Skip to main content

চরৈবেতি

#চরৈবেতি#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#

পুরোনো আ্যলবামের পাতা ওল্টান শুভময়,আজকাল ওটাই হয়েছে পরম সঙ্গী। কত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুহূর্তে মন চলে যায় পাখা মেলে প্রজাপতির মত অতীতের সৌরভ নিতে। বরানগরের শান্তিছায়াতে এসেছেন বছর পাঁচেক আগে।ছেলে ছেলের বৌমা নিয়ে সংসার করার খুব ইচ্ছে ছিলো সুনন্দার। কিন্তু কেন যেন অনেক ভালোবাসা দিয়ে ছেলেকে মানুষ করলেও একসময় হারিয়ে গিয়েছিলো ওদের সব শিক্ষা। একটু একটু করে নিজের মত হয়ে গিয়েছিলো দুর্জয়। পড়াশোনায় ভালো হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছনোর সাথে সাথে একটু একটু করে সরে গিয়েছিলো ওদের কাছ থেকে। লুকিয়ে কাঁদতো সুনন্দা,কখনও পুজো করতে করতে দুচোখ দিয়ে ঝরতো জল। তবে দুর্জয়ের সময় ছিলোনা মায়ের মনের কথা জানার।
       আজকাল শুভময়ের মনে হয় কি চেয়েছিলেন ওরা একমাত্র সন্তানের কাছে? মানসিক,শারীরিক বা আর্থিক সাহায‍্য? না না কোনদিনই সে দরকারই ছিলোনা ওদের বরং ওরাই যতদিন পেরেছে আর্থিক আর শারীরিক সাপোর্ট দিয়ে এসেছেন ছেলেকে। রোজগার শুরু করার সাথে সাথেই আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিলো ছেলে। নিত‍্য নতুন বান্ধবী,হোটেল রেস্টুরেন্টে খেয়ে মাঝরাতে ফেরা। কখনও গা দিয়ে ছাড়তো ঝাঁঝালো গন্ধ। আলাপ আলোচনায় কখনোই আসা যেতোনা ছেলের সাথে সবসময় লেগে যেত তর্কবিতর্ক।
    " কেন ও আমার সাথে এত খারাপ ব‍্যবহার করে বলতো?অথচ এক সময় মা ছাড়া ওর কিছুই ছিলোনা। এত রুক্ষ ব‍্যবহার করে যে মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।"..বলেই কাঁদতো সুনন্দা। " সুনন্দা আমি তো আছি নাকি? ও কি বলেছে এখানে থাকতে চায়না? আমরা ওর ব‍্যাপারে খবরদারি করি? ওকে চলে যেতে বোলো এরপর বললে। তোমার প্রতিদিনের এই মন খারাপ আর উৎকন্ঠা আমি নিতে পারিনা জাস্ট। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন‍্য গোয়াল ভালো।"
      "তুমি এমন বোলোনা,ও আমাদের একমাত্র সন্তান। ওকে ছাড়া কি করে বাঁচবো আমরা?"
  "আমরা নয় বলো তুমি। আমি বুকে পাথর বেঁধে নিয়েছি। ওহ্ বোকা মা এবার একটু নিজের দিকে তাকাও। চলতো সামনের সামারে আমরা ইউরোপ ঘুরে আসি বরং।"
         আ্যলবাম জুড়ে কত ছবি,একটা সময় দুর্জয়কে কোলে করে সুনন্দা আবার কখনও ছোট্ট দুর্জয় জড়িয়ে ধরে আছে মাকে। আবার পরের ছবিতে ওরা দুজন দূরে দাঁড়িয়ে ছেলে তারপর একটা সময় ছেলে নেই আর ছবিতে। দুর্জয় চলে গিয়েছিলো,বৌমাকে দোষ দেননি ওরা। ছেলেই দূরে সরে গেছে এসেছে অনেক চরিত্রের দোষ তাই ওদের দূরে থাকাই ভালো। চোখের ওপর সন্তানের ক্ষয় আর অসম্মানিত হওয়ার চিত্র নাইবা দেখলেন। একটু স্বার্থপর হয়েছিলেন নিজেও।"শোন আমাদের আর তোমার সঙ্গে থাকা সম্ভব হচ্ছেনা। আঠাশ বছর তোমাকে নিয়ে অনেক সয়েছি,কিছুই পাইনি।পেয়েছি অসম্মান,অপমান আর শুধুই ব‍্যবহৃত হয়েছি নানাভাবে।"
              এছাড়া হয়ত আর কোন উপায় ছিলোনা। দুজনেই গিয়ে দেহদান করে এসেছিলেন হসপিটালে। তবে সুনন্দা ক্রিটিক্যাল বোকা বাঙালি মা বাঁচেনি বেশিদিন,ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েছিলো খুব তাড়াতাড়ি। কত প্ল্যান ছিলো শুভময়ের সেকেন্ড ইনিংস খেলবেন চুটিয়ে আবার প্রেম সুনন্দার সঙ্গে। ঘুরে বেড়াবেন মিয়া বিবি যেখানে খুশি একদম বাঁধনহারা হয়ে। মর্নিং ওয়াক করে নিজেকে ফিট রেখেছিলেন পাশে সুনন্দাকেও বেশ লাগতো। মনে একরাশ চাপা কষ্ট নিয়ে হাসতো বেচারা। সন্তান না হওয়ার এক জ্বালা আর কুসন্তান হওয়ার বোধহয় সহস্র জ্বালা। একটা সময় ছেলের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার মা হয়নি সুনন্দা। পরে একটা সময় বলতো," ইশ্ আমাদের যদি একটা মেয়ে থাকতো বেশ হত বলো। মা বাবার মনের কাছে বোধহয় শুধুই মেয়েরা থাকতে পারে তাইনা।"
" আরে সুনন্দা আমরা অত লাকি নই,কে বলতে পারে তোমার মেয়ে তোমাকে অসম্মান করতনা।"
               আ্যলবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে থেমে যান শুভময়,এই ছবিটাতে ছোট দুর্জয়কে যে কি সরল আর সুন্দর লাগছে বলার নেই আর তার পাশে লালপাড় ঢাকাই পরে সুনন্দা।যেন দুর্গা আর গণেশ,দুর্জয়ের হাতে ভেঁপু রথ টানছে। আরেকটা ছবিতে শুভময় রথ সাজাচ্ছেন।সত‍্যি একটা সময় কিছু বায়না ছিলো ছেলের এই রথ নিয়ে। আর ওনার নিজেরও বা কি কম ছিলো?সুনন্দা মজা করে বলতো," রথ সাজানোর শখ তো তোমার আর নাম ছেলের।"ঠাকুমা দাদু আর পাড়ার লোকজনের মধ‍্যে কুচো ছেলের দল বেরোতো রথ নিয়ে। ওহ্ কি মজা! ছোট ছোট প্রাপ্তি কত সুখের বাতাস এনে দিতো নিম্ন মধ‍্যবিত্ত জীবনে। একটা সময় সুনন্দাকে বলতেন," কম মাইনে ছিলো তখন,তোমাকে ভালো কিছু দিতে পারিনি তবুও সুখটা ছিলো।এখন প্রাচুর্যের স্রোতে সুখটা যে কোথায় ভেসে গেলো কে জানে!"
               বৃদ্ধাশ্রমে চলে এসেছেন সুনন্দা চলে যাবার পরই। ধুসস্ সুনন্দার গন্ধ বড় বেশি ভাসতো বাড়িটাতে,তারপর বাজার করো, রান্নার লোক রাখো হাজারটা হ‍্যাপা। তার চেয়ে এই বেশ ভালো। শুভময় একটু বেশিই কড়া বোধহয়,তাই ছেলের কাছে কখনও নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করেননি। আর সুনন্দার শেষকাজ তেমন ছিলোনা,যেটুকু করেছেন নিজেই করেছেন। তারপর কিছুদিনের মধ‍্যেই চলে এসেছেন বরানগরে গঙ্গার ধারে এই বৃদ্ধাশ্রমে,ছাদে উঠে বারান্দায় বসে শোনা যায় অতল জলরাশির কলধ্বনি।
               আ্যলবামটা রেখেই জাস্ট একটা আইডিয়া মাথায় খেলে যায়। ডাক ছাড়েন," হরিহর বাবা একটু এদিকে এসো দেখি।" হরিহরকে বলে দেন," শোন বাজারে যা,দেখবি সবচেয়ে বেশী উঁচু যে রথটা হবে মানে তিনতলা চারতলা যা পাবি আনবি। আর সাথে ঠাকুর,গাছপালা,মালা,বাতাসা,কদমা,মিষ্টি সব সব।".." কি হবে বাবু,এসব? আপনার কোন নাতিপুতি আসছে নাকি আজ?"
" যা বলছি তাই কর তো,কেন আমার শখ আহ্লাদ নেই নাকি। বুড়ো হয়েছি বলে কি শখও মরে গেছে নাকি? আরে বাঁচবো আরও ভালো করে বাঁচবো। দ্বিতীয় শৈশবে পা রাখছি যে।"
..." সেটা আবার কি বাবু? আপনার জন্মদিন নাকি?"
" ও তুই বুঝবিনা,যা তাড়াতাড়ি যা যা বলেছি নিয়ে আয়।"
            রথ সাজাতে বসেছেন শুভময়,সাথে আছে একদল দ্বিতীয় শৈশবে পা রাখা কচি মনের মানুষ। অনেকেই খুব নষ্টালজিক আজ,কত স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে সবার।
           শুভময় রথের দড়ি ধরে টান মারেন সাথে একদল হাসিমুখ। উলু আর শঙ্খধ্বনিও শোনা যাচ্ছে। ললিতাদি ভীষণ ভালো উলু দেন। এগিয়ে চলেছেন জগন্নাথ,জগতের নাথ আজ নেমে এসেছেন মাটিতে ভক্তদের জন‍্য। শুভময় বিড়বিড় করে বলেন," জয় জগন্নাথ,জীবন রথের চাকা এভাবেই যেন ঘুরতে থাকে তোমার আশীষে। সব দুঃখ হাসিমুখে যেন জয় করতে পারি। চরৈবেতি...এগিয়ে চলাই জীবন। জীবনকে কারো জন‍্য থামিয়ে রেখোনা।"©ইচ্ছেখেয়ালে শ্রী।
ভালো লাগলে লেখিকার নাম সহ শেয়ার করুন।
সমাপ্ত:
            

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।