#মুখপত্রিকায়_মুখোমুখি#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#
ওহ্ শেলি দি তোমাকে আজ খুব মিষ্টি লাগছে!
সত্যি তোমাকে দেখে মনে সাহস পাই,কোন তুলনা হয়না তোমার। আমি তো ওকে বলতেই ও তাজ্জব হয়ে গেলো,বললো তোমাকে দেখে শিখতে কি করে বিয়ের পর পড়াশোনা আর চাকরি করে এই জায়গায় পৌঁছোলে। আমরা হলে তো কবেই হাল ছেড়ে ধপাস্ করে পড়তাম। এতোটা করতেই পারতাম না।
একটু হাসে শেলি,সত্যি মানুষ তো কত কিছুই স্বপ্ন দেখে তবে সবটাই কি পূরণ হয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরই বাড়ির চাপে বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। আসলে বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলোনা,তিন বোনকে নিয়ে বাবা হিমশিম খাচ্ছে তাদের পড়াশোনা শেখাতে। তাই বলেই দিলেন আর বেশি পড়ানো সম্ভব হবেনা। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট ভালো থাকায় বিএস সি তে বর উদ্যোগ নিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলো। তারপর ছেলে হওয়ায় গ্ৰ্যাজুয়েশনের পর আর এগোনো হয়নি মাঝে অনেকটা ব্রেক হলেও মনের জোরে ছেলে একটু বড় হলে ডিসট্যান্টে এম এস সি টাও কমপ্লিট করে। ছেলে বড় হওয়ার পরে বুঝেছে সত্যি এবার কিছু একটা করা দরকার। আর এভাবে বরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলা যায়না। কিছু একটা করা দরকার,সত্যিই তো এতো পড়াশোনা করে কি লাভ হোলো তাহলে?
ছেলেটার পেছনেও খরচ বাড়ছে। তাই ওইসময় আর ভাবেনি অন্য কথা,আর চেষ্টা করে এই প্রাইমারী স্কুলের চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিলো। যদিও বর একটু কিন্তু করেছিলো তবুও সরকারী চাকরী বলে কথা। সত্যি নিজে উপার্জনে কত সুখ! দরকারে বাবা আর স্বামী দুজনকেই সাহায্য করতে পারে, সবাই খুশি। ছেলেটাকেও দেখা হচ্ছে,ছেলের দেখতে দেখতে ক্লাশ এইট,যদিও ইংরেজী মাধ্যম তবুও শেলিই দেখে পুরোটা।
ওর কলিগরা প্রশংসা করে," শেলি সংসার,চাকরি,ছেলে,ফেসবুক সব সামলাচ্ছে একা হাতে।"....হাসে শেলি," শুধু আমার বেলায় মজা করা,তোমরা ফেসবুক করোনা বুঝি। তবে ফেসবুক সামলানোও একটা কাজ,তাইনা?"
আজকাল ছেলের অঙ্ক নিয়ে সমস্যা হচ্ছে মাঝেমাঝে,দুএকটা প্রবলেম আটকাচ্ছে। ভাবছে টিউশন দেবে কিনা? কিন্তু এই ব্যাপারে বর আর ছেলে দুজনেরই প্রবল আপত্তি,না না তুমি করাও। এর মাঝেই হঠাৎ ফেসবুকে টিচার্স গ্ৰুপে হঠাৎই চোখে পড়ে একজন ভদ্রলোক প্রায়ই ম্যাথামেটিকাল প্রবলেম নিয়ে লেখেন। কখনো অঙ্কের পাজল্ দেন। ভদ্রলোকের প্রোফাইলটা চেক করে শেলি,ও আচ্ছা অঙ্কের টিচার।হঠাৎই মাথায় প্ল্যান আসে,ওনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালে কেমন হয়? হয়ত ভদ্রলোক ওকে কিছুটা সাহায্য করতে পারবে ম্যাথসের প্রবলেমগুলোর ব্যাপারে। পাঠিয়েই ফেলে রিকোয়েস্টটা,উনিও আ্যকসেপ্ট করলেন, ফেসবুকের পোষ্টে ওনার অঙ্কগুলো খুব ভালো লাগলো শেলির। সত্যি ওনার কোন তুলনা হয়না,খুব ভালো নলেজ আছে।
প্রোফাইল থেকেই নামটা জেনেছিলো শেলি, শৌভিক বোস। তবে ভদ্রলোক বেশ পপুলার তো! বেশ গুণী মানুষ। বেশ অনেকগুলো জনপ্রিয় গ্ৰুপে আছেন তো। ওনাকে দেখেই শেলিও ওই গ্ৰুপগুলোর মেম্বার হয়ে যায়। ওনার অঙ্কের ধাঁধাগুলো বেশ লাগে শেলির আসলে ও নিজেও সায়েন্সের ছাত্রী কিন্তু যা হয়,অনভ্যাসে বিদ্যা নষ্ট। প্রাইমারীর বাচ্ছা পড়িয়ে পড়িয়ে সত্যিই ভোঁতা হয়ে গেছে মাথাটা। এরমাঝে ছেলের একটা অঙ্ক আটকে যাওয়াতে ফেসবুকের পোষ্টেই ভদ্রলোককে মেসেজ করেছিলো। ভদ্রলোক সত্যি হেল্পফুল কি সহজে সলভ করে দিলেন প্রবলেমটা। ফেসবুকের অঙ্কের পোষ্টেই শেলি মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে জেনে নেয় কিছু জানার থাকলে। দেখতে দেখতে গরমের ছুটি এসে গেলো। পাহাড়ে বেড়াতে যাবার কথা ওদের,এবার ওরা নৈনিতালে যাচ্ছে। বাড়ীতে বেশ তোড়জোড় পরে গেছে। খুশি মনে ট্রেনে উঠে পড়লো ওরা যাবার দিনে। কিছুক্ষণ হৈ হৈ করে এবার ফেসবুক খোলে শেলি,আশ্চর্য হয়ে যায়,শৌভিকবাবু নৈনিতালের ছবি দিয়ে বেড়ানোর ডিটেলস দিয়েছেন। ফেসবুকেই পোষ্টে কমেন্ট করে শেলি জানতে চায় হোটেলের ব্যাপারে,আসলে শেলিরা আগে থেকে হোটেল বুক করেনি। ভেবেছে গিয়ে চোখে দেখে নেবে।যাক ভালোই হোলো ওনার কাছে খোঁজখবর পাওয়া যাবে ভালো করে। এতো ইনফরমেশন ফেসবুকের পোষ্টে দেওয়া যায়না তাই শৌভিক ইনবক্সে শেলিকে ও যা জানতে চাইছে বলে দিলেন। কিন্তু ওনাদের হোটেলে কোন ব্যবস্থা করা গেলোনা। আসলে সেইসময় খুব ভীড়। শৌভিকবাবুর কাছে হোটেলের যদি অন্য হোটেলের কোন নম্বর থাকে জানতে চাইলো শেলি। জিজ্ঞেস করলো গাড়ীর বা ড্রাইভারের কোন খোঁজ বা নম্বর জানা আছে কিনা? ইনবক্সে মেসেজ করে শৌভিক জানালো যেটুকু ওর পক্ষে সাহায্য করা সম্ভব। যদিও শৌভিকরা থাকাকালীন এসে পৌঁছয় শেলিরা কিন্তু দেখা সাক্ষাৎ হয়নি দুই পরিবারের।
বেড়ানো দুজনেরই শেষ,বেড়াতে এসে প্রথম দিকে একটু কথা হলেও পরে আর তেমন যোগাযোগ করেনি শেলি,যদিও শৌভিক বলেছিলো ওকে জানাতে কেমন বেড়াচ্ছে ওরা। মাঝে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন, শেলি কিছু জানালোনা দেখে শৌভিকই ভাবে মেসেজ করবে............
সকাল থেকে না না ব্যস্ততায় কেটে যায়। বিকেলে একটু ফ্রী হয়ে ম্যাসেঞ্জার খোলে শৌভিক, দেখে অনলাইন নেই শেলি। ভাবলো মেসেজটা করে রাখবে একটু জেনে নেওয়া ওর ইনফরমেশনে কেমন বেড়ালো ওরা। তাই ইনবক্সে পড়ে থাকা পুরোনো চ্যাটগুলো পড়া শুরু করে। না না বেড়ানো ছাড়া অন্য বিষয়ে তেমন কথাই হয়নি। চেনা হয়নি ব্যক্তিগতভাবেও। অবশ্য কি দরকার আছে বেশি কিছু জানার। খেয়াল করে বেড়ানো সংক্রান্ত প্রয়োজনগুলোই কেবল জেনে নিয়েছিল শেলি। আর এক এক করে বিভিন্ন ড্রাইভার আর হোটেলের নম্বর দিয়েছিল শৌভিক তাকে। ওর দেওয়া তথ্যের বিনিময়ে শেলি বার বারই জানিয়েছে ‘অসংখ্য ধন্যবাদ’, শৌভিক তখনই বলেছিল বেড়াবার অভিজ্ঞতাটা অবশ্যই জানাতে।শেলি বলেছিলো," আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো বুঝতে পারছিনা,সত্যি আপনি না থাকলে এই ইনফরমেশনগুলো যে কিভাবে পেতাম জানিনা।" কিন্তু সপ্তাহ কেটে গেলেও কোন ফিডব্যাক পায়না শৌভিক,সত্যিই অদ্ভুত মনুষ্যচরিত্র। অবশ্য অনেকেই এমন হয়,কাজ ফুরিয়ে গেলো তো আর চেনেনা। অদ্ভুত মহিলা তো,সামান্য সৌজন্যবোধও নেই!
হঠাৎ খেয়াল করে শৌভিক, শেলি অনলাইন। শৌভিকই শুরু করে কথা। শেলি জানায়, বেড়াবার শেষে ছেলেকে নিয়ে সে এখন বরের কাছে। আসলে ওর বর এই কিছুদিনই হলো বাইরে ট্রান্সফার হয়ে গেছে তাই একেবারে গরমের ছুটি কাটিয়ে ফিরবে। এদিনের চ্যাটেই পারস্পরিক পরিচিতি বাড়ে দুজনের।..."ও আচ্ছা খুব ভালো,উনি কোথায় আছেন? মানে ..." শেলি জানায় ওর বর বিশাল কোম্পানিতে উচ্চপদে রয়েছে। " ওহ্ তাহলে তো বিশাল ব্যাপার!" বলাতে একটু আপত্তি করে বলে," না না একেবারেই নয় আমরা একদম সাধারণ, সরল জীবনযাপনই করি। বুঝতেই পারছেন প্রাইমারী স্কুলে চাকরী করি। আসলে আপনার অংক করার টেকনিক দেখেই মুগ্ধ হয়ে আপনাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠিয়েছিলাম। কি আর বলবো, আমিও অঙ্কে এম এস সি বলতেও খারাপ লাগে তবুও কিছু করতে পারলাম না তেমন। প্রাইমারীতে পড়াতে পড়াতে সব ভুলে গেছি। ওই ছেলেকে পড়াতেই যে টুকু চর্চা করতে হয় তাই করি।" বুঝতে পারে শৌভিক শেলি কিছুটা হতাশায় ভোগে। স্বাভাবিক ব্যাপারটা, নিজের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন না হলে সত্যিই খারাপ লাগে। শৌভিক ওকে বলে হতাশ না হতে। বরং স্কুল সার্ভিস কমিশনের জন্য চেষ্টা করতে। জানতে চায় বি এড করেছে কিনা? শেলি বলে বি এড করেছে চাকরি করতে করতে, তবে অনুমতি নেয়নি দপ্তরের। তাই সেই ডিগ্রিও কাজে লাগছে না। নইলে হয়তো মাধ্যমিক কি উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষিকা হওয়ার চেষ্টা করতো।
এদিনই শেলি শৌভিকের থেকে জানতে চায় ছেলেকে পড়াবার জন্য কোন কোন লেখকের বই অনুসরণ করলে ভালো হবে। প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন পরীক্ষার ব্যাপারেও জেনে নেয় কারণ সে শৌভিকের পোস্টে দেখেছে ওর ছেলে বিভিন্ন অঙ্কের কমপিটিশনে পুরস্কার পেয়েছে। অনুরোধ করে, ভালো কিছু বইয়ের খবর পেলে সে যেন জানায় শেলিকে। বলে পরে আবার কথা হবে। এখন যেখানে আছে সেখানে টাওয়ারের খুব সমস্যা। অফলাইনে চলে যায় শেলি তবুও ওর বলা কিছু কথার মধ্যেই শৌভিক পায় এক না পাওয়ার রেশ,খানিকটা অপূর্ণতা হয়তো বা আক্ষেপও।
সত্যি এই একটা মাধ্যম ফেসবুক, আর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গ্ৰুপে থাকার জন্য শৌভিকের পরিচিতি অনেক। সত্যিই সমস্যাবহুল মানুষের জীবন। হাসিখুশি প্রোফাইল পিকচারের তলায় হয়ত থাকে অনেকগুলো পাওয়া আর না পাওয়ার সমীকরণ। জীবনের সব অঙ্ক হয়ত সবার মেলেনা। তবুও জীবন চলে এগিয়ে লাভ ক্ষতির অঙ্ক সমাধান করতে করতে।
শেলিরও আজ শৌভিকের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো। হয়তবা একটু সাহসও পেলো মনে। ভদ্রলোক বেশ পজেটিভ,কজনই বা এমনভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। যদিও ওর চাকরির অবস্থান পাল্টাবেনা। তবুও একটু সাহায্য তো পাওয়া যাবে নানা বিষয়ে দরকার হলেই,এটুকুই অনেক। অন্য বন্ধুর সাথে কথা বলতে থাকে শৌভিক শেলি অফলাইন হওয়ার পর,একটু ভাবায় শেলির সমস্যাগুলো, সবারই জীবনে হয়ত এমন নানা বলতে না পারা কিছু অসুবিধে আর অনেক পাওয়ার মাঝেও কিছু না পাওয়া থেকে যায়........
বেশ কয়েকদিন শেলি অনলাইন হতে পারেনা তেমনভাবে মাঝে মাঝে একটু ফেসবুক খুলে নোটিফিকেশন দেখে নেয়। বরের ওখানেও সব গোছানো রান্না সবই একা হাতে করতে হয় তাকে। তারপর কদিন বেড়িয়ে আর তারপর বাবার আদরে ছেলেটা একদম পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। রাজ্যের হোমওয়ার্ক করা এখনো বাকী কবে যে সব শেষ করবে কে জানে। খুব চাপেই দিন কাটে শেলির ওর বরও একটু বাঁকা চোখে তাকায় শেলি নেট খুলে বসলেই। তার ওপর ছেলে তো আছেই জ্বালিয়ে মারে গেম খেলে। তাই নেট ব্যালেন্স আর ভরেনি শেলি কয়েকদিন হলো । একেবারে স্কুল খুললেই ভরবে ভাবে। নেটে থাকলেই যত ঝামেলা সবার,এর থেকে স্কুলের অবসরে নেট খোলাই ভালো। আসলে ইন্টারনেটের নেশা এক অদ্ভুত নেশা,সময় পেলেই মনে হয় একটু উঁকি মারি কি আছে দেখি। ওর বর অরিন্দম বলে এই তো বেশ আছো নেট ছাড়া। আরে একটু অন্য দিকগুলোও দেখো,ছেলেটাকেও তো দেখতে হবে। কথাগুলো শুনে বেশ রাগ হয় শেলির কি চায় এরা কে জানে?
শৌভিকও বেশ কয়েকদিন শেলিকে না দেখে একটু আশ্চর্য হয় ,নেট চ্যাটিং বোধহয় একটা নেশার মত। আর মানসিকতার মিল হলে অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ হয় মানুষ। এই সম্পর্কের টানে বয়স, ম্যারিটাল স্ট্যাটাস কিছুই ম্যাটার করেনা হয়ত অনেক সময়ই,এ এক অদ্ভুত অভ্যাসের টান। পাশের সবুজ লাইটে মনে চলে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন একটু কথা বলার জন্য।
হঠাৎই দিন পনেরো পর একদিন শেলির টিং বেজে ওঠে শৌভিকের মোবাইলে।
স্মার্টফোনের এই এক যন্ত্রণা,সারাদিন শ্যামের বাঁশীর মতো টুংটাং বেজেই চলেছে। আর টুং বাজলেই মোটামুটি দিল মে বাজে ঘন্টি অবস্থা। শৌভিক খুলেই দেখে শেলি,জানতে চেয়েছে কেমন আছে? অনেকদিন কথা হয়না,স্কুল খুলেছে নাকি? অবাক হয় শৌভিক ওরে বাবা এতোদিন বাদে একেবারে প্রশ্নের বন্যা। যাক তবুও ভালো এতোদিনে মনে পড়েছে,ও তো ভেবেছিলো কাজ ফুরিয়ে গেছে সুতরাং আর দরকার নেই।
শৌভিক বলে," কবে ফিরলেন?আমি তো ভেবেছিলাম আপনার আ্যকাউন্টটাই বোধহয় নেই। না আমরা ভালোই আছি,স্কুলও খুলে গেছে যথারীতি চলছে।"
জানতে পারে বেশ কয়েকদিন হোলো ফিরে এসেছে নিজের শহরে,তবে নেটকার্ডটা ভরা হয়নি চাপ ছিলো। শেলির সাথে কথা বলতে বলতে বলে, “আপনি প্রচুর পড়াশোনা করেন বোধহয়”।
অবাক শৌভিক বলে, “না তো”।
~ “আপনার কমেন্ট আর পোস্টগুলো তো সে কথাই বলে”। আরে আর বলবেন না বেড়িয়ে এসে একদম কাজে মন দিতে পারছিনা। হাবি বাইরে এখানে সব আমাকে সামলাতে হয় খুব চাপ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আবার বেড়িয়ে পড়ি।"
শৌভিক বলে," কাজে মন দিন আর ছেলের যত্ন নিন। সব আবার সয়ে যাবে আসলে মানুষ অভ্যাসের দাস।"
শেলির উত্তর, " জানি থাকতেই হবে তবে রুটিনে ফিরতে সময় লাগবে। মন বড় অস্থির একদম খাঁচায় বন্দী থাকতে চায়না।"
শৌভিক হাসে," ও আচ্ছা,উড়তে চায় শুধু।"
শেলি উত্তর দেয়," উপায় নেই,আচ্ছা এখন বাই।"
পরের দিন স্কুলে গিয়ে শৌভিক শুরু করে – বৃষ্টি হচ্ছে? উত্তর আসে – হুমম, দারুণ লাগছে। শেলির প্রশ্নের জবাবে শৌভিক জানায়, তাদের এখানেও অঝোর ধারায় বারিপাত চলছে। পড়াশোনা সব শিকেয়।
শেলি বলে – এই ওয়েদারে দীঘা বা মন্দারমণি আদর্শ। বর্ষায় এর আগেও সমুদ্রে গেছে ওরা অসাধারণ লাগে,আকাশে বৃষ্টির সাথে সাথে সমুদ্রের উদ্দাম ঢেউয়ের খেলা মন ছুঁয়ে যায়। আর তার সাথে পাতে ইলিশ পরলে তো কথাই নেই।
শৌভিক বলে – "ঘুরে আসুন সবাইকে নিয়ে। কাছেই তো। মন ভালো হয়ে যাবে।'
"উপায় নেই,হাবি এখন ছুটি পাবেনা তাই এখানে আসতেও পারছেনা। তাই মানসভ্রমণ করলাম ঘরে বসে আর আপনার সাথে সমুদ্রের গল্প করে।
বেশ কদিন ধরে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে। সেদিনও বৃষ্টি ওদের স্কুল ছুটির সময়।
শৌভিক টিং শুনেই মোবাইল খোলে। শেলি জানতে চাইছে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা। এদিন সন্ধ্যে পর্যন্ত প্রায় ঘন্টা দুয়েক টানা কথা চলে দু’জনের। শৌভিক বলে একটু বেশিই গল্প করে ফেলছি না তো? শেলি জানায়, “আমি তো গল্প করতেই পছন্দই করি”। এরপর প্রতিদিনই গল্প চলতে থাকে দুজনের। প্রায়শই শেলি প্রশংসা করে শৌভিকের লেখার আর তার অঙ্কের," ওহ্ সত্যিই আপনার লেখা অসাধারণ,আর তেমনি সুন্দর আপনার লেখাগুলো। বেড়ানোর বর্ণনাগুলো তো জাষ্ট অসাধারণ। আমার ভীষণ ভালো লাগে।"
প্রশংসা পাওয়া বোধহয় মানুষের খুব দূর্বল জায়গা,এই জায়গাতে একটু প্রলেপ পড়লেই মানুষ খুশি হয় এত্তোটা। শৌভিকেরও তাই হোলো,বুঝলো শেলি ওর গুণমুগ্ধ।
অনেক সময় আমাদের অনেক ভালো গুণ বাড়ির লোক কখনো দেখতেই পায়না বা অনেক সময় আমাদের ঘর কি মুরগী বা মোরগ ডাল বরাবর অবস্থা হয় সেক্ষেত্রে বাইরের লোকের কাছে যখন প্রশংসা পাওয়া যায় মনোমুগ্ধকর লাগে।
এদিন সন্ধ্যে পর্যন্ত প্রায় ঘন্টা দুয়েক টানা কথা চলে দু’জনের। শৌভিক বলে,"একটু বেশিই গল্প করে ফেলছি না তো। শেলি জানায়, “আমি তো গল্প করতে পছন্দই করি”। এরপর প্রতিদিনই গল্প চলতে থাকে দুজনের। প্রায়শই শেলি প্রশংসা করে শৌভিকের লেখার আর তার অঙ্কের। একদিন শৌভিক বলে আমি কিন্তু অতটা প্রশংসার যোগ্য নই মোটেও। জবাবে শেলি, “না, আমি কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি আপনি যথেষ্ট প্রশংসারই যোগ্য”। শৌভিক জানায়, “আমার খেয়াল রাখার জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনি সুন্দর চ্যাট করেন”। শেলি – “আমি কথা একটু বেশি বলি এই আর কি”। শৌভিকের জবাব – “আমিও বাচাল”।
দুজনেই বিদায় নেয় দুজনের কাছ থেকে সেদিনের মতো কিন্তু মনে রয়ে যায় এক সুখানুভূতি............
ঠিক পরের দিনই ছেলেকে হোমওয়ার্ক দিয়ে মোবাইল হাতে নেয় শেলি,এটা ওটা দেখতে দেখতে দেখে শৌভিককে অনলাইনে শুরু হয় কথা জানায় মনটা ভালো নেই,ছেলে রেজাল্ট ভালো করেনি তাই খুব মন খারাপ এছাড়া একটা অন্য ঝামেলাতেও আছে। শৌভিক জানতে চাইলে বলে ঠিক বলা যাবেনা। এসব কথা এভাবে বলা যায়না। শৌভিক বোঝে সমস্যাটা ছেলের,তাই ওর দিকে খেয়াল রাখতে বলে বেশি করে। সেদিনের কথায় বোঝে আজ মুড অফ শেলির। তবুও কথা চলে শেলি জানতে চায় ওর বাড়ির খবর,বো ছেলের কথা। তারপর আবার প্রশংসা করে শৌভিকের অঙ্কের আর লেখার। ভালো লাগে শৌভিকেরও তাই মজা করে বলেই ফেলে,"আজ অনেক প্রশংসা পেলাম। এতো ভালো কেউ বলেনি জানিনা আজ রাতে ঘুম হবে কিনা?"
রোজকার মতো সেদিনও রাত এগারোটা নাগাদ শেষ কথা হওয়ার পর শৌভিক চেক করে শেলির প্রোফাইল। আজ অব্দি দেখেওনি সে একবার। পোস্টগুলো থেকে ওর কর্মক্ষেত্র আর পারিবারিক বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে। ছেলেকে নামকরা বোর্ডিং স্কুলে দিয়েছিল শেলি, কিন্তু মাস খানেক রেখেই ফিরিয়ে নিয়ে আসে নিজের কাছে। শৌভিক আর ওর বৌয়ের খুব ইচ্ছে ছেলেকে ওই আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর। শেলির থেকে অনেক কিছু জানতে হবে তাহলে। মাঝরাতের পরেও শেলিকে অনলাইন দেখে কথা বলে শৌভিক। শেলি বলে, বর তো বাইরে থাকেই। ছেলেকে ছেড়ে একা একা থাকা তার পক্ষে মোটেও তাই সম্ভব হচ্ছিল না। তবে আফসোস করে ছেলেকে ওখানে পড়াতে পারলো না বলে। এদিন শৌভিককে ছেলের অনেক গল্প শোনায় শেলি। খুব কষ্টে জন্ম দিয়েছে ওকে। তখন চাকরি করতো না। প্রসবের বহুদিন আগে থেকেই হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল, বেড রেস্টে। ছেলের নাম নিজের পছন্দে রাখতে চেয়েছিল সে। পারেনি। শ্বশুরের দেওয়া নামটাই রাখতে হয়েছে। তবে ডাকনামটা রেখেছেন ওর মা, মানে ছেলের দিদিমাই। তিনটে নামই সে শোনায় শৌভিককে। সান্ত্বনা দেয় শৌভিক, “আসলে জীবনে সবটা নিজের মর্জিমাফিক হয়ে ওঠে না। যা পাই তাই নিয়েই সুখী থাকার অভিনয়টুকু করে যেতে হয়। মেয়েদের তো আরও বেশি করে। সমাজটাই সেরকম আমাদের”। শেলি মেনে নিয়ে বলে, “সেটার দরকারও আছে, নাহলে সমাজ টিকবে না”।
রাতে শুয়ে শেলির সমস্যার কথা মনে হলো। আসলে অনেক সময়ই কিছু কথা মনে দাগ কেটে যায়। হয়তো বা ভাবায়ও।শেলির একাকীত্বে হয়ত শৌভিক একটুকরো খোলা আকাশ,আর শৌভিক হয়ত মনে প্রাণে চায় সমস্যাগুলো মিটিয়ে ভালো থাক শেলি। ফেসবুকের বন্ধুত্ব কিভাবে কখন যে মনে দাগ কেটে যায় বোঝা যায়না।
পরের দিন সকালে শৌভিক মা-ছেলের অপত্য-স্নেহের একটা সুন্দর ভিডিও পাঠায়। ফেসবুকেই শেলি জানতে পারে শৌভিকের জন্মদিন,তাইধন্যবাদ জানিয়ে শৌভিককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায় শেলি," হ্যাপি বার্থডে আচ্ছা শুভ জন্মদিন। আজ প্ল্যান কি,কেক না পায়েশ? গিন্নী কি গিফ্ট দিলো?" মজা করে শেলি।
ভালো লাগে শৌভিকেরও," না না একদম বাঙালী মুডে ভাত,ডাল,পায়েশ মিষ্টি সব,তাছাড়া এই বয়সে আবার ওসব কি হবে?"
ঠিক পরের দিন সেকেন্ড পিরিয়ডে শেলির টিং। এই সময়টা দুজনেরই অফ থাকে, রোজ গল্প হয়। ব্যাপারটা মোটামুটি অভ্যেসে দাড়িয়ে গেছে। জন্মদিন কেমন কাটলো শৌভিকের সে খবর নেয় শেলি। সন্ধ্যেয় শেলির একটু কথা বলতে ইচ্ছে করে,কিন্তু শৌভিক তেমন কথা বলতে পারেনা,পাশে বৌ আর ছেলে বসে।একটু খারাপ লাগে শেলির,রাগও হয়। এমনিই হয় ছেলেরা, সুযোগ পেলেই কথার ফুলঝুড়ি আর বৌয়ের সামনে বাধ্য পতিদেব। জঘন্য একেবারে সব কটা বাহার মে শের আর ঘরমে চুহা। তাই একটু অসন্তুষ্ট হয়েই জিজ্ঞেস করে, “ আপনি কি পরাধীন”? মজার ছলেই জবাব আসে, “আমি তো আর আপনাদের মতো বিবাহিত হয়েও ব্যাচেলর লাইফ লিড করার সুযোগ পাচ্ছি না। কাজেই সম্পূর্ণ স্বাধীন আর বলি কী করে নিজেকে”? শেলি – "আপনার দুঃখটা বুঝতে পারছি। যাক বৌ ছেলের সাথে এই সুন্দর সন্ধ্যায় আপনি সুখের পরাধীনতাই উপভোগ করুন। এনজয় দ্য ইভনিং।" মেজাজটা গরম হয়ে যায় শেলির। শৌভিককের তার মানে কথা বলার সময় শুধু স্কুলেই বৌকে লুকিয়ে, আর বাড়িতে অনুগত স্বামী সেজে বসে থাকে। ওর সত্যি তখন খুব গল্প করতে ইচ্ছে করছিলো।
দিন কয়েক চুপ থাকার পর একদিন সাতসকালে শেলি – "বৃষ্টি হচ্ছে এখানে খুব। আপনাদের ওখানে কেমন?' ব্যস্ত থাকায় শৌভিক কথা বলতে পারে না সেদিন সন্ধ্যে পর্যন্ত। সন্ধ্যেয় যখন সে শুরু করে শেলির অভিমানী জবাব – "আপনার ‘স্বাধীনতা দিবস’ এলে আবার কথা হবে।"
কয়েকদিন পর সেকেন্ড পিরিয়ডে শেলি – "আপনাকে আমার অনেক ধন্যবাদ দেবার আছে।'
~" কেন?"
~ "যেটুকু বলবো তার বেশি জিজ্ঞেস করবেন না।"
~ "উচিতও নয়।"
~ "সত্যি আমি একটা বিশেষ ফেজের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মনটা বেশ খারাপ। আপনার সাথে কথা বলে আমি অনেকটা ভালো সময় কাটিয়েছি। আপনি অজান্তেই আমার হেল্প করেছেন। আর আমার কিন্তু এরকম আননোন ফ্রেন্ড আর একজনও নেই।"
~ "ঠিক আছে। আপনি দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসুন, এটাই কামনা।"বলে শৌভিক।
শেলির মনে হয় ও যেন ওর একাকীত্বে একটু বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছে শৌভিকের ওপর। হয়ত এটা ঠিক নয়। ও চেষ্টা করে নিজেকে সামলাতে কিন্তু কষ্ট হয়।
একদিন সকালে ব্রততীর একটা সুন্দর আবৃত্তি পাঠায় শেলি। বলে, "শুনে দেখবেন ভালো লাগবে।" সারাদিনের ব্যস্ততায় মোবাইল খুলতে পারেনি শৌভিক সেদিন। রাতের দিকে শোনে। লেখে –" অসাধারণ।"
~ "কী? কবিতাটা?"
~ "যে পাঠিয়েছে সেও।"
শেলির একটু রাগ হয়,মনে মনে ভাবে এদিকে কথা বলার সময় পায়না ওদিকে মন ভোলাতে চায়। তাই বলে,
~ ভালো লেখেন বলে যা খুশি লেখাটা ঠিক না।
শেলি দুঃখ করে ছেলেকে ঠিকঠাক পড়ানোই হচ্ছে না আর, খালি গল্প করাই হচ্ছে। শৌভিক বলে, আমার থেকে দূরে থাকুন।
~ কেন?
~ তাহলে গল্প ছেড়ে পড়ানোয় মন বসবে।
~ না না তা নয়।
~ আর আমার যা প্রশংসা করা শুরু করেছেন আমিও ‘পরস্ত্রীকাতর’ হয়ে পড়ছি কিনা কে জানে!
~ আপনি ভালো সঙ্গ দেন আমায়।
~ জানি তো!
~ আমাদের এই সম্পর্কটা নিছক বন্ধুত্ব নয়, তবে ওই জাতীয় কিছু একটা।
~ না না, নির্ভেজাল বন্ধুত্বই।
শৌভিকের পরস্ত্রীকাতর কথাটা খুব কানে লাগে শেলির,খারাপও লাগে। হঠাৎ ভদ্রলোক এমন বললো কেনো। নিজেরও খুব অপরাধবোধ হয় সত্যি বোধহয় নিজের বর আর ছেলের দিকে নজর দেওয়া উচিত। কথার ফাঁদে এমনভাবে জড়িয়ে পড়াটা ঠিক নয়। কাজের মাঝেও পরস্ত্রীকাতর কথাটা বার বার খোঁচা মারে।
দুএকদিন ভালো করে কোন কথা বলেনা।
তবে ভাবে এর একটা জবাব দিতে হবে। এ আবার কি ধরণের কথা। ওনাকে বোঝাতে হবে ওনার এক্সিটেন্সটা ম্যাটার করেনা শেলির জীবনে। কাউকে এইজন্যই প্রায়োরিটি দিতে নেই,সত্যি তো ইগনোর করেন উনি শেলিকে, যখন বাড়িতে থাকেন।
দিনকয়েক পর একদিন সেকেন্ড পিরিয়ডে শুরু করে শেলি।
~ আপনি তেমন কিছু প্রভাব ফেলতে পারেনি আমার ওপর।
~ সে প্রয়োজনও নেই।
~ বন্ধুত্বে ইতি পড়বে না আমার দিক থেকে, তবে আমায় বান্ধবী হিসেবে ভাববেন না। তাহলে আমিও একজন ভালো বন্ধুকে হারাবো।
~ হুমম, বন্ধুত্বটাই ‘লক্ড ফরএভার’ থাক।
~ তবে আপনার ‘কাতর’ শব্দটায় আমায় ঘোর আপত্তি।
~ ওটা কি আপনার হজম হলো না! আমি তো আপনাকে ভুলতে পারবো না!
~ মজা করা ছাড়ুন তো! না কি আপনি সিরিয়াস?
~ আমি তো...
~ আর যদি সিরিয়াস হন তো মিসেস-কে বলুন, নতুন সফ্টওয়্যার ইনস্টল করে দেবে?
~ যে সফ্টওয়্যার সিস্টেমে ইনস্টল্ড সেটা দূর করা যায় কি?
~ যায়, কে করছে তার ওপর নির্ভর করে।
~ তাহলে আমার মিসেস-এর বন্ধু হয়ে যান। একটা FR দিয়ে দিন।
~ FR?
~ Friend Request.
~ উনি রাজি হবেন?
~ নিশ্চয়ই।
~ বেশ, ভেবে দেখি।
একটু মজা করেই শৌভিক বলে ফেলে,
~ তবে ‘গোপন অভিসার’টা আবার ‘ওপেন’ করে দেবেন না!
এবার সত্যিই রাগ হয়ে যায় শেলির কি বলতে চাইছেন ভদ্রলোক একদিকে বলছেন ওনার মিসেস কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে আবার বলছেন গোপন অভিসার।অভিসার কথাটা শুনে মাথাটা গরম হয়ে যায়, এসবের মানে কি? তাই একটু রেগেই বলে,
~ আমি গোপন কোনোকিছুতেই থাকি না। আপনার এই দুটো কথা ‘কাতর’ এর পর ‘গোপন’ – আমার মন খারাপ হয়ে গেলো।
আপনি আমায় ভুল বুঝছেন বলে শৌভিক,আমি সত্যিই মজা করেছি,
~ আপনি বরং আমার মিসেস-কে FR দিন, ওর সাথে কথা বলুন।
~ ছাড়ুন। আপনিই আমাকে সহজভাবে নিতে পারলেন না, উনি কি পারবেন?
~ নিজেই বুঝে নেবেন কথা বলে।
~ ঠিক আছে বলবেন আমার কথা, পাঠিয়ে দেবো FR। বলে শেলি।
~ আরে ও তো জানেই আপনার কথা, সেই নৈনিতাল থেকে। নতুন আর কী বলবো?
~ ও! আমার বরও কিন্তু আপনার কথা জানে। আপনিও তাহলে ওকে FR দিয়ে দেবেন।
~ আগে তো আমি বললাম, আপনি আগে FR দিন আমার বউকে। তারপর আমি।
~ আমার মনে হয় আপনি একটু বেশি ভোলেভালা টাইপের, তাই তালটা ঠিক রাখতে পারছেন না।
~ মানে?
~ একদম সাধারণ পুরুষমানুষদের মতো আপনি।
~ তালে তাল মেলানোই তো কাজ।
~ না, সবাই সেটা পারে না।
~ আপনার অনেক অভিজ্ঞতা।
~ আপনি আমাদের পুরো কনভারসেশন ডিলিট করে দেবেন,বলে শেলি।
~ কেন? তাতে কী লাভ?
~ নাহলে গৃহযুদ্ধ অবধারিত।
~ কীসের গৃহযুদ্ধ? আশ্চর্য হয় শৌভিক।
অদ্ভুতভাবে মেজাজ হারিয়ে ফেলে শেলি,
~ আপনার মতো বন্ধু আমার আর একটাও নেই, সেরকম কারও সাথে কথাও হয়না। ঠিক আছে, আর কথা বলবেন না।
~ কেন? হঠাৎ কী হলো আপনার? জিজ্ঞেস করে শৌভিক।
~ আমি আপনাকে ব্লক করে দিচ্ছি ম্যাসেঞ্জারে। তবে আনফ্রেন্ড করছিনা, বন্ধু তো থাকছিই আমরা। কিছুদিন ব্লকড থাকুন, সময় নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে।
~ ভুলটা হলো কীসে যে ঠিক হয়ে যাবে?
উত্তর না দিয়ে শৌভিককে ম্যাসেঞ্জারে ব্লক করে দেয় শেলি। সেদিন একটা গ্রুপে শৌভিক একটা পোস্ট দেয় সমকালীন একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। সেই পোস্টে কাউকে ম্যাসেঞ্জারে ব্লক করার উপমা দিয়েছিল সে। রাত আটটার দিকে টিং শুনে ফোন খুলে দেখে শেলি – “আপনি ভয়ঙ্কর! একে বলে কলমের খোঁচা”। ম্যাসেঞ্জার আনব্লক করে ফিরে এসেছে সে...
ফেসবুকে শৌভিকের সব পোষ্টেই চোখ রাখে শেলি,হয়ত বা খুঁটিয়েই দেখে। এই পোষ্টটা দেখে বুঝতে পেরেছিলো ওকে খোঁচা মেরে পোষ্টটা করা। ভদ্রলোকের নিশ্চয় খারাপ লেগেছে ওর ব্যবহারটা,তাতে এক ফোঁটাও অনুতাপ হয়না শেলির মনে মনে ভাবে বেশ হয়েছে। বন্ধুত্ব আবার ঘড়ি ধরে হয় নাকি,নিছক বন্ধুত্বের মধ্যে এই কথাগুলো বললেন কেনো উনি? এটা ঠিক শেলির ওনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে,হয়ত ওর মনও খোঁজে মেসেঞ্জারের সবুজ বাতি। তা বলে এসব আবার কি কথা? গোপন অভিসার,পরস্ত্রীকাতরতা,বলতে পারেন বলে যা খুশি বলবেন?
অভিসারের শখও আছে আবার গিন্নীর ভয়ও আছে। অভিসারের কথা ওকে বললো কেনো,কারো সাথে চ্যাট করা কি অভিসার? তবে ওনার পোষ্টটা দেখে মনে হোলো এর জবাব দেওয়া উচিত।
শেলি শুরু করলো
~ আপনি ভয়ঙ্কর! একে বলে কলমের খোঁচা। হঠাৎ আমাকেই খোঁচাটা দিতে হোলো? ভালোই রিভেঞ্জফুল আপনি।
শৌভিক ইতিমধ্যেই একটু বিরক্ত হয়েছে শেলির ওপর। মনে প্রশ্ন জাগে ভদ্রমহিলা এমন কেনো? হঠাৎ ক্ষেপে ওঠেন,কি করলো শৌভিক নিজেই ব্লক করলো ওকে। তাই ইচ্ছে করেই না চেনার ভান করে।
~ মাফ করবেন। আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না।
~ দরকার কী চেনার?
~ আপনার মতো দেখতে একজনকে চিনতাম একসময়! সে এখন পুরোনো।
~ ভুলটা ভেঙে গেলো তো? আমি অন্য কেউ। খুশি থাকুন এবার।
~ খোঁচাটা কীভাবে দিলাম সেটা জানিয়ে কৃতার্থ করুন।
~ কাউকে কৃতার্থ করার ভার আমি নিই নি।
~ ‘লক্ড ফরএভার’ বন্ধুত্বটা তাহলে টিকলই না।
~ আপনি সেই পুরোনো কারোর সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন।
~ হাত-পা তো বেঁধে দিয়েছিলেন আমার, ফিরলেন কেন তাহলে?
~ আপনি সেটা আমার থেকে ভালো জানেন।
~ না জানি না। সত্যি করে বলুন ব্যাপারটা কী?
~ আপনি জানেন বোধহয় অস্ত্রের চেয়ে কলমের জোর বেশি। আমি তুচ্ছ, এখন ভয় করছে রীতিমতো।
~ হুমম। অসির চেয়ে মসী ধারালো। তবে আপনি তুচ্ছ কেন? আর ভয়টা কীসের?
~ আর কথা বলবো না। শুধু শুনবো।
~ উত্তরগুলো দিন।
~ আমি জানলে তো বলবো।
~ তার মানে?
~ জানি না। তবে আজ থেকে ম্যাসেঞ্জার খোলাই থাকবে।
আপনার বাড়ির দরজা আপনি খোলা রাখুন বা বন্ধ রাখুন তাতে আমার কি? আমাকে জানাচ্ছেন কেনো?
পরের দিন শেলি নিজের টাইমলাইনে একটা পোস্ট দেয়। বিষয় বন্ধুত্ব বনাম ভালোবাসা। রবি ঠাকুরের লেখা থেকে নেওয়া সেই পোস্ট - “বন্ধুত্বের উঠিবার নামিবার স্থান আছে। কারণ, সে সমস্ত স্থান আটক করিয়া থাকে না। কিন্তু ভালোবাসার উন্নতি অবনতির স্থান নাই। যখন সে থাকে তখন সে সমস্ত স্থান জুড়িয়া থাকে, নয় সে থাকে না। যখন সে দেখে তাহার অধিকার হ্রাস হইয়া আসিতেছে তখন সে বন্ধুত্বের ক্ষুদ্র স্থানটুকু অধিকার করিয়া থাকিতে চায় না”। খুঁটিয়ে পড়ে শৌভিক কমেন্টসগুলো। ওর বন্ধুরা হরেকরকমের কমেন্ট করে। শেলিও উত্তর দেয় – “প্রেম যে কত রকমের হয়!”, “বন্ধুত্ব পাওয়া বড়ই দুষ্কর, ধরে রাখা আরো কঠিন”।
শৌভিক আসে ম্যাসেঞ্জারে পোস্টটা দেখার পর।আসলে কমেন্টস গুলো দেখে বুঝতে পারে ওকে উদ্দেশ্য করে লেখা পোষ্টের কমেন্টগুলো।
~ এরকম পোস্ট কেন?
~ আমার ইচ্ছে।
হঠাৎ ‘ক্রস কানেকশন্’ সিনেমার ‘নীলের কাছাকাছি’ গানটা পোস্ট করে শেলি টাইমলাইনে। শৌভিক লাইক করে। একটু পরেই সেটা ডিলিট করে শেলি।
~ ডিলিট করলেন কেন?
~ ভাবলাম গানটা শুনে কেউ যদি ইমোশনাল হয়ে পড়ে। তাহলে তো মুশকিল।
~ কীসের ইমোশন? কীসের মুশকিল? কী হয়েছে বলুন তো আপনার?
~ আমার সাথে যে এত কথা বলেন আপনার বউ জানে?
~ মোটামুটি জানে আপনার সাথে গল্প করি। ওর এত সময় নেই, সারাদিন সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকে এত!
~ বলতে পারবেন আমার সাথে কী কী কথা বলেন। পারবেন কনফেস করতে?
~ কনফেস! বেশ তো বলবো সব। আপনি তো ওকে FR দেননি এখনও। জিজ্ঞেস করেছিলাম। বললো, “না পাঠায়নি তো”। ওর বন্ধু হয়ে যান আর নিজেই বলুন।
~ এরপর কনফেস করার ব্যাপার এসে গেলে আরও অনুতপ্ত বোধ করবো।
~ আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
~ কনফেস করার মতো কিছু হয়েছে কি? বেকার কেন অশান্তি বাড়াবেন?
~ আপনি বরং দাদাকে ফোন করুন একবার। বুঝতে পারছি আপনার মন ভালো নেই। গল্প করুন ওনার সাথে। পরে আবার কথা বলবো। ভুলে যাবেন না আবার আমাকে!
~ আমার মেমরি অত শর্ট নয়।
~ আপনি তো হিউম্যান কম্পিউটার – শেলি দেবী।
~ এটা কমপ্লিমেন্ট না বিদ্রূপ? আর কোনোদিন অচেনা কারও সাথে বন্ধুত্ব করবো না। তবে আপনার কথা ভুলবো কীভাবে? সত্যি হয়ত শৌভিককে কোনদিন ভুলতে পারবেনা। কিন্তু তাই বলে ওর কথাগুলো বড় খোঁচা মারে শেলিকে।
কোনদিন ভুলতে পারবেনা কথাটা এক ঝলক শান্তি দেয় শৌভিককে,সত্যিই শুধু শুধু সম্পর্কটাকে জটিল করতে একটুও ভালো লাগছিলোনা। তাই বলে একটু খুশি হয়ে,
~ ও! ধন্যবাদ!
~ আপনি আমাকে সত্যি আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে দিলেন। তবে আমি আর ফেসবুকে আর অঙ্ক করবো না!
~ এটা করবেন না, রিকোয়েস্ট করলাম।
~ তবে আপনিও অচেনা কারও সাথে গল্প করবেন না কেন? সবাই তো বেয়াদব নাও হতে পারে।
~ আপনি কিন্তু একটা বেয়াদবি করেছেন। ‘গোপন অভিসার’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন কেন? আমার খুব খারাপ লেগেছে।
~ আর সেসব কথা আসে কেন? সে তো অতীত।
~ তখনই বা কেন বলেছিলেন? আমি সবার সাথে এরকম ভাব জমিয়ে বেড়াই? আমাকে কী ভেবে বসে আছেন?
~ আর যাই ভাবি না কেন, আমার প্রেমিকা ভেবে বসিনি কিন্তু!
~ সেটা জানি। প্রেমিকা ভাবলে এভাবে অপমান করতেন না। এটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার আছে।
~ অপমান? কীভাবে?
~ তবু কেন আপনার সাথে কথা বলছি তাই ভাবছেন। আসলে ভাবছি আমি এত ভুল নির্বাচন করলাম কীভাবে? হয়তো আপনি কথাটা বেখেয়ালে বলে ফেলেছেন। ঠিক আছে, ছেড়ে দিন। আমিও পারফেক্ট নই। অন্য কেউ হলে সে আর ‘ফ্রেন্ড’ থাকতো না। আপনার ব্যাপারটা আলাদা। আপনার অঙ্ক দেখে মুগ্ধ যে আমি,তাই হয়ত আপনাকে ভুলতে পারছিনা।
সত্যিই কি অঙ্ক শেখার জন্য বন্ধুত্বটা হয়েছিলো? একটুও সমানুভূতি আর ভালোলাগার বন্ধুত্ব তৈরি হয়নি? বলে শৌভিক।
শেলির ইচ্ছে করেনা কথাগুলোর উত্তর দিতে সত্যিই এই ফেসবুকে বেশি সময় দিয়ে আর মেসেঞ্জারে চ্যাট করে ক্ষতিগ্ৰস্ত হচ্ছে ছেলেটা। তাই বলে,~ আমি একটু ব্যস্ত, ছেলেকে পড়াবো এবার। রাখছি এখন।
~ আর আপনার মিসেস নিতেও পারবেন না একটা মেয়ের সাথে আপনার দীর্ঘ চ্যাটিং তাই আপনি বেকার অশান্তি ভোগ করবেন। এটাকে একটা ভুল পেজ ভেবে ছিঁড়ে ফেলবেন।
~ কিছুই বুঝতে পারছি না আপনার কথাগুলো। আচ্ছা এখন রাখছি,বলে শৌভিক।
~ রাখুন,আমিও তো বসতে পারছি না ছেলেকে নিয়ে। আর খুঁজবেন না আমাকে।
না না তা হয়তো খুঁজবো কিন্তু আর ডিস্টার্ব করবো না,মনে মনে বলে শৌভিক।
এরপর শেলি ফেসবুকে ‘আনফ্রেন্ড’ করে দেয় শৌভিককে। তবে ম্যাসেঞ্জার খোলাই থাকে। আর কথা বলে না শৌভিক। শেলিও চুপচাপ ছিল। দু’দিন পর ম্যাসেঞ্জারে ফোন আসে শৌভিকের। শৌভিক ধরে না। তিনটে কল মিসড হওয়ার পর ফোনটা হাতে নেয় সে...
ফোনটা হাতে নিয়ে শৌভিক দেখে তিনটে কলই শেলির ছিল। ও ফিরে ফোন করে না, করে না কোনো রেসপন্সও। কিছুক্ষণ পরে শেলির টিং...
~ আরে বাবা ভুল করে কল হয়ে গেছে। সিরিয়াসলি।
~ হুমম। বিশ্বাস করি তো আপনাকে। ‘সিরিয়াসলি’ বলার দরকার নেই।
~ আপনার বউ মেনে নেবে তো?
~ কী মেনে নেবে?
~ নাকি বকা খেলে আড়ি করে দেবেন আবার?
~ আমি কখন আড়ি করলাম? আর বকা খেয়েছি কে বললো? এখনও তো FR দিয়ে উঠতে পারলেন না আমার বউকে।
~ তবে খেলে কী করবেন একটু ভেবে জানান। তাহলে আমি কথা বলবো, নাহলে থাক।
~ ভাবার কী হলো এতে। চাইলে কথা বলবেন।
~ তারপর বোকা বনি আর কি?
~ মানে?
~ সত্যি! আপনার সাথে এরকম ‘খিচিমিচি’ হয়ে গেল কে জানে! শেলি বলে।
~ আগে ফেসবুকে ‘বন্ধু’ করুন আমাকে...সেখানে তো ব্লক করে রেখেছেন।
~ আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করেননি তো কারও সাথে? কেমন বেকুব লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে আমাদের বন্ধুত্বের কথা সবাই জানে।
~ আমিও তো একই কথাই ভাবতে পারি।
~ আমার ‘ভিউ’টা আপনি জানেন, সেখানে একটুও কাদা নেই। আপনার কথা জানে শুধু আমার মা আর বর আর কাউকেই কিছু বলিনি।
~ বিশ্বাস করি বিনা বাক্য-ব্যয়ে, তবে ফায়দা নেবেন না সেই বিশ্বাসের। বিরক্ত লাগে একটু শৌভিকের কি যে হয়েছে মহিলার কে জানে। অন্য কেউ হলে খচাৎ করে ও নিজেই ব্লক করতো কিন্তু কেন জানিনা ও নিজেও একটু দূর্বল হয়ে পড়েছে ভদ্রমহিলার প্রতি। প্রথমে ওনার প্রশংসাতেই মন ভিজে গিয়েছিলো। নিজেকে জিজ্ঞেস করে কোন পাপবোধ পায়নি এই সম্পর্কে। হয়ত ব্যস্ত জীবনে কেউ একটু মন ছুঁয়ে গেলে একটু গল্প করলে ভালো লাগে তেমনি।
~ ফায়দা নেবো তো,আর ফায়দা নেয়াই আমার কাজ!
~ থামুন আর ভালো লাগছে না, অনেক রাত হলো, শুতে যান।
~ আপনাকে দিয়ে অঙ্ক করাবো ছেলের। আপনাকে তাই ছাড়তে পারছিনা,ওটাই সুযোগ নেওয়া।
~ সে তো জানিই এ আর নতুন কী?
~ নাইস ড্রিমস অ্যান্ড গুড নাইট।
~ শুভরাত্রি।
এমনভাবেই অনেকেই করে থাকেন চ্যাটে বন্ধুত্ব যেমন শৌভিক আর শেলি করেছে কারো তেমন কিছুই উদ্দেশ্য থাকেনা। কখনো থাকে ভালোলাগা কখনো নিছকই বন্ধুত্ব। দুটি সংসার করা মনের মিল হয়তো আরো বেশি হয় কারণ দুজনেই সংসারের ঘাত প্রতিঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে খোঁজে একটুকরো খোলা আকাশ। আবার ভয় পায় স্ত্রী পুত্র,স্বামী সন্তানেরও। কেউই ক্ষতি করতে চায়না তার নিরাপদ আশ্রয়টুকুকে।অথচ এক ভালোলাগার নেশা নিয়ে ছুটে যায় একজন আরেকজনের দিকে। হয়ত বা মিস করে আর লাষ্ট সীন খোঁজে। কিন্তু কেউ জানাতে চায়না তার প্রকৃত ঠিকানা হয়ত ভয়ে বা নিরাপত্তাহীনতায়,শেলিও এমনি করেছিলো কিছুতেই বলতে চায়নি তার স্কুলের নাম... শৌভিককে ছেড়েও ছাড়তে পারেনি তাই বার বার ব্লক আর আনব্লকে ফিরে এসেছে। রাগ করেছে,ঝগড়া করেছে। তবুও শৌভিকের মনে হয়েছে ওর দিক থেকেই দূর্বলতাটা বেশি আর তাই কখনোই শেলিকে চাইলেও ব্লক করতে পারেনি।
পরের দিন নানা ব্যস্ততায় আর নেট অন করেনি শৌভিক। দু-তিনটে অফিসের কাজ সেরে যখন স্কুলে পৌঁছলো তখন দুপুর গড়িয়েছে। টিচারদের সাথে একটা মিটিং সেরে নেট অন করামাত্রই স্মার্টফোনের পর্দায় শেলির মুখটা ভেসে উঠলো টিং করে। সে লিখেছে – অকাতর বন্ধুত্বের আশা রাখি। শৌভিক ফেসবুক নোটিফিকেশন চেক করে দেখে শেলি FR দিয়েছে,তার মানে আবার বন্ধুত্বের আমন্ত্রণ। Accept করে ম্যাসেঞ্জারে ফিরে আসে শৌভিক – বিশ্বাসভরে যে ফিরে এসেছেন তার মর্যাদা যেন দিতে পারি। হেলেন কেলার বলেছিলেন – আলোতে একা হাঁটার চেয়ে অন্ধকারে বন্ধুর হাত ধরে চলা ঢের ভালো।
~ নিশ্চয়ই পারবেন।
~ আজ আমি একটু ব্যস্ত। রাখবো এখন।
~ হাতে অনেকটা অতিরিক্ত সময় পেলে আজ আসবেন একবার... পরে।
~ আজ হাতে একটুও সময় নেই।
~ আর আমার হাতে সময় আর সময়। আপনার প্রচুর কাজ। কাজ সারুন, পরে কথা বলবো।
~ দেখি যদি সময় পাই।
~ এবারে কি ঠিক করেছেন যে মেপে মেপে কথা বলবেন। বলতেই পারেন, আমার তাতে আপত্তি নেই।
~ ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখে তো ডরাবেই...
~ কথা ভালো বলেন তাতে সন্দেহ নেই, তবে সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর দেবেন তো?
~ আগে বলুন আর এরকম ব্লক, আনফ্রেন্ড এসব করবেন না? জিজ্ঞেস করে শৌভিক।
~ মিসেস ছাড়া অন্য কারও কাছে আমার কথা শেয়ার করেছেন? বা আমায় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছেন?
~ আপনার ভয়টা কীসের? আপনি এতটা স্বাধীন, তাও এতো ভয় কীসের?
~ ভয় না... ভাবছি অপমানিত হবার কথা... দেখলেন তো সোজা উত্তর দিলেন না।
~ সে তো আমিও হতে পারি। আপনি যদি কারও কাছে আমার কথা বলে থাকেন...
বন্ধুত্বের কথা বলতেই পারি। আমার দিক থেকে তার বেশি কিছু নেই।
জানি আমার অঙ্ক আপনার দরকার,আমার বন্ধুত্ব নয়,মুখে এ কথা বললেও বন্ধুত্ব কামনা করে শৌভিক কেনো যে এতো দূর্বলতা আর ভালোলাগা বোঝেনা সে।
এর মাঝেই শেলির বর ওকে ফোন করে। শেলি কথা বলার ব্রেক নেয়। ওর বর ওকে ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে খোঁজখবর নেয়। ফোন সেরে ফিরে শেলি ওর বরের গল্প শোনায় শৌভিককে। প্রায় ১৬ বছর হয়ে গেল ওদের বিয়ের। খুব ভালোমানুষ, একদম পারফেক্ট। সব বলা যায়, সব করা যায় এমন একটা মানুষ ওর বর। জায়গার জিনিস জায়গা রাখাটা ওর খুব পছন্দের। শেলিও খুব ভালোবাসে ওকে। শৌভিক সব শুনে প্রশংসা করে বরের। শেলি ফেরে এবার নিজেদের কথায়... আর সেই জন্যই তো চাইনা,আমার ফেসবুকের কোন পোষ্ট বা কমেন্ট দেখে ওর মনে কোন সন্দেহ হোক।
"তার মানে আপনি বন্ধুত্বও চান আবার স্বামীর পুরো বিশ্বাসও চান। মেসেজে এতো কথা বলা যায়না, যদি ফোন নম্বরটা দেন,একদিন কথা বলা যেতে পারে। বা দেখাও হতে পারে,যদি সুযোগ হয়।"
ফোননম্বর দিতে পারি,তবে যখন তখন ফোন করবেন না। আমার ছেলে বড় হয়েছে। যে কথা বললাম উত্তর দিলেন না।
~ কী বলবো বলুন তো?
~ আমার কথা আপনার বউ ছাড়া আর কাউকে বলেছেন?
~ কী যে বলি! যদি বলি না, বলবেন প্রেমে পড়েছিলাম আপনার। আর যদি বলি হ্যাঁ, বলবেন অপমান করেছি আপনাকে। আমার যত জ্বালা!
~ কথা ঘোরাবেন না, এতটাও ভালো বক্তা নন আপনি।
~ সে তো জানি!
~ আচ্ছা মিসেস ফিরেছে আপনার?
~ ও তো আজ বাড়িতেই।
~ বাহ্! তবু কীভাবে কথা বলছেন আমার সাথে?
~ আপনার সাথে তো শুধু নয়। আমি ফেসবুকেই আছি দেখুন। পোস্ট করছি, কমেন্ট করছি আর হ্যাঁ, তারই ফাঁকে ফাঁকে বউয়ের সাথেও কথাবার্তা বলছি। আমি তো এরকমই করে থাকি।
~ আচ্ছা রাখছি, যান গল্প করুন। আপনি বেশ লাকি, একসাথে থাকেন।
~ আপনারাও একসাথে থাকতে পারবেন, দাদা নিশ্চয়ই ট্রান্সফারের চেষ্টায় আছেন। দেখুন আমি একটু বেশি মজা করি, তাই হয়তো আপনি সন্দেহের চোখে দেখেন আমাকে। তবে আমি আপনাকে শ্রদ্ধা আর সম্মান করি।
~ সেই বিশ্বাসটা আছে বলেই তো কথা বলি। আর আপনি এতো ভালো ম্যাথ করেন...
~ দেখুন এই ম্যাথ বা সাহিত্য নিয়ে আমাকে ওরকম ওপরে তুলবেন না তো।
....আপনি কি কাতর হয়ে পড়েন?
হয়তো তাই,প্রশংসা কার না ভালো লাগে।
সেদিনই সন্ধ্যেয় ছেলেকে পড়া দিয়ে কথা শুরু করে শেলি। ওর আগের স্কুলের একটি বাচ্চার চিকিৎসার ব্যাপারে আর্থিক সাহায্য করার উদ্যোগ নিচ্ছে সে। সেই বাচ্চাটির পুরো ঘটনা শোনায় শৌভিককে। বন্ধুর মানবিকতায় মুগ্ধ হয় শৌভিক। জানায় এব্যাপারে ওর সকল শিক্ষক শিক্ষিকার এগিয়ে আসা উচিত। শেলি চাইলে সে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করতে তৈরি। তবে শৌভিকের এন.জি.ও. কিছু করতে পারবে না, কারণ ওই সংস্থা স্থানীয়ভাবে কাজ করে। অন্য জেলায় গিয়ে সেটা সম্ভব হবে না। পরস্পরকে শুভরাত্রি জানিয়ে সেদিনের মতো কথা শেষ হয়।
শৌভিক এখন জেনে গেছে শেলি ঠিক কোন কোন সময়ে অনলাইন থাকে। পরের দিন টিফিনের সময় শৌভিক শুরু করে।
~ একটু কথা বলি এখন ফ্রী তো?শেলি জিজ্ঞেস করে আপনি কোথায়? স্কুলে না বাড়িতে?
~ আজকাল বড্ড সন্দেহ যে!এমন প্রশ্ন কেনো করেন,আমার মিসেস সত্যিই অন্যরকম। আপনার সঙ্গে কথা বলি ও জানে তবে কখনো বাঁকা চোখে তাকায়না আমিও ওকে শ্রদ্ধা করি
~ আমার একটাই সন্দেহ। আপনি আমায় নিয়ে হাসাহাসি করেন না তো?মানে আমি একটা ক্ষ্যাপাটে মহিলা,সারাক্ষণ হিবিজিবি বকি আর ব্লক করি।
~ ইয়ার্কি মজা এসব করতে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড লাগে না। আমি এমনিতেই খুব খুশীতে থাকি।
~ সবার সাথে সহজ সরল গল্প করে সময় কাটালে সবাই খুশিতেই থাকে। সন্দেহ নিয়ে কেউই ভালো থাকতে পারেনা।
~ আপনার সাথে আমার আলাপ কিন্তু কাকতালীয়।
~ একদম।
নৈনিতাল না গেলে আলাপটা এতটা গভীর হতোনা।
একটা ভুল করছেন। নৈনিতাল বা তার আগের শেলিকে আমি আর চিনিনা। সেই শেলি তো আমায় একাধিকবার ত্যাগ করেছিল। কাল থেকে আপনি কিন্তু আমার নতুন ফেসবুক বন্ধু।
~ হতে পারে, আবার না-ও।
~ আমার মনে হয় সন্দেহ থাকলে বন্ধুত্বে ইতি টানাই ভালো।
~ তাই তো কাল প্রশ্নটা করেছিলাম।
~ আমি চাইনা সন্দেহের বন্ধুত্ব, বা বন্ধুত্বে সন্দেহ।
~ নাহ্। কোনও সন্দেহ নেই আর।
~ আপনাকে অন্যরকম লাগছে এখন।
~ যে ভুল করে স্বীকার করতে জানে, এতো ভালো লেখে আর এতো ভালো অংক করে তাকে কি আর সন্দেহ করা যায়?
~ আবার... আমি একটা মিটিং-এ যাবো। রাখি।
~ আমাকে অন্যরকম লাগে? কীরকম? ঝগড়ুটে?
~ আমার কেন জানিনা মাঝে মাঝে মনে হয় আপনি আমার চেনাদের কেউ একজন, আশেপাশেই থাকেন হয়তো। তবে আপাতত বন্ধু ছাড়া কিছুই মনে হয়না।
শৌভিকের মিটিং, শেলির শ্রুতিনাটকের রিহার্সাল। দুজনেরই তাড়া। কথা থেমে যায়। মিটিং-এ যখন ছিল শৌভিক, শেলি তখন কিছু ম্যাসেজ করে। কিন্তু অন্যদের সাথে ব্যস্ত থাকায় সেগুলো ওখানে আর দেখা হয়ে ওঠে না। বাড়ি ফিরে রাতে যখন খোলে শেষ কথাটা দেখতে পায় – “একটা রেসপন্স তো করবেন”। দুঃখপ্রকাশ করে শৌভিক উত্তর দিতে না পারার কারণ জানায়। শেলি শুরু করে...
~ আজ মা-বাবার কাছে আছি রাতে।
~ বাহ্।
~ আমাদের বাড়ি থেকে ১০ মিনিট। বৃষ্টিতে আর ফিরলাম না।
~ সত্যাই তো তাঁরাও আপনার সান্নিধ্য আশা করেন। আপনার ছেলেও দাদু-দিদুনকে কাছে পেলে খুশি হবে। আনন্দে কাটান সময়টা।
~ ঠিকই।
~ ছেলের পড়ার চাপে আর আসা হয়ে ওঠে না।
~ পড়াটাকে চাপ বানালে কিন্তু সমস্যা ওকে স্বাধীনতা দিন,আজ রাখি। শুভরাত্রি।
পরের দিন শেলির স্কুলে নতুন কম্পিউটার ইন্সটল করা হয়। সে খবর আর ছবি সে পাঠায় শৌভিককে।
~ খুব খারাপ হলো। এবার স্কুল বারবার ভিজিট হবে।
~ তার মানে ফাঁকি বন্ধ। ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপও সাবধানে করতে হবে।
~ আমাকে পরাধীন করতে পারবে?
~ আপনার স্কুলের নাম বলুন। আমি ভিজিটের ব্যবস্থা করছি।
~ বলবো না।
~ কেন? খুঁজেই চলে যাবো?
~ যখন আপনার ছেলে বড়ো হবে, ওকে আমাদের শহরের বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে ভরতি করতে চাইবেন তখন আসবেন তিনজনে মিলে। দেখা হবে।
~ স্কুলের নামটা কিন্তু বললেনই না। এতো ভয় পান কেনো? আমি কি চলে যাবো আপনার স্কুলে?
যদি চলে আসেন,তখন তো...
আপনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড,প্রেমিকা নন। আপনার সাথে কোন অবৈধ সম্পর্ক নেই আপনার। তবুও এতো সংকোচ কেনো? মন আর সম্পর্ক দুটোকেই সাফ রাখুন শান্তি পাবেন।
রাতে শুয়ে শৌভিকের কথাগুলো মনে হয় শেলির,শৌভিকেরও শেলির কথা। কি যে অদ্ভুত কেমেষ্ট্রী কেউ কাউকে ভুলতে পারেনা।
প্রতিদিনই এখন দুজনের নিয়ম করে গল্প হয়। দিনে তিন থেকে পাঁচবার। কোনোদিন আরও বেশি। দু’একদিন পর শৌভিকের একটা পোস্টে কিছু না বুঝেই কমেন্ট করে শেলি। পোস্টটা সমসাময়িক ঘটনা প্রসঙ্গে। সেটা জানা না থাকায় বা ইঙ্গিতটা বুঝে উঠতে না পারায় শেলির কমেন্টগুলো বোকা বোকা হয়ে যায়। চ্যাটে শৌভিক সেটা জানালে সে একটু আপসেট হয়ে পড়ে। শৌভিক বোঝায়...
~ ওরকম কত ভুল আমি করি। আসলে আপনি খুব সরল। যা মনে আসে তাই বলে দেন।
~ মনে হচ্ছে? আসলে আমি খুব জটিল চিন্তাভাবনা করি। আর তাই খুব অশান্তিতে থাকি।
~ মা-ব্যাটার সংসার। তাতেও অশান্তি। কী যে বলেন!
~ শান্তি অশান্তি মনের ব্যাপার, সংসারের না।
~ হুমম।
~ কী করছেন আপনি?
~ ছেলেকে অঙ্ক করাচ্ছি আর তার ফাঁকে ফাঁকে আপনার সাথে কথা।
~ কী বলি আর কী বোঝেন?
~ মানে?
~ গুড নাইট।
~ শুভরাত্রি।
দিনকয়েক বাদে একদিন ফের স্কুল থেকে বেরোবার সময় বৃষ্টিতে আটকে পড়ে শৌভিক। শেলির টিং...
~ বাড়ি চলে এলাম। আপনি?
~ স্কুলেই। বৃষ্টি হচ্ছে।
~ বাহ্। উপভোগ করুন।
~ সবাই চলে গেছে। আমি রেইনকোট বিহীন। ভাবছি আজ ভিজবো।
~ যখন আমার সাথে কথা বলা স্টপ করবেন, মানে একেবারেই চিরদিনের মতো, বলে কয়ে স্টপ করবেন। পাত্তা না দিয়ে হঠাৎ করে স্টপ করে দেবেন না। আর কারণটা জানাবেন কেন স্টপ করছেন।
~ হঠাৎ কী হলো?
~ যান ভিজেই বাড়ি যান। তবে সামলে। চোখে জল পড়লে সমস্যা হয় বাইক চালাতে।
~ কী ব্যাপার? বিশাল মুডে মনে হচ্ছে!
~ কেন?
~ না, এমনি মনে হলো।
~ ঠিক কথাই বললাম।
~ ধন্যবাদ!
~ যান ভিজুন, কাল তো ছুটি।
~ একটা কথা জিগাই?
~ এতো ফর্মালিটি করবেন না। রেগে যাবো। যা মনে আসবে তাই বলবেন।
~ ও।
~ কী জিজ্ঞেস করবেন?
~ বারবার কাতর-অকাতর প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন কেন?
~ কেন সমস্যা হয় তাতে? কাতরতা বাড়ে?
~ মোটেও তা নয়। তবে সে কথা বারবার আসা কি ঠিক?
~ ঠিক আছে। আর মনে করাবো না।
~ যাই এবার। ভেজার জন্যে তৈরি।
~ রাস্তা পিছল, সাবধানে বাইক চালাবেন কিন্তু।
~ ধন্যবাদ!
এগুলো ওদের সংলাপেরই কিছু অংশ। প্রতিনিয়ত এমন অনেকই কথা বলে ওরা। কথা বলতে বলতে উঠে আসে ওদের দুজনেরই সংসারের ভালোমন্দের কথা। কখনো শেলির কখনো বা শৌভিকের। স্বামী স্ত্রীর বন্ধনের মাঝে যখন চলে আসে,নুন তেল বা মাসকাবারির হিসাব। অথবা ছেলে বা মেয়ের পড়াশোনা বা টিউশন। তখনই হয়ত কাউকে শেয়ার করতে পারলে মনটা একটু হাল্কা হয় , এ যেন এক বাড়তি পাওনা। শৌভিক মানিয়ে নিলেও শেলির মাঝে মাঝেই মনে হয় ও হয়ত বেশি কথা বলে ছেলের দিকে মন দিতে পারছে না। বা শৌভিকের বন্ধুত্ব আদৌ কোন দিকে যাবে নিয়ে তাকে সেটাও চিন্তা করে। এর মাঝে শৌভিক ওকে দেখাও করতে বলেছে,কিন্তু ও কিছুতেই রাজী হয়নি। অথচ শৌভিকের মার্জিত কথা বার্তায় কখনো ওকে দুশ্চরিত্র ভাবতেও পারেনি। তবুও একটা ভয় থেকেই যায়।
এ যে কেমন টান বুঝতেই পারেনা শৌভিক, ওর প্রতি শেলি কেয়ারিং বুঝতে পারে ও। হয়ত এটাই মন ছুঁয়ে যায় ওর। যদিও শৌভিক জানে বেশি কেয়ারিং মেন্টালিটি হয়ত দূর্বলতার লক্ষণ।
কেন যেন শেলির ঝগড়ুটে স্বভাবটাই ওকে টানে। হয়ত রাগের মধ্যেই আছে অনুরাগের প্রকাশ। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে এটা কি পরকীয়া না নিছক বন্ধুত্ব। আবার নিজেই শান্তি পায় এই ভেবে কোন অপরাধ করছেনা।
শেলি শৌভিকের বন্ধুত্বের মাঝে হঠাৎই ফেসবুকের পোষ্ট থেকে জানতে পারে শেলি ওর মায়ের এক পুরনো শিক্ষিকাকে খুঁজছে। ঘটনাচক্রে ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা শৌভিকের চেনা। তাই ওনার সহযোগিতায় শেলিকে ফোননম্বর দিয়ে চেষ্টা করে দুই পুরোনো বান্ধবীকে মিলিয়ে দিতে।
অবাক হয়ে যায় শৌভিক পরবর্তী কোন ফিডব্যাক শেলির কাছ থেকে না পেয়ে। কোন যোগাযোগই করেনা ও । মেসেঞ্জারে রিপ্লাই করে দেখে, দিজ কনটেন্ট ইস নট এ্যভেলেবল। হোয়াটস আ্যপ ফেসবুক কোথাও পায়না আর খুঁজে ওকে। কদিন খুব খারাপ লাগে আসলে চ্যাটটা একটা অভ্যাস হয়ত বা সত্যিই পরস্ত্রীকাতর হয়ে গেছে শৌভিক কিছুটা। ওর গিন্নী মাঝে মাঝেই জিজ্ঞেস করতো শেলির কথা। তাই কোন যোগাযোগ হচ্ছেনা দেখে একটু মজা করে। সেকেন্ড পিরিয়ডের অফগুলো আজকাল অঙ্ক করেই কেটে যায়। মাঝে মাঝে অপেক্ষা করে আনব্লক বা কলের অপেক্ষায়।
ওদিকে শেলির হাবি আবার ফিরে এসেছে ঐ শহরে তাই টানাপোড়েনের মিষ্টি বন্ধুত্বটা মন থেকে মুছতে না পারলেও মুছতে বাধ্য হয় শেলি।
সবাই তো শৌভিকের মিসেসের মতো হয়না। তাছাড়া ওর মায়ের বান্ধবীর মারফত যদি শৌভিক যোগাযোগ করে। শৌভিক অনেকবারই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওর কাতরতার কথা বলেছে।
তাই খাঁচায় বন্দী ভীতু মনটাকে আর আকাশে উড়তে দিতে চায়না শেলি। ছেলেকে পড়ানো,বরের অফিস নিজের স্কুল এইসব করে আর সময় কোথায়? মনকে না উড়তে দেওয়াই ভালো। তাই মনের দক্ষিণের খোলা জানালাটাকে ব্লক করে দেয় শেলি।
অভ্যস্ত হয়ে যায় দুটো মানুষ তাদের একঘেঁয়ে জীবনে,যেখানে তাদের মুক্তি। শেলির মুক্তি রান্নাঘরে বাটার পনীর বা আলু পরোটায়। আর শৌভিকের মুক্তি জীবনের জটিল অঙ্কগুলোকে সরল করে।
শেলির নিজস্ব কিছু সমস্যা নিয়ে একদিন ডি আই অফিসে যেতে হয়। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে এই টেবল ওই টেবল ঘুরে কাজ করে খুব বিধ্বস্ত লাগে শেলির। ফাইলগুলো গুছিয়ে শান্তিনিকেতনের সাইডব্যাগটাতে ভরে,ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামে। হঠাৎই মুখোমুখি হয় একজনের," এক্সকিউজ মি ম্যাডাম,আপনি কি শেলি মিত্র?"
অবাক হয়ে যায় শেলি,তার ব্লক করে দেওয়া দক্ষিণের খোলা জানালাটা ভেঙে ঝাপটা দিয়ে ঢুকেছে এক ঝলক বসন্তের খোলা হাওয়া যা বলে যায়," তোমার খোলা হাওয়া,লাগিয়ে পালে।"
মুখোমুখি দেখা না হলেও চিনতে পারে শৌভিককে," আপনি এখানে?"
.....মজা করে শৌভিক," হ্যাঁ আমিই সেই কালো বেড়ালটা যে এখানে এসেও আপনার রাস্তা কাটলো। কোনদিন ভাবিইনি এভাবে দেখা হয়ে যাবে। আপনার শহরের অতিথি আমি,তবে একটু অতিথি আপ্যায়ন আমারও করতে ইচ্ছে করছে। এক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে আমার সাথে?"
....না করতে পারেনা শেলি,চায়ের দুটো কাপ বলে যায় অনেক না বলা কথা। দক্ষিণের ব্লক করা জানালাটা একটু ছোট ফাঁক করে খুলে দিয়েছে শেলি, আসলে খোলা হাওয়াটা ও নিজেও গায়ে মাখতে চায় কিন্তু ডোবার সাহস যে নেই তাই থাক জানলাটা হাল্কা খোলা।বন্ধুত্বের হাল্কা সুঘ্রাণে জীবনের একঘেঁয়ে জটিল অঙ্কগুলো সহজ লাগে শৌভিকের।
সমাপ্ত:-
Comments
Post a Comment