Skip to main content

সই মা

সই_মা#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#



সারা সপ্তাহ যতই বাইরে কাজ থাকুক না কেন রবিবারের রান্নার দায়িত্ব কাউকে ছাড়েনা রাই | আজ রমালা র ছুটি , রান্নাঘরে সকাল থেকেই আজ রাই | 

শুভ্র র বায়না আজ একটু চিংড়ী পোলাও আর বেশ কষা কে পাঁঠার মাংস হোক , অনেকদিন খাওয়া হয় না , ডায়েট এর জন্য তো রেড মিট প্রায় ভুলতেই বসেছি | 
রাই মাংস টা কষে রান্না করে , চাটনি টা নামিয়ে রেখে চিংড়ি পোলাও টা বসিেছে একটু নেড়ে চেড়ে দেখছে ায় হয়ে আসছে , বেশ কয়েকবার চিংড়ী পোলাও করেছে কিন্তু যেন সই মা র মতো হয় না |

 প্রথম যেদিন মা বাবার সাথে সই মা র বাড়িতে খেয়েছিলো ,সেদিন প্রথম চিংড়ী পোলাও খাওয়া আর কি অপূর্ব সে স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে আছে |

আমার "সই মা ", 
 বেনারস যাবার পথে ট্রেনে আলাপ তারপর থেকে কখন যে এতো কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন বুঝিনি|
 
মা ডাকতে শিখিয়েছিলেন সই মা, যখন কলকাতায় বেথুন কলেজ ভর্তি হয়ে হোস্টেল পেতে দেরি হবে জানলাম তখন এই সই মা র বাড়িতেই আমার একমাস কেটেছিল |
 তখন খুব কাছ থেকে চিনেছিলাম সই মা কে , যেমন অপরূপ সুন্দরী ,যেমন ব‍্যাক্তিত্ব, আর তেমন সুন্দর মন |

সই মা বিয়ে করেন নি , এক সময় মা কে দেখেছেন মা মারা যাবার পর মানসিক অবসাদগ্রস্ত স্বামী পরিত্যাক্তা বোন আর বোনপো ছিল তার সব | নিজে চাকরি করে কি পরমস্নেহে হাসি মুখে সামলাতেন সব ।
একসময় কলেজ ,ইউনিভার্সিটি পড়ার সময়ে মাঝে মাঝে আসতাম সই মা র কাছে । আবদার করতাম , খুব খিদে পেয়েছে খেতে দাও । আর সই মা তার ম্যাজিক  
দিয়ে কত রকম খাবার যে বানাতেন , কি অপূর্ব সেই সব খাবারের স্বাদ ।
তারপর কতগুলো বছর কেটে গেলো ,আমার ও বিয়ে হয়ে গেলো।
সই মা কে যে কি সুন্দর লাগছিলো আমার বিয়ের দিন হালকা গোলাপি বেনারসিতে আমার সই মা অনন্যা ।
কত হাসি আনন্দের ছিল সেই সব দিন গুলো।আমার সংসার হলো , জিকো এলো ,,কত কাজ বাড়লো ।

তবুও ফাঁক পেলেই কত গেছি, রান্না খেয়েছি , বাপের বাড়ি দূরে হওয়ায় একটু মাতৃ স্নেহের স্পর্শ আর আদর পাবার জন্য আসতাম ছুটে ।
 সই মা ও এক এক দিন জিকো কে দেখতে চলে আসতেন । এর মাঝেই সুপ্রিয় দার ( সই মা র বোনপো ) বিয়ে হলো ।
সই মা র অনেক আশা অবসর জীবন ভালোই কাটবে ।কিন্তু সব স্বপ্ন হয়ত সত‍্যি হয়না জীবনে।
     বউদির ঠান্ডা ব‍্যাবহার বুঝিয়ে দিত সইমাকে বউদির পছন্দ নয়।আমি ও কেন যেন বুঝলাম আমার উপস্থিতি বৌদি পছন্দ করে না ।আমি এলে যেন সই মা র মুখে দেখতাম দুশ্চিন্তার ছায়া ।
 সই মা ও যেন আমি এলে আর তেমন আন্তরিক হতে পারেন না ।অদ্ভুত এক বিষাদ সই মা র দুই চোখে | কিছু বললে বলেন ,"তোর এখন কত দায়িত্ব কেন ছুটে আসিস ? সংসার কর মন দিয়ে "।আমাদের বাড়িতেও সই মা আজকাল আসেন না ।।নেমন্তন্ন করলেও না ,
 বলেন শরীর ভালো না ।
তাই ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়লো ।ইচ্ছে থাকলেও বৌদির কঠিন মুখটা মনে পড়লেই সব ইচ্ছে নিভে যেতো। সই মা ও আসেন না আজকাল কেমন যেন ভয়ে ভয়ে থাকেন , সই মা কে বললাম এবার একটা মুঠো ফোন রাখো তোমার সাথে তো কথাই হয় না । সই মা বললেন অসুবিধে আছে তুই বুঝবি না ।

         গতএক বছর আর যাওয়া হয় নি সই মা র কাছে ,শেষ বার বৌদি এতো ঠান্ডা উদাসীন ব্যবহার করেছিল ঠিক সাহস পাইনি ।

আজ চিংড়ি পোলাও কেন জানি তোমার কথা খুব বেশি করে মনে করিয়ে দিলো " সই মা " | 

 নাহ ! আজ বিকেলেই যাবো, বৌদি যতই রাগ করুক " টিফিন ক্যরিয়ারএ চিংড়ি পোলাও, মাংস আর সই মা র প্রিয় সন্দেশ নিয়ে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই হোঁচট খেলাম এতো অন্ধকার কেন ?

 তবে কি কেউ নেই? সুপ্রিয় দা র ঘরে তালা ,মোবাইল এর আলো তে দেখলাম ।একটা ঘর পরেই সই মা র ঘর , টিমটিম করে আলো জ্বলছে । উঁকি দিয়ে দেখি আবছা দুজন বিছানায় একজন প্রায় বিছানার সাথে লেগে আমার সই মা ,আর আরেকজন তার বোন |

 জীর্ণ চেহারা মাথায় ছোট্ট ছোট্ট করে কাটা চুল পরনে নোংরা nighty |কি নোংরা ঘর ! তেমন বিছানা ! দুচোখ ভরে জল এলো ,বললাম " আমার রানীর মতো রূপসী সই মা ! আমি কাকে দেখছি ! চুল কাটলে কেন ? " সই মা বললেন ," ওরে চুপ কর তুই আর আসিস না ,,তোকে নিয়ে বৌমা খুব অশান্তি করে , চলে যা ।"

        আমার সই মা এখন অবসাদগ্রস্ত কিছুই নাকি ভালো লাগে না তার শুধু শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে | তবুও বললাম," তোমার প্রিয় রান্না গো আজ করে এনেছি একটু খাবে না ?? "সই মা বললেন ," টেবিল এ রেখে যা , পরে খাবো , দুপুরের হোম ডেলিভারি র খাবার এখনো পরে আছে " |

শুনলাম সুপ্রিয় দা এখন আর এখানে থাকে না ..শুধু পেনশন তোলার দিন টা তে আসে , পাড়াতেই একটা flat কিনেছে । তবে না থাকলেও সই মা র গতি বিধির সব খবর রাখে ।

সই মা সেই থেকে শুয়ে , শুন্যে চোখ ,,একসময় বলি ,"আজ আসি গো "।সই মা বললেন," একসময় বলতিস না বিয়ে করবি না ,,সই মা র মতো হবি বুড়ো বয়েসে মা বাবা কে দেখবি | আজ বলি রে মেয়ে মানুষ বড় পরাধীন কপাল তার সঙ্গ ছাড়ে না , তাই স্বাধীন হয়ে বাইরের লোকের ক্ষমা ঘেন্না পাওয়ার চেয়ে স্বামী র দেয়া সংসার আর সোনার শেকল ভালো | রক্তের জোর না থাকলে বুড়ো বয়েসে অন্তত কেউ তো তোর পাশে থাকবে | " 
        "কিন্ত সইমা তুমি তো স্বাবলম্বী ছিলে তাহলে কেন এমনটা হলো?" একটা বয়সে অর্থই সব নয় রে তখন সাহায‍্য করার মত কাউকে লাগে রে। যাদের প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম তারা যে আর কেউ কাছে রইলো নারে। আমি একা হলে হয়ত বৃদ্ধাশ্রমে চলেই যেতাম কিন্তু আমার স্বামী সন্তান পরিত‍্যক্ত বোনটা কে কি করি বল?"
        
চোখে জল এসে যায় , কিছুই কি করার নেই? রক্তের সম্পর্কই কি সব? আমি তো সন্তানস্নেহ পেয়েছিলাম সইমার কাছ থেকে তবে আমার কেন অধিকার নেই সইমার জন‍্য কিছু করার? হায়রে সমাজ!
#Rumasri

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
সালটা দুহাজার এগারো,মেয়েটা তখন বেশ ছোট,ছেলেটা সে বছরেই কলেজে ঢুকেছে। আর আমার মেয়ের কথায় আমরা তখন খুব গরীব ছিলাম। তবে সে আরও বলে তখন আমাদের মুঠোতে সুখ ছিল,আমরা তখন বেঁধে বেঁধে ছিলাম। ডাইনিং স্পেশে পাতা পুরোনো সোফাটায় আমি বসে শনিবার রাতে ডিডি ন‍্যাশনালে সিনেমা দেখতাম আর বুধবারে দেখতাম চিত্রহার। কখনও ওরাও এসে বসত আমার কোলে পিঠে,একসাথে বসে আমাদের চলত কত কথা আর ওদের দুই ভাইবোনের খুনশুটি। কখনও বা ঝগড়া আর মারামারিও হত,ধুপধাপ তাল পড়ত পিঠে। ওদের বাবা অফিস থেকে এলে দুজনেই উৎসুক হয়ে তাকাতো বাবার হাতের দিকে,তারপর পড়ার মাঝে জুটত ব্রেক বাবার আসার উপলক্ষে চপ,বেগুনী আর চুরমুর সেলিব্রেশনে। আমাদের হাতে তখন ফোন এলেও মুঠোতে বিশ্ব ছিল না,ছিল না ফেসবুক পাড়ায় যখন তখন ভ্রমণ। আমরা একই ছাদের তলায় বাস করেও আলাদা ছিলাম না,আমাদের অনলাইন শপিং ছিল না তখন তাই ছেলেমেয়েদের নিয়ে শপিং করে কিছু খেয়ে ফেরার দিনগুলো খুব আনন্দের ছিল। ছেলের দীর্ঘ পরীক্ষার সমাপ্তির পর আমরা চলে গিয়েছিলাম তালসারিতে। গত দুদিন ধরে তালসারির কথা এত পড়ছি যে আজ হঠাৎই মনে হল আমরাও তো গেছিলাম তালসারিতে। ছবিগুলো অ্যালবাম করে রাখা ছিল বলে পেলাম। আমাদের মধ‍...
আমার পরিবারে আপনাকে স্বাগত জানাই...আমি আপনার পরিবারে এলাম,আপনিও আসবেন আমার পরিবারে। ইত‍্যাদি অনেক কথা আমরা প্রায়শই দেখে থাকি। সত‍্যিই কী এই নেটজগতের মানুষজন আমাদের পরিবার হতে পারে? আমাদের দুঃখ,ব‍্যথা কী তাদের সেভাবে ছুঁয়ে যায়? অথচ আমরা আমাদের রাগ আর মন খারাপের মুহূর্তে অনেক ব‍্যক্তিগত কথা শেয়ার করে ফেলি সেখানে কখনও লাইভ করে,বা লিখে। পরিবারের মত আগলে রাখা,পরিবারের পাশে থাকা সহজ কথা নয়। বন্ধু সবাই হতে পারে না বা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার মুরোদ সবার থাকে না। যে সময়টা আমরা আমাদের স্বামী,সন্তান,মা,বাবা,দাদা,দিদি,মামা,পিশি,কাকুকে দিতে পারি সে সময়টা এখনকার যুগে আমরা অপচয় করে ফেলি অন‍্য পরিবারের জন‍্য যাদের অনেকেই আমাদের অপরিচিত। একটা কথা জানবেন অপরিচিত অনেক মানুষের আমাদের জানার ইচ্ছে থাকে। যেই আপনাকে জানা বোঝা শেষ,কথাও শেষ।তবুও ঐ যে আমার লেখা কটা কথাই আবার বলতে হয়, প্রয়োজন শেষে যারা রয়ে গেল পাশে তারাই আসল প্রিয়জন। এমন প্রিয়জন আমারও কয়েকজন আছেন। আমার মা,বাবা নেই তবুও আমি আমার যাঁরা প্রিয়জন আছেন,যাদের স্নেহ পেয়েছি বড় হবার এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁদের খোঁজ খবর নিই যতটা পারি। হয়ত আমি অপ্রয়োজনীয় তাঁদের...