#ওর_মা#
রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#
চিজ মাখানো শর্মা রোলটা চেটেপুটে খেয়ে হাতটা ন্যাপকিনে মুছে ফেলে চিঠি। ওর ছেলেমানুষী আর খাওয়া দেখছিলো অভ্র। ওর কাঠি কাবাবটাও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শেষের টুকরোটা আদর করে চিঠির মুখে দিয়ে বলে,"নে হেংলু এটা খা। নিজেরটা তো একদম তাড়াহুড়ো করে শেষ করলি।"
চিঠি হাসতে হাসতে বলে,"উফফ্ যা খিদে পেয়েছিলো না! ভাগ্যিস খাওয়ালি, নাহলে হয়ত তোকেই খেয়ে ফেলতাম।
......" সেটা কি আর বাকি রেখেছিস?"
......"মানে"
...."না না মানে আমার মাথাটা তো খারাপ হয়েছে তোর প্রেমে। মানে মাথাটা খেয়েছিস। মা তো তাই বলে।"
....."কি বললি?"
.…."না না কিছুনা।"
...."বুঝতে পেরেছি আন্টি আমার সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলে। তুই চেপে গেলি।"
..."আরে না না মাই মম ইজ গ্ৰেট, শুধু একটু কড়া আর কনজারভেটিভ আর কিছুনা। তবে ওইটুকু থাকা ভালো। নাহলে আজ হয়তো কোথায় ভেসে যেতাম খড় কুটোর মত। যেমন আমার অনেক বন্ধুদের হয়েছে।"
অভ্রর কথাটা শুনে একটু বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বললোনা চিঠি। সারাক্ষণ শুধু মা আর মা,এক্বেবারে মাম্মাস্ বয়।
" দাঁড়া হাতটা ধুয়ে নি। চল এবার এগোই।"
"আমি ন্যাপকিনে ক্লিন করে নিয়েছি। এই নে তুইও মুছে নে।"
"না না মাংস খেলাম, হাতটা ধুয়ে নি ভালো করে, তুইও ধুয়ে নে," বলে অভ্র।
মনে মনে চিঠি বলে বাতিকগ্ৰস্ত ছেলে একটা। ওতো খেলো কাঠি দিয়ে,হাত ধুতে হবে কেন? এত পিটপিটে স্বভাব যে কোথায় পেয়েছে! অভ্রর কাছে শুনেছে ওর মা এগুলো পছন্দ করেন না। মা এঁটোকাটা নিয়ে একটু বেশি সচেতন। পূজো করেন , বাড়ীতে ঠাকুর আছে। অভ্ররও নাকি দীক্ষা হয়ে গেছে, তবে নিয়মিত জপ করা ওর হয়না। সত্যি বেছে বেছে এই ছেলেটার প্রেমেই পাগল হলো, ভাবলে হাসি পায়। যা কিছু হোক অভ্রকে ছাড়তে পারবেনা , সত্যিই খুব ভালো ছেলে ও। একটু আধটু সমস্যা সব বাড়ীতেই থাকে, কি আর করবে।
চিঠির মা তো কথায় কথায় বলেন ওকে, এইসব বাউন্ডুলেপনা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঘুঁচে যাবে। বিছানার চাদরে প্লেট রেখে যত খুশি খাওয়া দাওয়া করে নিক এ বাড়িতে। এখন থেকে স্বভাব না পাল্টালে অনেক দুঃখ আছে কপালে। মাঝে মধ্যে খুব রাগ করে দুএক কথা শুনিয়ে দেয় মাকে। মায়ের শাসন আর ভালো লাগেনা সারাক্ষণ, এই এখানে এটা রাখলি কেন? এই হাতে ওটাতে হাত দিলি কেন? উফফ্ একদম যাচ্ছেতাই । মায়েরা যে কেন এমন পিটপিটে হয় কে জানে?
অভ্রর বাড়িতে সবাই জানতো ওদের সম্পর্কের কথা কিন্তু চিঠির অবাধ যাতায়াত ছিলোনা হবু শ্বশুরবাড়িতে। সেখানেও চিঠির একটু অসন্তোষ ছিলো তবুও অভ্র বলতো," একেবারেই যাবি একদম বৌ হয়ে সেটাই ভালো। এসব মা ঠিক পছন্দ করেন না। আসলে আমাদের পাড়াটা তো একটু পুরনো পাড়া,তাই।"
"আমি আগেই বুঝেছি সবটাই আন্টির কথা তুই শুধু তোর মুখে বসিয়ে নিয়েছিস।"
...."হয়ত হবে তাই। তবে চিঠিসোনা এবার থেকে হবু বরকে একটু ভক্তি কর। তুমি বলাটা অভ্যেস কর। বিয়ের পর আর তুই বলিসনা। তাহলে কেস খেয়ে যাবো কিন্তু একেবারে মায়ের কাছে।"
মনে মনে বলে ওহ্ একেবারে মাতৃভক্ত ছেলে! মা যা বলবে তাই করবে। অথচ ওর মা মানে চিঠির হবু শাশুড়ি পরমা দেবীকে তো বেশ আধুনিকা বলেই মনে হয়। আর হবেই না বা কেন উনি তো স্কুলে পড়ান। ফেসবুক হোয়াটস আ্যপ সবই তো করেন। বেশ অনেক বন্ধু বান্ধব আছে ওনার। মাঝে মাঝেই তো ছবি দেখে চিঠি বন্ধুদের সাথে। তবে খুব পার্সোনালিটি আছে বলে মনে হয়। এখনো চেহারায় বয়সের ছাপ আসেনি, সুন্দর চেহারা আর খুব রুচিসম্মত সাজগোজ করেন। এখনো বেশ কয়েক বছর চাকরি আছে শুনেছে চিঠি।
অভ্রর কাছে শুনেছে ওর মায়ের পড়তে পড়তেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ের পর পড়াশোনাটা শেষ করেছেন,অভ্র ওনার কম বয়সের সন্তান। মা একাধারে ওর ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এন্ড গাইড। তবুও কিছু ব্যাপারে মায়ের সংস্কার আর শাসনের দুর্বোদ্ধ পাঁচিল অভ্র ভাঙ্গতে পারেনি, হয়ত বা চায়নি।
এইসব নিয়েই চিঠির খুব রাগ হয়,ভদ্রমহিলা নাকি ছেলের পড়াশোনার ক্ষতি হবে বলে প্রথম দিকে ওদের সম্পর্ক মানতেই চাননি। মনে মনে খুব রাগ হয় যখন বেশি রাত অবধি বাইরে ঘুরলেই ওর মা ফোন করেন ছেলেকে। আর অভ্র বেশ নার্ভাস হয়ে তাড়াহুড়ো করতে থাকে।
নিজের মনকেই বোঝায় চিঠি এত কিছু ভাবছে কেন, অভ্র আর ও দুজনে দুজনকে এতটাই ভালবাসে যে এর মধ্যে কোন সমস্যাই আসবেনা, ও আসতেই দেবেনা। আর কিছুদিন বাদেই তো ওদের বিয়ে।
মায়ের তো সারাদিন জ্ঞানদান চলছে এটা করিস না, ওটা করিসনা। এই নিয়ে বাবাও পেছনে লাগছে। সত্যিই তো কাজকর্ম তেমন কিছুই জানেনা চিঠি।
দেখতে দেখতে বিয়ে এগিয়ে আসছে, দুই বাড়িতেই প্রস্তুতির চূড়ান্ত। অভ্রটার টিকির দেখা পাচ্ছেনা চিঠি ,ও নাকি ভীষণ ব্যাস্ত। ওর মা বলেছেন এই কদিন প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা বেশি না দেখা করতে। তবে খুব সুন্দর সুন্দর সব জিনিস পাঠিয়েছে ও বাড়ি থেকে। সবার ভীষণ পছন্দ হয়েছে, সবাইতো চিঠির শাশুড়ির পছন্দের তারিফ করছেন।
অনেক জল্পনা কল্পনার শেষে চিঠি এলো অভ্রদের বাড়িতে। সব অনুষ্ঠান ভালোভাবেই শেষ হলো। তবে বেশ বুঝলো এই বাড়িতে শাশুড়িমায়ের কথাই শেষ কথা। যদিও শ্বশুরমশায়কেই বেশি পছন্দ ওর। বেশ হাল্কা মেজাজের মানুষ। কিন্তু বাবা আর ছেলে দুজনেই একজনের কথা বেদবাক্য করে যেন শোনে।
তবে ও ঠিক করেছে একদম ওনার সব কথা শুনবেনা। এটা মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছিলো। তবুও মনের মধ্যে একটু আশঙ্কা নিয়েই এসেছিলো, কিন্তু অভ্রর মা মানে ওর শাশুড়িমাকে ভালোই মনে হলো। অল্প কথা বলেন,খুবই মার্জিত এবং বুদ্ধিদীপ্ত। তবে একটু বেশিই ডিসিপ্লিনড। চিঠি অনেক চেষ্টা করেও যেন ওনাকে স্বাভাবিক ভাবে মা বলে ডাকতে পারলো না। তোমার মা, ওর মা এইরকম মুখ থেকে বেড়িয়ে আসছিলো। অভ্র যদিও একটু অসন্তুষ্ট হয়েছিলো,কথাটা পরমাদেবীর কানেও গিয়েছিলো। উনি ছেলেকেই ধমক দিয়ে বলেন,"হঠাৎ করে মা বলতে হয়ত ওর অসুবিধে হচ্ছে। আচ্ছা যে ভাবে বললে ওর সুবিধে হয় বলুক পরে অভ্যেস হয়ে যাবে। জোর করে কিছু হয়না বেটা।" ছেলেকে আদর করে উনি বেটা ডাকেন। এই ডাকটা শুনলেও যেন একটু গা জ্বালা করে চিঠির।
অষ্টমঙ্গলাতে বাপের বাড়ি যাবার পর ওর মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খোঁজখবর নিলেন। "অত ভেবোনা মা, এখনো পর্যন্ত সব ঠিকই আছে। তবে আমি কিন্তু এখনো মা বলে ডাকতে পারিনি। শাশুড়ি একটু কড়া, তবে আমাকে কিছু বলেননি এখনো। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমিও দেবো শুনিয়ে।"
....."ছিঃ চিঠি এমন কথা কখনো বলবিনা, এতে আমাদেরকে ছোট করা হবে। আর মা বলেই বা ডাকছিস না কেন? অভ্র তো দিব্যি আমাকে মা বলে ডাকছে তোর এত সমস্যা কোথায়? সব সময় মুখে মুখে কথা বলা আর ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা মোটেই ভালোনা। অভ্রর মা ভালো বলে এমন সুন্দর একটা ছেলে আমরা পেয়েছি। সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে মা বাবাকে একটু কড়া হতে হয়। আমি যেন কোনদিন না শুনি তোর সম্পর্কে কিছু। যা মুখরা মেয়ে তুই! ওই জন্যই তো বলেছিলাম নিজের বর নিজে পছন্দ করেছিস তাই ভালো। সম্বন্ধ করে দিলে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দিনরাত আমাদের গালাগাল করতো।"
.....মাকে জড়িয়ে ধরে চিঠি বলে," এতোটাও খারাপ ভেবোনা আমায় মা,আমিও তো তোমার শিক্ষায় বড় হয়েছি। শুধু তোমার বকা খাওয়ার জন্য তোমায় একটু বিরক্ত করি আর কিছুনা।"
মনে মনে চিঠি মাকে সম্মান না জানিয়ে পারেনা। সত্যিই তো ওর মায়ের ও শিক্ষার তুলনা হয়না।
শ্বশুরবাড়িতে ভালোই দিন কাটছে চিঠির তবে মাঝে মাঝেই বকুনি খাচ্ছে অভ্রর কাছে,ওর টুকটাক ভুলভ্রান্তির জন্য। তবে সবসময় শাশুড়িমাই ওর সাপোর্টে,কি সুন্দর করে ছেলেকে হাল্কা শাসন করে বুঝিয়ে দেন কেন বিছানায় খাবার রেখে খেতে নেই। কাপড়চোপড় কিভাবে গুছিয়ে রাখতে হয়। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর রাখলে কেমন লাগে,নিজের হাতে করে দেখিয়ে দেন চিঠিকে। একটু জ্ঞান মনে হলেও ওনার আ্যপ্রোচটা এতো ভালো যে চিঠি রাগ করতে পারেনা। রাতে অভ্রর কাছে হাল্কা নালিশ করে বলে,"দিদিমণি শাশুড়ির পাল্লায় পড়ে আমার লাইফটা হেল হয়ে গেলো। নেহাৎ দিদিমণির ছাত্রের প্রেমে পড়েছি তাই কিছু বলতে পারিনা।"
......অভ্র চিঠিকে কাছে টেনে বলে,"এই বাধ্য, সুবোধ ছাত্রটি যে ঐ দিদিমণির হাতেই গড়া তাইনা?" হেসে ফেলে চিঠি,"সত্যি তোমাদের ওপর রাগ করা যায়না।"
দেখতে দেখতে একবছর কেটে গেলো চিঠির। তবুও একটু যেন ভয় পায় এখনো শাশুড়িকে,অথচ উনি ভীষণ ভালো। কিন্তু ওনার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু আছে যার জন্য খুব কাছে আসা যায়না,একটা অদৃশ্য গন্ডী থেকে যায়। তবে তা নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই চিঠির। শুধু এখনো কেন যে ওনাকে প্রাণখুলে মা বলে ডাকতে পারেনা কে জানে।
চিঠি মা হতে চলেছে,নিজের চাকরি সামলেও যথেষ্ট চেষ্টা করেন শাশুড়িমা যাতে ওর যত্নের কোন ত্রুটি না হয়। মাঝে মাঝে একটু বেশিই যত্ন হয়ে যায়। চিঠির একটু বিরক্তই লাগে। কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসেছে চিঠি,বাঁধাধরা জীবন থেকে একটু মুক্তি। কিন্তু হঠাৎই পেটে খুব ব্যাথা আর ব্লিডিং শুরু হওয়াতে দুইবাড়ীর সবাই ব্যাস্ত চিঠিকে নিয়ে। নার্সিং হোম,টেষ্ট,ইউএসজি সব হলো কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা,ইউটেরাসের সাঙ্ঘাতিক ইনফেকশানে আ্যবরসন করে পুরো ইউটেরাসটাই বাদ পড়ে গেলো চিঠির।
কি করে কোথা দিয়ে যে কি হয়ে গেলো কিছু বোঝাই গেলোনা। মাঝে মাঝে পেটে একটু ব্যাথা হত কিন্তু এমন যে হতে পারে কখনো ভাবেনি কেউ।
চিঠিকে সামলানো সবচেয়ে মুস্কিল হয়ে গেলো। প্রচন্ড ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করেছে চিঠি ওর শুকনো ফ্যাকাশে মুখটার দিকে আর তাকানো যায়না। ভেতরে একটা কষ্ট সবসময় কুড়ে কুড়ে খায় ও আর মা হতে পারবেনা কোনদিন। অভ্রকে কোন দিনই সন্তান দিতে পারবেনা। অথচ ওর সন্তান হবে শুনে কত খুশি ছিলো বাড়ীর সবাই। অদ্ভুত একটা শূন্যতা ঘিরে রেখেছে সবসময়,মনে হয় যেন পাগল হয়ে যাবে।
এইসময় চিঠি একজনকে যেন খুব বেশি করে বন্ধু হিসেবে পেলো ওর শাশুড়িমা। উনি যত বেশি লক্ষ্য রাখেন চিঠির ভালো মন্দ, ছোটছোট জিনিষগুলোর দিকে ওর তত বেশি অপরাধী লাগে নিজেকে। এই মানুষটার সম্বন্ধে একসময় কত কিছুই না ভেবেছে ও। এর মাঝেই বেড়িয়ে এলো ওরা বেশ কিছুদিন উটি থেকে। কিন্তু তবুও অদ্ভুত চুপচাপ চিঠি।
পরমা একদিন অভ্রকে ডেকে বললেন চিঠি যদি চায় তাহলে উনাদের স্কুলের কাছে যে হোমটা আছে তাতে কাজ করতে পারে। ওনার কয়েকজন বান্ধবী ওখানে আছেন। বাচ্চাদের মাঝে কাজ করলে হয়ত ওর ভালো লাগবে। কিন্তু চিঠিকে রাজী করানো গেলোনা। কেমন যেন গুটিয়ে গেছে ও। পরমা ছেলেকে বোঝালেন ওকে যেন কোন চাপ না দেওয়া হয়।
সরস্বতীপূজোর দিন চিঠিকে অনেক করে বুঝিয়ে পরমা নিয়ে গেলেন ওনার স্কুলে। সবার মাঝে অনেকটা হাল্কা লাগলো চিঠির,সত্যি এই জন্যই বোধহয় শাশুড়ীমা ভালো আছেন। কাজ মনে হয় মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে রাখে।আজ পরমারও একটু শান্তি লাগছে চিঠিকে দেখে।
কিছুটা সময় কাটানোর পর পরমা চিঠিকে নিয়ে যান ওনার বান্ধবীরা যেখানে কাজ করেন সেখানে। যদিও চিঠি একটু আপত্তি করছিলো,কিন্তু পরমার অনুরোধ এড়াতে পারেনি।
বেশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হোমটা। ছোট গেটটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে একটু এগোতেই দেখে সামনেই পূজোর আয়োজন। হঠাৎ করে চমকে ওঠে চিঠি একটা ছোট্ট এইটুকু পুচকে বাচ্চা কোথাথেকে যেন দৌড়ে এসে চিঠিকে গুডমর্ণিং আর হ্যাপি নিউইয়ার বলেই আবার ছুটে চলে গেলো গোল হয়ে বসে থাকা অন্য বাচ্চাগুলোর দিকে। কেমন যেন চমকে উঠেছিলো চিঠি হঠাৎ করে পুচকেটাকে দেখে।
কিন্তু ওকে একঝলক দেখতে পেলো আর দেখতে পেলোনা,কি সুইট বাচ্চাটা, তেমন মিষ্টি ওর গলার আওয়াজ। কিন্তু গেলো কোথায় ও?
পরমা আলাপ করিয়ে দিলেন বান্ধবীদের সাথে। সবাই চিঠিকে আদর করে বসালেন, প্রসাদ দিলেন। তেমন কিছু খেলোনা চিঠি, ওর চোখদুটো শুধুই তখন খুঁজছে ঐ পুচকেটাকে। কোথায় যে চলে গেলো। অথচ কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছেনা। পরমা ব্যাস্ত বান্ধবীদের সাথে কথা বলায়। অত ছেলেমেয়ের মাঝে কোথায় খুঁজে পাবে ওকে।
আজ চিঠিকে অনেকটা স্বাভাবিক লাগছে। অভ্রর মনটাও ভালো লাগলো চিঠিকে দেখে। রাতে চিঠি একটু ইতস্তত করে অভ্রকে বললো,"একটা কথা বলবো,আমি না ঐ হোমটাতে পড়াতে চাই। আজ তোমার মা নিয়ে গিয়েছিলেন ভালো লেগেছে। সত্যিই তো আমাকে ভালো থাকতে হবে। এই দমবন্ধ জীবন আর ভালো লাগছেনা।"
......"বাহ্ এটা তো খুব ভালো সিদ্ধান্ত। মা তো অনেকদিন আগেই বলেছেন তোমায়। আচ্ছা বেশ আমি কালই মাকে বলবো। এবার একটু ঘুমনোর চেষ্টা কোরো। আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিই।"
চিঠির সিদ্ধান্তে সবাই খুশি। পরমা কথা বলে নিয়েছেন এরমধ্যেই। ভালোই হলো, ওরা সবাই আর চিঠির বাড়ির সবাই তো চাইছিলেন ও একটু বেরোক। সামনের মাসেই চিঠি জয়েন করবে ঠিক হলো।
সেদিন চিঠির প্রথমদিন নিজের জগতে পা দেওয়ার। পরমা ওকে ড্রপ করে নিজের স্কুলে চলে গেলেন। তখনো স্কুল শুরু হয়নি,চিঠি এগিয়ে গেলো প্রিন্সিপালের ঘরের দিকে। হঠাৎই গুডমর্ণিং শুনে চমকে ওঠে চিঠি,সেই পুচকেটা এক দৌড়ে এসে বলেই দৌড়ে চলে গেলো। আজও ওকে ভালো করে দেখতে পেলোনা চিঠি। কিন্তু ওর মনটা ছুঁয়ে চলে গেলো।
সব ক্লাশে নিয়ে গিয়েই চিঠিকে ইনট্রোডিউস করিয়ে দিলেন প্রিন্সিপাল। মনটা কেমন উদাস হয়ে যায় ওর,এতগুলো বাচ্চা অথচ বেশিরভাগই অনাথ। কারো বা বাবা মায়ের মধ্যে একজন আছে। কি ফুটফুটে নিষ্পাপ মুখগুলো ওদের! কি করে বাবা মা ফেলে যায় এমন বাচ্চাগুলোকে। অথচ ওর একটা বাচ্চার জন্য মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে সবসময়। মানুষ যা চায় তা মনেহয় পায়না। কিন্তু ওর চোখ যাকে খুঁজছে সে কই? কোন ক্লাসেই তো নেই।
সবার সাথেই আলাপ হলো, বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো রাখীর সাথে। ওকেই জিজ্ঞেস করলো চিঠি,"আচ্ছা এখানে কি খুব ছোট বাচ্চাও থাকে?আজও দেখলাম,আগের দিনও দেখেছি খুব মিষ্টি একটা বাচ্চা গুডমর্ণিং বলে যেন কোথায় চলে গেলো। আর দেখলাম না।"
...."ও বুঝেছি তুমি দুষ্টু টুবলুর কথা বলছো। কি যে মিষ্টি! অথচ ওর কেউ নেই। কি করে মা ফেলে যায় এমন বাচ্চাকে কে জানে? ওরা পাশের নার্সারীতে থাকে। অনেকগুলো পুচকে আছে ওখানে। তোমায় নিয়ে যাবো আমি।"
.......নার্সারী তে গিয়ে চিঠি যেন এক ম্যাজিক জগতে এসে ঢুকলো। এক একটা পুচকে এক এক রকম। তবে টুবলু বোধহয় সবচেয়ে বেশি মন চুরি করে নিয়েছে চিঠির ওর জন্য অদ্ভুত এক টান অনুভব করে চিঠি। যেমন অস্কার ওয়াইল্ডের সেলফিস জায়েন্টের হয়েছিলো লিটল আ্যন্জেলের জন্য।
আবার অভ্র একটু একটু করে যেন খুঁজে পাচ্ছে চিঠিকে। চিঠি এখন হাসে কথা বলে,বাড়ি থেকে বেরোতে চায়। এ বাড়ির আর ওর বাড়ির সবাই খুশি। একদিনও স্কুল কামাই করেনা চিঠি। পরমাও খুব খুশি।
ক্লাসের সময়টুকু বাদ দিয়ে বেশিরভাগ সময়টাই নার্সারীতে কেটে যায় চিঠির।টুবলুটা যে কি ন্যাওটা হয়েছে চিঠির বলার নয়। মিষ্টি মিষ্টি গলায় যখন ম্যাম ম্যাম করে ডাকতে থাকে মনটা ভিজে যায় । আর তাছাড়া ওর গুডমর্ণিং না শুনলে তো চিঠির দিনই কাটেনা।
তবে হঠাৎই একদিন টুবলু সকালে দৌড়ে এলোনা গুডমর্ণিং করতে। চারদিকে তাকিয়ে কোথাও খুঁজে পেলোনা ওকে। খুব অস্থির মনে ক্লাস নিয়েই অফ পিরিয়ডে নার্সারিতে ছুটে গেলো চিঠি। শুনলো টুবলুর ভীষণ জ্বর ওকে স্পেশাল কেয়ারে রাখা হয়েছে। সেদিন বাড়ী ফিরতে অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছিলো চিঠির। ম্যাম বলে ওর হাতটাই আঁকড়ে ছিলো বাচ্ছাটা ঘুমের ঘোরে। কোনরকমে রাত্রিটা অসহায় ভাবে কাটিয়ে আবার সকালে ছুটে যাওয়া। পরমা শুধু ভাবেন কি যে হলো মেয়েটার! ভীষণ ভাবে জড়িয়ে পড়ছে বাচ্ছাটার মায়ায়।
চিঠির একটুও ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করেনা ঐ অসহায় ছোট্ট বাচ্ছাটাকে। তবুও সারাক্ষণ ওখানে থাকার নিয়ম নেই তাই বাড়ীতে ফিরে আসতেই হয় ওকে। ধীরে ধীরে অনেকটা সুস্থ হয়ে আসছে টুবলু,এই কদিনে চিঠির আরও কাছে চলে এসেছে ও। এবার মিষ্টি করে ম্যাম আর গুডমর্ণিং বলছে,আবার একটু একটু করে ছুটোছুটি শুরু হয়েছে।
চিঠিও অনেকটা নিশ্চিন্ত তবে অভ্র যেন পুরোপুরি ভাবে পায়না চিঠিকে। ওর মনটা যেন সবসময় কোথায় হারিয়ে থাকে। মায়ের সাথেও কথা বলে ও, পরমা বোঝান ছেলেকে আর তার সাথে একটা প্রস্তাবও দেন। অভ্র জানায় ভেবে দেখবে।
সেদিন রাতে অভ্র চিঠিকে বলে,"আচ্ছা চিঠি একটু নিজের দিকে নজর দাও। কি রকম অস্থির হয়ে থাকো আজকাল। মনটা যেন তোমার হোমেই পড়ে থাকে। এই তো সেদিন ঘুমের মধ্যেও টুবলুকে ডাকছিলে। ওরে আমাদের এতোদিনের প্রেমের কি হলো? কোথাথেকে এক পুচকে টুবলু ঢুকে পড়লো আমাদের মাঝে। আমার কিন্তু সত্যি খুব জেলাস লাগছে এবার।"
......"ওহ্ এই ব্যাপার,ছেলেরা সত্যি খুব হিংসুটে হয়। ওইটুকু একটা বাচ্চা তোমার রাইভাল নাকি?
একটা কথা বলবো যদি তুমি রাগ না করো। প্রমিস করো রাগ করবেনা ।"
......"এই যে এত ইতস্তত কেন শুনি? বলোনা।"
....."আচ্ছা আমরা যদি টুবলুকে আ্যডপ্ট করি, তুমি কি মেনে নেবে?কিন্তু তোমার মা, উনি কি মেনে নেবেন?আর তুমি তো মায়ের কথাই শুনবে, তাইনা?"
নিজের খুব কাছে টেনে নেয় অভ্র চিঠিকে, কানে কানে আস্তে আস্তে বলে,"তুই হয়তো বিশ্বাস করবিনা পাগলী,মা প্রথম এই কথাটাই আমাকে বলছিলেন। কিন্তু আমিই সাহস পাইনি শুধু তোর কথা ভেবে।"
অভ্রর বুকে মাথা দিয়ে অনেকদিন বাদে ওর প্রেমে পাগল মাম্মাস্ গুড বয়টাকেই খুঁজে পেলো
চিঠি। আজ পরমাকে "ওর মা" বা "তোমার মা" বলে মনে হলোনা। পরমা বোধহয় ওর নিজের জন্মদাত্রী মায়ের থেকেও কাছের, তাইতো ওর মনের কথাটা এতো সুন্দর করে বুঝেছেন।
পরদিন সকালে পরমার গলা জড়িয়ে চিঠি বললো,"মা তুমি এতো ভালো কেন?"
পরমা গভীর স্নেহে হাত বুলিয়ে দেন চিঠির মাথায়।
অভ্র শুধু মজা করে বলে," মাম্মাস্ স্পয়েলড্ গার্ল।"
সমাপ্ত-
Comments
Post a Comment