমার শ্বশুর থাকাকালীন অন্তরালেই থেকেছি বরাবর। ঘরই সামলেছি,এখনও সামলাচ্ছি।
এমনটাই শুনবছ আশা করেছিল পিউলি,ওর মা তেমনি বলেছে। তবুও হাল ছাড়ে না বলে,' যেটা বানিয়েছি সেটা একবার দেখে নাও,শুধু দেখো আর কিছু না। তুমি না বললে দেব না।'
পিউলি ভিডিওটা পাঠিয়েছে,কমলেশই কম্পিউটার খুলে দিয়েছে দেখার জন্য। তাঁর সহকারীদ্বয় আর মুক্ত পাঠশালার ছাত্রীরাও কয়েকজন ঘরে..মিনতিদেবী নির্বাক হয়ে দেখেন নিজেকে স্ক্রীনে আর তার সাথে তার কাজের খুঁটিনাটি এবং বৌমার মুখে শাশুড়ির কথা।
হঠাৎই কেন যেন চোখটা ছলছলিয়ে ওঠে,সত্যিই যদি রিয়েল লাইফ রীলের মতই হত। কত দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছিল রিয়েল লাইফে,মাঝখানে কত মনোমালিন্য,অভিযোগ আর সঙ্কোচ তা নিমেষেই মুছে দিল রীল। কত প্রশংসা ঝরে পড়ছে বৌমার মুখে,আচ্ছা এগুলো কী সব সত্যিকারের?নাকি ছায়াছবির মত শুধুই ছায়া আর ছবি?..পিউলির মুখের কথাগুলো স্বপ্নের মত শোনালো তাঁর কানে। এত ভালো ভালো কথা হয়ত মেয়েমানুষের কপালে আজন্ম জোটে না..আবছা চশমাটা মুছতে মুছতে ভাবলেন এগুলো কী সত্যি মানে রিয়াল? নাকি সবই রীল?
-'
Comments
Post a Comment