Skip to main content
সালটা দুহাজার এগারো,মেয়েটা তখন বেশ ছোট,ছেলেটা সে বছরেই কলেজে ঢুকেছে। আর আমার মেয়ের কথায় আমরা তখন খুব গরীব ছিলাম। তবে সে আরও বলে তখন আমাদের মুঠোতে সুখ ছিল,আমরা তখন বেঁধে বেঁধে ছিলাম। ডাইনিং স্পেশে পাতা পুরোনো সোফাটায় আমি বসে শনিবার রাতে ডিডি ন‍্যাশনালে সিনেমা দেখতাম আর বুধবারে দেখতাম চিত্রহার। কখনও ওরাও এসে বসত আমার কোলে পিঠে,একসাথে বসে আমাদের চলত কত কথা আর ওদের দুই ভাইবোনের খুনশুটি। কখনও বা ঝগড়া আর মারামারিও হত,ধুপধাপ তাল পড়ত পিঠে। ওদের বাবা অফিস থেকে এলে দুজনেই উৎসুক হয়ে তাকাতো বাবার হাতের দিকে,তারপর পড়ার মাঝে জুটত ব্রেক বাবার আসার উপলক্ষে চপ,বেগুনী আর চুরমুর সেলিব্রেশনে। আমাদের হাতে তখন ফোন এলেও মুঠোতে বিশ্ব ছিল না,ছিল না ফেসবুক পাড়ায় যখন তখন ভ্রমণ। আমরা একই ছাদের তলায় বাস করেও আলাদা ছিলাম না,আমাদের অনলাইন শপিং ছিল না তখন তাই ছেলেমেয়েদের নিয়ে শপিং করে কিছু খেয়ে ফেরার দিনগুলো খুব আনন্দের ছিল। ছেলের দীর্ঘ পরীক্ষার সমাপ্তির পর আমরা চলে গিয়েছিলাম তালসারিতে। গত দুদিন ধরে তালসারির কথা এত পড়ছি যে আজ হঠাৎই মনে হল আমরাও তো গেছিলাম তালসারিতে। ছবিগুলো অ্যালবাম করে রাখা ছিল বলে পেলাম। আমাদের মধ‍্যবিত্ত পরিবারের একটু হাঁফ ছেড়ে খুশিতে বাঁচার কিছু মুহূর্ত আজ আবার দেখলাম। দেখলাম নিজেকেও,ভোরবেলায় সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে গিয়ে হাতে জাল নিয়ে ছবিটাও বেশ লাগলো দেখতে।
 তখন তালসারিতে আর কী হোটেল ছিল ঠিক মনে নেই,আমরা উঠেছিলাম ওড়িশা গভর্মেন্টের পান্থনিবাসে,তখন সেটার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তবুও ঐ যে মুঠোয় তখন ফোনের বদলে ছিল অল্পেই সুখের চাবির ছড়া। তাই বেশ কেটে গিয়েছিল একটা দিন ছেলেমেয়েদের সাথে সমুদ্রের বালি মাটিতে হেঁটে আর লাল কাঁকড়ার তিড়িং বিড়িং দেখে। প্রথম দিন যখন গিয়ে পৌঁছোলাম তখন সমুদ্রে ভাঁটা তাই চারজনে বাইকে চড়ে চুল উড়িয়ে চলে গিয়েছিলাম সমুদ্রের কাছাকাছি। মেয়েটা কত খুশি তখন! বিকেলে একটু করে জল বাড়ছে আমরা একটু হেঁটে লাল কাঁকড়া দেখতে দেখতে চলে গিয়েছিলাম জলের কাছাকাছি। তারপর সূর্যাস্ত দেখে আবার ঝাউবনের পাশ দিয়ে হেঁটে ফিরে এসেছিলাম হোটেলে। পরদিন ভোরে চারজন আবার গেছিলাম সমুদ্রের পাড়ে,তখন ছিপছিপে বৃষ্টির মিষ্টি জলে তেষ্টা মেটাচ্ছে সমুদ্র আর আমাদের মাথায় ছাতা। সেই ছাতা উড়িয়ে সমুদ্রের জলে ছবি তুলেছিলাম মা আর ছেলে। ওরা বাপ বেটা আরেকটু বেশি জলে গিয়েছিল ঢেউ মাখবে বলে,একটু দূরে ভাসছিল নৌকো। কিছুক্ষণ সমুদ্রের শোভা দেখে,বালি আর নোনাজল মেখে আমরা ফিরেছিলাম হোটেলের দিকে। ফেরার পথে মেয়ের জুতো ছিড়লো,সে মোটেই বালিতে পা দেবে না শেষে দাদার কোলে চেপে এল হোটেলে। কত স্মৃতি,আর কত কথা আজ ঘুরে ফিরে এল। তার সাথে অ্যালবামের ছবিগুলো দেখে ভয় হল মনে,ভীষণ ভয় হল জলের মধ‍্যে ছেলেটাকে লাফাতে দেখে আর সমুদ্রের ঢেউ ভাঙতে দেখে বাবার সাথে। এবার তাজপুর গিয়ে হঠাৎই সাধ হয়েছিল আরেকবার তালসারিতে যাবার..এখন মনে হয় থাক। 
এই কদিন অনেক কথা জানিয়েছি সমুদ্রের কাছে..কত কী দিয়েছো,আবার নিয়েছো কত কিছু..কী দরকার ছিল তরতাজা জীবন কেড়ে নিয়ে নিজেকে কলঙ্কিত করার? তুমি যে বিশাল,এমন ক্ষুদ্র কাজ কী সত‍্যিই তুমি করেছো? নাকি ষড়যন্ত্র?কে জানে? আজকাল মনটা বিষাক্ত হয়ে গেছে বিষ গিলে গিলে সবেতেই তাই যেন চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাই।
 কত লেখাই চোখে পড়ছে,মানুষ মৃত্যুর পর বোধহয় আরও বেশি প্রিয় হয়ে যায়। নাকি এখানেও অন‍্য কিছু? নাহ্ সে আলোচনায় যাচ্ছি না,তবে আর দেখতে চাই না মৃতদেহের ছবি দেখিয়ে নিজেদের সাবস্ক্রাইব করতে বলার মত সস্তা পোস্ট। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা ঐরকম হয়ে যাচ্ছি না তো? যাদের নজর থাকে.... থাক আর বললাম না। যাদের চলে যাওয়ার কথা ছিল না,তারা চলে যাচ্ছে। রহস‍্যের উদ্ঘাটন হচ্ছে না,একটা সময় সবই চাপা পড়ে যায়। শুধু যাদের যায় তাদের যায়,শোক তাদের ঘিরে রাখে আমৃত্যু। তালসারি তুমি এভাবে বিখ‍্যাত না হলেই ভালো লাগত।

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।