Skip to main content

self care

আজকাল একটা কথা খুব শোনা যায় নিজেকে ভালো রাখার কথা। হয়ত বা আমাদের প্রজন্মের মানুষজন এই সেল্ফ কেয়ারের দিকে ঝুঁকেছি একটু হলেও যখন আমরা অনেকেই প্রায় আধবুড়ি। আমাদের পরের প্রজন্ম তার পরের আর তারও পরের প্রজন্ম যা পনেরোতে শিখেছে আমরা শেখার চেষ্টা করছি পঞ্চাশ পেরিয়ে তাও আবার নেটদুনিয়ায় এসে।অথচ এই সেল্ফ কেয়ারের বুলি আমাদের ঠাকুমা,দিদা তো জানতেনই না এমনকি আমাদের মা,কাকিমা,মামিমারাও তেমনভাবে জানতেন না যাদের বয়েস এখন সত্তর থেকে আশির মধ‍্যে। আমার মা বেঁচে থাকলে তাঁরও বয়েস আশি হত এই বছরেই। বসে বসে কত কী ভাবি,মা বাবা থাকলে এই বছর তাদের কত বয়েস হত এইসব আরও কত কী। মাকে কোনদিন দেখিনি সেল্ফ কেয়ার করতে,নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে আমার আমি সবচেয়ে দামি বলতে। অথচ মায়ের হাতে টাকা ছিল,সরকারি চাকরি করতেন। কিন্তু তেমনভাবে শাড়ি গয়না কিনতে দেখিনি যেমন আমি কিনি,প্রচুর বাজে খরচ করি জাঙ্ক জুয়েলারী কিনে। এটা অবশ‍্য মায়ের কথা ছিল,মা বলতেন এসব না কিনে টাকা জমিয়ে রাখ পরে ছোটখাটো হলেও সোনার কিছু কিনবি। হেসে বলেছি ধুর অত টাকা কোথায় পাবো? সোনা কিনব যা দিয়ে তাতে কুড়িটা ভালো ইমিটেশন হয়ে যাবে। এখন বুঝি তা কতটা সত‍্যি ছিল। আবার কখনও মনে হয় মায়ের কথাও মিথ‍্যে ছিল,জীবন যা চেয়েছে তাই তাকে দিয়েছি এর মধ্যে বাজে খরচের আবার কী? পরে কিনব,সোনা কিনব,টাকা জমাবো,সব পরে হবে এসব ভেবে কত সময়ই তো পেরিয়ে গেছে তবুও অন্ততঃ ফুরোনোর আগে যদি তাকে ধরা যায়। আর এখানেই মায়ের সাথে তার পরের প্রজন্ম আমার ফারাক ছিল,আর এই ফারাক তো বাড়তেই থাকবে যত সময় পেরোবে এটাই স্বাভাবিক। ডিপ কালারের শাড়ি পরতে মা কী কুন্ঠিত হতেন,অথচ সাদাও পছন্দ করতেন না,কিন্তু ঐ যে লোকে কী বলবে সেই কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। ছোট থেকে মনে গেঁথে গেছিল কালোদের আর শ‍্যামলাদের ডিপ রঙ পরতে নেই।  আর আমি পনেরো পেরোনোর পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার চোখ দিয়ে দেখেছিলাম ডিপ রঙেই কালোদের বেশি ভালো লাগে। মায়ের জন‍্য কিনেছিলাম অথচ মা পরেনি একটু অন‍্যরকম রঙ বলে এমন কিছু শাড়ি আমার আলমারিতে আছে এখনও। মা সবাইকে খুশি করে খুশি হতেন,মায়ের কোয়ালিটি টাইমেও ছিল অন‍্যকে ভালো রাখার শপথ,তখন উনি বসে বসে আলু ভাজা কাটতেন,সন্দেশ বানাতেন,বড়ি দিতেন,আচার বানাতেন। কাউকে খেতে বললে তার জন‍্য ভালোমন্দ রাঁধতেন তারপর সবাই যখন ভালো বলত তখন ঘাম মুছে একটা পরিতৃপ্তির হাসি হাসতেন। একেক সময় তবে তাঁরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে দেখেছি যখন বাবা একগাদা কুচো মাছ বা অনেক সবজি আনতেন তখন। এখন বুঝি আর পেরে উঠতেন না,হাঁপ ধরে যেত খাটুনিতে।
    মায়েদের সময়টা একটু আলাদা ছিল,তার থেকেও আলাদা ছিল দিদা ঠাকুমাদেরও। তারা যেমন তাদের শ্বশুরবাড়ির জন‍্য করেছেন তারাও তেমন নিজেদের জীবনে বৌমাদের সেবা নিয়েছেন,ছেলেমেয়েদের শ্রদ্ধা সম্মান আর সাহায্য পেয়েছেন। তাদের জীবনে রিটায়ারমেন্ট ছিল একটা সময় হেঁসেল থেকে। আমাদের সময়টা একটু আলাদা,আমরা উভয়পক্ষের দ্বারা পরিচালিত। একটা সময় শ্বশুরবাড়ির মানুষজনকে খুশি করেছি,বাবা মায়ের কথা শুনে চলেছি কখনও বা অকারণেই বেশি শাসিত হয়েছি। মানে আগের প্রজন্মকে খুশি করেছি প্রাণপণে তারপর একটা সময় পরে সন্তানদের খুশি করার চেষ্টায় প্রাণপাত করে চলেছি। তেমনভাবে দেখতে গেলে এখনকার মা বাবাদের রিটায়ারমেন্ট নেই তাই তারা চিরনবীন হয়েই থাকতে চান কারণ তারাই হাল ধরে রেখেছেন সংসারের। একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মাঝেমধ্যে বেড়াতে বেরিয়ে যান আর তারপর নিজেকে খুঁজে পেতে চান একটু স্বাদে,আহ্লাদে আর ভিডিও সেল্ফিতে সাথে অবশ‍্যই বাজে রুক যানা নহি তু কহি হারকে...
   আমাদের মেয়েদের অনেকেরই ঘরে বাইরে তেমন কদর নেই অবশ‍্য এটা তো সর্বকালের প্রাচীন গল্প,কেউ এককালে এবং এখন এই দুই কালেই শাসিত,শোষিত কথাটা বললাম না। এককালে বাবা মাকে ভয় পেয়েছেন,এখন সন্তানদের ভয় পান।এককালে তাদের খুশি করেছেন এখন সন্তানদের খুশি করে চলেছেন। কখনও বা তাদের সন্তানদেরও। সন্তানরা একটা বয়েসের পর শেকল আঁটে তাদের গতিবিধিতেও। কেউ মানতে চান না বলে অশান্তি হয়,কেউ বাধ‍্য হন মানতে। আবার কাউকে শরীর না চললেও পালন করতে হয় নানান দায়দায়িত্ব। আর তার মাঝেই তাই কখনও মন বলে চল পালাই কারণ আমরা হাঁফ ছাড়ার জন‍্য একটু কোয়ালিটি টাইম পেতে চাই। বেশি কাজ এলে আমি তো আবার কখনও রেগেমেগে বলি এইজন্যই আগের যুগে মানুষ একটা বয়েসের পর বাণপ্রস্থে চলে যেত।
  না তবুও তা হয় না,আমরা যতদিন বাঁচি সংসার নামক ইন্দ্রপ্রস্থে কাটাতে চাই আমাদের জীবনের প্রতিটা ঘন্টা মিনিট,বিরক্তিও আসে। তবু ঐ যে মায়েদের মত আমাদের অত বড় আকাশের মত মন নয়,আমরা একটু একটু করে ঘা খেয়ে মানে ঠেকে আর ঠকেও চাই আকাশটা ছুঁতে,প্রশংসা আর যত্ন পেতে আর ভালো থাকতে একদম নিজের মত করে। কিন্তু ঐযে এই ব‍্যস্ত জীবনে আপনাকে ভালো রাখার দায়িত্ব কে নেবে? সুতরাং এই কাজটিও বর্তায় আপনার ওপরেই।
 তাই ভুলেও ভাববেন না আপনি দশভুজা,ঐ খেতাবে ভূষিত একজনই কারণ তাঁকে দেবতারা সাপোর্ট করেছিলেন তাঁদের সব বাঘা বাঘা অস্ত্র দিয়ে। আপনার আমার বাপু মাত্র দুইখান হাত তা দিয়া দশভুজা হইবেন কি কইর‍্যা? 
 আমাদের ইউনিভার্সিটিতে পুড়কি বলে একটা কথা ছিল,মানে আপনাকে একটু ভুজুং ভাজুং দিয়ে চড়িয়ে দেওয়া বা ঠেলে দেওয়াও বলতে পারেন সংসার সমুদ্রে। এটা অবশ‍্য বেশি এক নারী অন‍্য একজনকেই করে। তাই আমিই নারী আমি সব পারি বা নারী দ‍্য বস বলে বেশি ওঠবোস বা লাফালাফি করতে যাবেন না। আসল বস চিরকালই পুরুষ তা ঘরে বাইরে যেখানেই হোক আর আমরা তাদের বসত্ব উপভোগ করেছি বছরের পর বছর,কখনও শান্তি বজায় রাখতে কখনও বা লক্ষ্মীমন্ত আদুরে বৌ সাজতে। কারণ স্পষ্টবক্তা,বেশি জানা,জ্ঞান দেওয়া মেয়ে মনিষ‍্যি পুরুষের পছন্দ নয়। আরে না না নারী বনাম পুরুষের লড়াইয়ে আমি যাচ্ছি না..আমরা একে অপরের পরিপূরক হয়েই থাকতে চাই,একদমই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নয়। শুধু বলছি দুই হাতে আর কত কী করবেন? আজ নারীদিবসে একটা কথাই বলতে চাই...নারীর জঠরে নিয়েছিলে একদিন স্থান তাই নারীদের দিয়ো সম্মান। আর আপনার আমার সবার জন‍্য বলব, দুই হাতের মধ‍্যে অন্ততঃ একটা হাতকে রাখুন নিজেকে দিনে আধঘণ্টা যত্ন করার জন‍্য,মনটাকে সবার চিন্তায় ডোনেট করার পাশাপাশি একটুখানি বাঁচিয়ে রাখুন নিজের জন‍্য..যাতে ইচ্ছে করলেই তার সাথে সময় কাটাতে পারেন।




Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।