প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।
সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়
একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার।
ডাক ছাড়লাম,
-' হ্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি?
ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ্যাঁ,মা এখন কি করছো?
উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'
ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'
এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ্য মেয়েই বলেছে..'বেড়াতে গেছো,ভালো করে বেড়াও।'
তাই আমি ঢোক গিললাম,' চোদ্দশাক কবে? কি করবি? তুই তো শাক খাস না তেমন?
ওপাশ থেকে ধমকের সুর এলো,' মা আজকে নয়,কালকে। তুমি সব ভুলে গেছো। আজ তো ধনতেরাস।'
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম,' ও হ্যাঁ তাই তো।'
-' আমি ধনতেরাসের জিনিস কিনেছি।'
চোখ কপালে উঠলো,কী গয়না কিনলি আবার!
-' মা,গয়না নয়। কর্পূর,ধনে আর নুন আর মাসিদের জন্য মিষ্টি। মাসি মানে আমার গৃহসহায়িকারা।'
আমি চুপ করে শুনে,আবার বললাম তা চোদ্দশাক কিনে কী হবে? কাল একটু প্রদীপ ধরিয়ে দিস বরং।'
ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো,' চোদ্দশাক কেমন ভাবে পাওয়া যায় বলো। প্রদীপ আমি কিনেছি,শাকও করব।'
ওর বাবা উত্তর দিল,' বাজারে মিলিয়ে মিশিয়ে বিক্রি করে।'
-' ও আচ্ছা,তাহলে কিনে নেব বাজার থেকে।'
আবার বললাম,'কী দরকার তোর এত ঝামেলা করার?'
ওপাশ থেকে উত্তর এল,' তুমি তো করো মা,এবার তুমি বাড়িতে নেই তাই আমি করব।'
আমি খিলখিলিয়ে হাসলাম,' আমি তাহলে তোকে সংসারী বানিয়েই ছাড়লাম বল। তাই না?'
দেশ থেকে বিদেশের বাতাসে তরঙ্গে ভেসে ভেসে উত্তর এলো,' সত্যিই সংসারী বানালে আমায়..এই তো দুধের প্যাকেট নেই আনলাম। যা লাগছে আনছি।'
আমি আবার হাসলাম,' ভালোই হল,তোকে সংসারী করতে আমি এবার মাঝেমাঝেই বাউন্ডুলে হব।'
মিহি গলায় একটু হাসির সাথে কয়েকটা কথা ভেসে এলো কানে,' মা আমাকে সংসারী করো ক্ষতি নেই,বিয়ে দিয়ো না। তোমাদের থেকে একেবারে দূরে পাঠিয়ো না।'
মন ভারী হল,উত্তর দিতে পারলাম না চট করে। সন্তান যে নাড়ী ছেঁড়া ধন,তবুও মেয়েদের ঘরের খোঁজে কেটে যায় জীবন। আমিও এভাবেই একটু একটু করে হতে চেয়েছিলাম মায়ের মত সংসারী,তবে তেমন হয়ত হতে পারিনি। মেয়েটাও হতে চায় আমারই মতন। শুধু আঁকড়ে থাকতে চায় ঘরটুকু আর মা বাবার নিরাপদ আশ্রয়। মনে মনে বললাম আমার যেটুকু ভালো আছে সেটুকু শিখে নিয়ে ভালো থাকিস তুই মেয়ে। তবে বেশী সংসারী হতে যাস না,সংসার বড় মায়াময় জাল বড় জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে..তাই একটু বাউন্ডুলে থাকিস আমার মতই।
আমি রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী, ইচ্ছেখেয়ালে শ্রী আমার পেজ। লেখিকা হিসেবে আমার কোন পরিচিতি ছিল না তবে বাংলা আমার খুব ভালো লাগত। মাঝেমধ্যে নিজের একটা সাদা খাতায় টুকরো কথা লিখতাম।হঠাৎই বাবা চলে গেলেন,মানতে পারিনি ঘটনাটা কিছুতেই। মা আছেন তখন,একদিন একটা ঘটনার কথা লিখলাম, মা বলেছিলেন লিখতে। মাকে পড়ে শোনালাম,মা বললেন ভালো লিখেছিস। মন খারাপ করে থাকিস সবসময়,ছোটবেলা নিয়ে লেখ,বাবার কথা লেখ। মা এখানে থাকলে মাকে পড়ে শোনাতাম লেখাগুলো। লেখার নেশায় ধরে গেল,যা মনে হচ্ছে লিখছি। দেখলাম মন অনেক কিছু ভুলে থাকছে।প্রচুর চার লাইনের কোটেশন লিখি ইয়োর কোটে ইচ্ছেখেয়ালে শ্রী নাম দিয়ে যেগুলো অনেকই এখন সুপ্রভাতের কোটেশন হয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এছাড়াও লিখি অনেক একশো শব্দের গল্প। তখনই ছেলে এই পেজটা খুলে দেয়। বেশ ভুলে ভরা লেখা লিখে কখনও সমালোচিত হয়েছি যেমন তেমনই ভালোবাসা পেয়েছি অনেক মানুষের। চিরকাল নাম,যশ,খ্যাতি আর পরিচিতির বাইরে থাকতে চাওয়া একটা মানুষের জন্য এটা অনেক। একটা সময় লেখাটা নেশাতে পরিণত হয়ে গেল,যখনই সময় মিলছে লিখছি। বাসে,ট্রামে,মেট্রোতে আবার কখনও স্টেশনে বসেও। প্রচুর গ্ৰুপে পোস্ট করতাম লেখা,অনেকেই পড়তেন। প্রচুর গল্পের প্লট চুরি হত,আবার বিখ্যাত কেউ আমার গল্পের প্লট নিয়েছেন এমনও দেখেছি। কিছু ইউটিউব চ্যানেল কোন অনুমতি না নিয়েই প্রায় সত্তর আশিটি গল্প পাঠ করে ফেললো এমন কত কী! অথচ আমি চোখের ওপর আর মনের ওপর কতটা চাপ নিয়ে সেগুলো লিখেছি দিনের পর দিন,রাতের পর রাত ধরে। প্রচুর গল্প লিখেছি,লিখেছি কিছু উপন্যাসও। খান তিনেক বইও বেরিয়েছে আমার তবে সবটাই ছিল প্রকাশকের উদ্যোগ,আমার আগ্ৰহ কম ছিল। কারণ আমি সঙ্কুচিত হয়েছি আমার লেখা বই কতটা চলবে এই ভাবনা নিয়ে। রয়্যালিটি হিসেবে কিছু টাকা পেয়েছি যার অঙ্ক খুবই সামান্য,কোন ক্ষেত্রে সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার উপন্যাস লিখে সেই সামান্য টাকা পেতেও দিনের পর দিন পার হয়ে গেছে।
লিখতে এখনও ভালো লাগে তবে একটা সময় পরে কেন যেন মনে হয়েছিল কোন নেশাই বোধহয় বেশি থাকা ভালো নয় যেহেতু পাশাপাশি আমার একটা পেশাও আছে তার সাথে আছে সংসার। যদিও ছেলেমেয়েদের পুরো সময় দিয়ে একসময় মানুষ করেছি এখন তারা অনেকটাই বড়। তবুও নিজের মানসিক চাপ বেশি বাড়বে এমন কাজ করব না ঠিক করলাম। তাই ঠিক করলাম জোর করে কিছু করব না,যখন ইচ্ছে করবে লিখব। যখন ইচ্ছে করবে না লিখব না। অবশ্য আমার মত খামখেয়ালী হওয়া খারাপ কারণ তাতে পাঠকের থেকে দূরে চলে যেতে হয়। তবুও সেই সিদ্ধান্তই নিলাম। বেড়াতে ভালোবাসতাম ছোটবেলা থেকেই,বাবা খুব বেড়াতে ভালোবাসতেন। বিয়ের পর দেখলাম বরও খুব বেড়াতে ভালোবাসে সুতরাং প্রতিবছরই যাওয়া হত কোথাও না কোথাও। কিছুদিন হল উনি অবসর নিয়েছেন সুতরাং এখন বেরোনো আরেকটু বেশি হয়েছে। আগে যা ছবি তোলা হত তা প্রিন্ট হত,এখন ফোনের জন্য ছবি প্রচুর তোলা হয়। ভিডিও করা হয়..অবশ্য এই ভিডিওর নেশা কিছুটা ছেলে ধরিয়েছে,যদিও তার কড়া ট্রেনিংয়েও আমি তেমন দক্ষ হতে পারিনি তবুও চেষ্টা করি যেখানে ওরা থাকে না সাথে সেখানকার কিছু ছবি ও ভিডিও তুলে আনতে।
গতবার গ্ৰীসে গিয়ে বেড়ানোর মাঝামাঝি সময়ে বিপদে পড়লাম, ফোন বলে স্টোরেজ নেই। ছেলে ভিডিও কলে বসলো,বললো কিছু ফটো সরাও আইক্লাউডে। তো যা হয়,যা ভালো লাগে সেটাই তুলে ফেলি পরে আর রাখা যায় না এত ছবি। মুছতেও ইচ্ছে করে না,সুতরাং কিছু মেঘের দেশে পাঠানো,কিছু তালা মেরে রাখা আর কিছু পোস্ট করা।
অনেকদিন লেখা দেওয়া হয় না,আমার পেজটা শীত ঘুমে চলে গিয়েছিল প্রায়। ছবি দেওয়াতে দেখলাম বেশ চনমনে হল,ফলোয়ার্স বাড়লো। কিন্তু একটা সময়ের পর দেখলাম সবাই বলে গিভ মি মোর..আর না দিতে পারলেই কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামায় নীচে,সে লেখার প্ল্যাটফর্ম হোক,ফেসবুকের হোক বা জীবনের হোক। আমার ছবি বা ভিডিও দেওয়ার পেছনে কোন রোজগারের উদ্দেশ্য নেই,কারণ তেমন কোন কন্টেন্ট আমি পোস্ট করি না। আর ঈশ্বর যেটুকু আমাকে দিয়েছেন তাতেই আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।
আমি আমাদের বেশিরভাগ ভিডিওগুলো রেখে দিই এগুলো থাকবে বেঁচে বলে,কখনও ইচ্ছে হলে পরে দেখতে পারব বলে। আর যারা বেড়াতে যেতে ভালোবাসেন বা দেখতে ভালোবাসেন তারাও যাতে দেখতে পারেন।
জীবন যুদ্ধের ক্ষেত্রে মা বাবার কাছছাড়া হওয়ার পর থেকে নিজের পায়ের তলার মাটিটুকু নিজেই শক্ত করেছি অনেক লড়াই করে,আর সেটুকু সম্ভব হয়েছে আমার চাকরিটা ছিল বলেই। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মানুষজন প্রচুর ছিল জীবনে,ছিল নীচু দেখানোর মানুষজনও। জীবনে অনেক কিছু না থাকার কারণে,গরীব হওয়ার কারণে প্রচুর অসম্মানিত হয়েছি ঘরে এবং বাইরে। তবুও কখনও কারও ক্ষতি চাইনি বা কোন মানুষের কিছু দেখে লোভ আর হিংসা করিনি। আজও তাই চাই ঈশ্বর ভালো রাখুন সবাইকে,আর আমিও যেন সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে পারি। এইটুকুই চাওয়া,এছাড়া বাড়তি কিছুই পাওয়ার ইচ্ছে,লোভ আমার কিছুই নেই..নেই কাউকে কিছু দেখানোর ইচ্ছেও।
মেয়েগুলো বিশ্বকাপ জিতেছে সবার প্রোফাইল জুড়ে মেয়েদের জিতের ছবি বেশ ভালো লাগছে। সমাজে প্রতিনিয়ত যাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়,দরকারে শারীরিক হেনস্থা বা শ্লীলতাহানি করে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যতই গর্ব করোনা কেন নারী তুমি দূর্বল,ইচ্ছে করলেই তোমার গর্বকে পিষে ফেলা যায়। তবে সত্যিই তো নিজের জয়ের কথা শুনতে কে না চায়? কিন্তু কজন দিতে পারে নারীকে জয়ের শিরোপা? পদবী আর গোত্র বদল,বাড়ি বদল,মন বদল আর নিজের অনেকটা বদলাতে বদলাতে কে জানে কতটা পড়ে থাকে মেয়েদের নিজের ভাগে। তাই আমাদের এই পোড়া দেশের মেয়েগুলোর জয়ের খবরে মনটা ভরে উঠলো। এমন জয়জয়াকার ধ্বনি কজনের কপালে জোটে? উপার্জনক্ষম নারীও কী বলতে পারে এই বাড়ি আমি বানিয়েছি,এই গাড়ি আমার টাকায় কেনা..সংসারে আমার অবদান বেশি। তাই একটু আদর আর যত্ন আমারও পাওনা। নিজের মনের কথা কজন বলতে পারে? কজনই বা পায় তার প্রাপ্য সম্মানটুকু? অনেক কিছু সয়েও যে কচিমুখগুলোকে সে বড় করে আশা রাখে হয়ত তারা একদিন মাকে দেবে তার প্রাপ্য সম্মান,নিজের রক্ত অন্য কথা বলবে তা হয় নাকি? তবুও প্রতিনিয়ত কত গল্প লেখা হয় যা হয়ত লেখার কথা ছিল না বা এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। আগের দিনের মেয়েদের কম বয়েসে রান্নাঘর আর বেশি বয়েসে ঠাকুর ঘরেই কেটে যেত অনেকটা সময়। এখন মাঝেমাঝে গভীর ভাবে ভাবি আর তখন বুঝতে পারি একটা সময় ঘোর সংসারী মেয়েদের বোধহয় শেষ সময়ে সব বলার জায়গা একমাত্র ঐ ঠাকুরের সামনে বসার আসনটুকুতেই হয়। মুখোমুখি থাকে দুজন। একজন ভক্ত আর আরেকজন ভগবান,ভক্ত মনে মনে কত কী বলে যায়,কখনও সে কাঁদে মনের দুঃখে। আর একজন নির্বাক শ্রোতা,তবুও মানুষ আর্জি জানায় আর মনের কথা তাঁরই কাছে বলে কারণ সে তখন শেষ আশ্রয়টুকু ধরে খড়কুটোর মত যে প্রতিকার না করতে পারলেও তিরস্কার আর লাঞ্ছনা দেবে না।
গতকাল একটা সিনেমা দেখছিলাম নামটা বেশ মজার..কাঁঠাল,শুনলাম জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছে। একজন এম,এলের বাড়ির গাছ থেকে দুটো কাঁঠাল চুরি হয়েছে তার জন্য তৎপর প্রশাসন অথচ একজন নীচু জাতির মানুষের মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছে সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই.. শেষে ঐ মেয়েই কাঁঠাল চুরি করেছে এমন কথা মহিলা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর বলাতে মেয়েটা উদ্ধার হল। আরও মজার মহিলা ইন্সপেক্টর যাকে ভালোবাসে ছেলেটি হাবিলদার তার প্রমোশন হয়নি,কিন্তু মেয়েটির প্রমোশন হয়েছে বলে ছেলের বাড়ির লোক তার সাথে ছেলের বিয়ে দেবে না। ভালোবাসা বাঁচাতে মহিলা ইন্সপেক্টর নিজের প্রোমোশন না চেয়ে ছেলেটির প্রমোশন চাইছে।
সেই দেশে স্মৃতির গায়ে যখন জড়িয়ে দিল তার হবু বর জাতীয় পতাকা বেশ লাগলো দেখতে। আমি মনে যা আসে হিজিবিজি লিখি,জানি সেসব পাতে দেওয়া যায় না। কিছু আবার আমার নিজের দুঃখবিলাসও। আসলে অল্পে খুশি হওয়া মানুষগুলো অল্পে দুঃখও পায় কারণ তাদের মধ্যে মন নামক বস্তুটিকে হাজার চেষ্টা করেও সে মেরে ফেলতে পারেনি।
কাল ছেলে একটা স্ক্রীনশট পাঠালো,মেটা নাকি আমাকে চিনেছে। আমার এই হাজিবাজি লেখা নিয়ে সে একটা ছোটখাটো কমপ্লিমেন্ট দিয়েছে। একটু অবাকই লাগলো। মেয়ে বললো বাবাকে দেখাও,বললাম না...কেন বললাম? এখানে বলব জানি না। তবুও মনে মনে সবই জানি,কিন্তু যা জানি সব বোধহয় বলা যায় না।
ভালো থাকুক সবাই সবার মত..আর দেশের মুখ আলো করতে পারে মেয়েরাও। তাই মেয়েদের নিজেদেরও যেমন উচিত নিজেদের জায়গাটা করে নেওয়া,আর পরিবার এবং সমাজেরও উচিত তাদের মধ্যেকার আগুনটাকে জ্বালাতে সাহায্য করা। যার মধ্যে যেটুকু প্রতিভা আছে সেটুকুকে নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা। ঠাট্টা,তামাশা বা তাচ্ছিল্যের দমকা হাওয়া দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া নয়।
আমি সাধারণতঃ সাড়ে এগারোটায় বিছানায় যাবার চেষ্টা করি,তারপর ঘুম এলে ভালো আর নাহলে উশখুশ করা আর নিজেই নিজেকে ছড়া শোনানো আয় ঘুম আয়...ঠিক সেই সময়েই ফোন বাজতে লাগলো। দেখলাম প্রায় বারোটা বাজে,স্ক্রীনে দেখালো বিএলও অফিসারের ফোন। অগত্যা ধরলাম ভয়ে ভয়ে,ভদ্রলোক বলললেন আমার অভিভাবকের জায়গায় বরমশাই নিজের নাম লিখে দিয়েছেন,সেখানে বাবার নাম হবে। আমি যদি আমার বাবার নাম বলি তাহলে উনি সংশোধন করে দেবেন। আমার বর্তমান অভিভাবক বরমশাই তখন মৃদুমন্দ নাসিকা গর্জনে মগ্ন হয়ে ঘুমসুখ উপভোগ করছেন। তাই তাকে বিরক্ত না করে পরলোকগত বাবার নামের বানান আর পদবী বলে দিলাম। অবশ্যই ভালো লাগলো এই ভেবে যে এখনও তিনি আছেন কেয়ার অফ হয়ে। আমাদের মেয়েবেলার চিঠিপত্র আসত কেয়ার অফ বাবা হয়ে। তখন বাবা দ্য বস্..এটা কোরনা,সেটা কোরনা করলেও সেই শাসনে ছিল অপার স্নেহ। আজই বলছিলাম মাছের মাথা চিবুতে চিবুতে বরকে,ভাগ্যিস বাবা মাছের মাথা খেতে শিখিয়েছিল হাতে ধরে নাহলে এবাড়িতে মাছের মাথা তো কেউই খায় না। তখন অবশ্য বাবা রুইয়ের মাথার ঘিলু খাইয়ে আমার মাথার ঘিলুকে শান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে বিয়ের পর এতবছর সংসার করতে করতে বুঝেছি বেশি ঘিলুওয়ালা ইস্তিরি লোক আবার পুরুষের একটু অপছন্দ। বৌ মানে হবে একটু ন্যাকা বোকা,এটা পারি না,সেটা পারি না,আহ্লাদী,মুখ বুজে বকাঝকা সহ্য করে তাহলে বেশ।
যতই আমরা নারীদিবসে নারী দ্য বস বলিনা কেন আসলে এখনও সমাজে পুরুষ দ্য বস্..মানে বাবা দ্য বস্,বর দ্য বস্ আর ছেলে দ্য বস্। আর আমরা ভালোবেসেই তাদের বসরূপী ভগবান মেনে দিন কাটিয়ে যাই আনন্দে। আমাদের কাছে বাবারা ছাতা,পতি দেবতা( শাস্ত্রবাক্য) আর পুত্র শেষ বয়েসের ত্রাতা। এটাই জীবন,আর এভাবেই জীবন চলে এসেছে বহুকাল আগে থেকে আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি বসেদের শাসনেই। হয়ত সমীকরণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাল্টেছে যেমন বাবা দ্য বস আর বেটা দ্য বস্ একসাথে ককটেল পার্টিতে বা বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছে হাতে গ্লাস নিয়ে,দিদাদের আমলের পতি দ্য বস এখন আপনি সম্বোধন থেকে তুইয়ে এসেছে কিন্তু তবুও পুরুষ তোমাকেই মর্যাদা দিয়ে আর উঁচু পোস্টে আমরা রেখে দিয়েছি কিছুটা সম্মান আর ভালোবেসে আর কিছুটা অভ্যেসে।
তবে ম্যান দ্য বস্,জানো তো বসের অনেক দায়িত্ব, সুতরাং সম্মান পাওয়ার পাশাপাশি সম্মান দিয়ো। নিজেকে অভিভাবকের জায়গাতে এমনি এমনি রেখো না,কেয়ার অফ হতে গেলে কেয়ারিং জরুরী... তা তুমি পিতা,পতি আর পুত্র যেই হও না কেন? আজও খবরে চোখ গেলো আর শিউড়ে উঠলাম কেয়ার অফ বস স্বামী স্ত্রীকে জুয়াতে বাজি রাখায় আটজন ধর্ষণ করেছে তাকে। তারপর তার বাড়ির শ্বশুর,বর,ভাসুরও...আজও লাঞ্ছিতা দ্রৌপদী তবে কৃষ্ণ আর আসে না।
পুরুষ দিবসে একটা কথাই বলতে চাই...
'ভালো থাক পুরুষ,ভালো থাক নারী,
সবাই মিলে আমরা যেন সুস্থ সমাজ
গড়ে তুলতে পারি।
ম্যান তুমি বস হয়েই থাকো,
সাথে রেখো একটা ভালো মন।
তোমাকে ঘিরে যেন ভালো থাকে,
তোমারই সকল আপনজন।
Comments
Post a Comment