Skip to main content

ভরা থাক স্মৃতিসুধায়

#ভরা_থাক_স্মৃতিসুধায়#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#

ওহ্ তোর শাশুমা তো দারুণ! পুরো ছেলের বিয়েতে বরযাত্রী চলে এসেছে,ভাবা যায়না! কথাটা শুনে একটু ভ‍্যাবাচাকা লেগেছিলো বছর দশেক আগে বসুধার। উত্তরবঙ্গের মেয়ে বসুধা,ছোটো থেকেই একটু ঠান্ডা গোছের। মা বলতেন গোবেচারা। একটু চালাকচতুর না হলে সবাই তোকে বোকা বানাবে। সত‍্যিই এভাবে কতই  যে বোকা হয়েছে ভাইয়ের কাছে তার কোন ঠিক নেই। সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে ফেলতো যে কোন জিনিস। চোখ গোলগোল করে ভাবতো এমনটা হয় সত‍্যি! কখনো আকাশে কল্পনায় মেঘে হাতি দেখতো। কখনো বা রাতে ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতো।
              ইউনিভার্সিটির প্রেম ওদের, কি করে যে ডানপিটে স্পোর্টসম‍্যান ছেলেটা ওর প্রেমে পড়লো ও বুঝতেই পারেনি। যদিও এক ক্লাশ সিনিয়র তবুও নবীনবরণের দিনই বসুধার গলায় 'জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ' শুনে বড়ো মিঠে লেগেছিলো বরুণের কি যে অপূর্ব গেয়েছিলো! অন‍্যদের সাথে গলা মিলিয়েছিলো হয়ে যাক আরেকটা,বসুধা ধরেছিলো,' কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি।' মনে মনে ভেসে গিয়েছিলো পুলকে এক যুবক মনে হয়েছিলো স্বয়ং কৃষ্ণকলিই বোধহয়  কবির গানের মাধুর্যে মুগ্ধ করেছে সবাইকে। পরপর বসুধার তিনটে গান ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো বরুণকে কোন বসন্তের রঙিন উৎসবে। অদ্ভুত মায়াবী চোখদুটো মেয়েটার, কিন্তু এতো কথা কম বলে কেনো? আলাপ করাই যাচ্ছেনা তেমন ভাবে। ওদের হস্টেলের পাশের রুমে থাকা সোমাদিই প্রথম বলেছিলো, "বরুণটাকে কি করলিরে বসুধা? সবসময় করিডোরে ঘোরাঘুরি করে। আজকাল রাত জেগে তোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে প্র‍্যাকটিসেও নাকি যেতে পারছেনা। একটু দেখ তাকিয়ে মা আর মুখ ফিরিয়ে থাকিসনে।"
   লজ্জায় মুখ লুকিয়ে চলে গিয়েছিলো বসুধা। ঘরে গিয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিলো ভালো লাগার। শাল সেগুনের মনকেমন করা প্রকৃতিতে এভাবেই কখন যে প্রেমটা হয়ে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি। বরুণ অনর্গল কথা বলতো আর বসুধা শুনতো। শুধু মাঝে মাঝে রবিঠাকুরের গান শোনাতো কখনো আমার পরাণ যাহা চায় গলা মেলাতো বরুণও আবার কখনো আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ।.."নাহ্ এটা তুই গা আমার হবেনা,আমি শুনি। অদ্ভুত মাদকতা তোর গলায় সুধা,ওহ্ এই গানটাই যে আমায় একদম বোল্ড আউট করে দিলো।" কোকড়াচুলের ঝাপটায় কখনো ঢাকতো বরুণের মুখও, আদর করে বলতো,'কেশবতী কন‍্যা।' বসুধার একবছর আগেই চলে গিয়েছিলো পাশ করে বরুণ।" আমায় ভুলে যাবেনা তো?"..." না না আর দুটো বছর অপেক্ষা কর এক্বেবারে বরযাত্রী নিয়ে আসবো।"... " তোমার মা মেনে নেবে তো?"
    "ওহ আমার বেষ্টফ্রেন্ড, একটু জেলাসি করবে হয়ত। আমি ম‍্যানেজ করে নেবো। আসলে বাবা চলে যাবার পর আমিই তো জগৎ মায়ের।ভালো থাকার অক্সিজেন। তুই তো দেখিসনি মাকে, কি যে ভালো মানুষ বুকভরা দুঃখকে মেনে নিয়ে যে মানুষ!কিভাবে যে ভালো থাকতে পারে কষ্ট নিয়েও, মাকে না দেখলে বুঝতেই পারবিনা।"
          সত‍্যিই আশ্চর্য ভদ্রমহিলা,বসুধাকে একবার দেখতেও এলেননা। স্পোর্টসের জন‍্য খুব ভালো চাকরি হয়ে গিয়েছিলো বরুণের নেভিতে তাছাড়া রেজাল্টও খুব ভালো ছিলো। বসুধা পাশ করে যাবার পর আর বেশি দেরী করেনি বরুণ। বিয়েটা সেরে নিতে চেয়েছিলো তাড়াতাড়ি। আর বিয়ের বরযাত্রীতে খুব আনন্দ করে এসেছিলেন ওর শাশুড়িমা। ওদের তল্লাটে বেশ সাড়া পরে গিয়েছিলো সবাই বলাবলি করেছিলো কলকাতার মানুষেরা অত নিয়ম মানেনা তাই মা চলে এসেছে ছেলের বিয়েতে। তবে বিয়েটা দুই মায়ের কেউ দেখেনি। ঐসময়টা দুই বেয়ান গল্প করেই কাটিয়েছেন। ওর মা মুগ্ধ হয়েছিলেন, বলেছিলেন "সত‍্যি ভাগ‍্য করে শাশুড়ি পেলি মা। তোকে আর ঠকতে হবেনা,আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম আমার এই গোবেচারা মেয়েটাকে নিয়ে।"
           সুখের সংসার হয়েছিলো বসুধার,না না একদম জেলাসি করেননি বরুণের মা। তবে বসুধার যেন মনে হয় খুব যেন হাল্কা মেজাজের শাশুড়িমা ,আরো একটু বেশি শাশুড়িমা মেজারের হলেই ভালো হোত। শুধু বরুণ বলতো," আমার বেষ্টফ্রন্ড ভালো তো?তোমার কেমন লাগছে?"সত‍্যিই তো ওনার সম্বন্ধে কোন অভিযোগই চলেনা। হয়ত এতোটা ফ্রীভাবে বসুধাই মিশতে পারতোনা।
মাঝে মাঝে ওনার ছেলেমানুষী দেখে হাসিই পেতো। কখনো চুরমুর খাচ্ছেন কখনো বা ফুচকা। বরুণ এলেই শিশি ভর্তি খাবার দাবার এনে রাখতো,কখনো বা বাইরে থেকে আনতো নানা খাবার দাবার। এর মাঝেই সংসারে এসেছে আরেকজন নতুন সদস‍্য। নাতনিকে নিয়ে মজার সংসার ছিলো ঠাকুমার। মনটা ভালো হয়ে যেতো বসুধার আর বরুণের যাক তবুও অনেক না পাওয়া নিয়ে ভালো থাক মানুষটা কিছু পেয়ে।
                 তবুও কেনো যে ভালো সময়টা বেশিক্ষণ থাকেনা মানুষের জীবনে কে জানে? হঠাৎই খবর এলো বরুণ আর নেই,অনেকের সাথে ও চলে গেছে আ্যক্সিডেন্টে। এর থেকে বোধহয় আকাশটা মাথায় ভেঙে পড়লেও ভালো হোত বেশি। বসুধার মনে হয়েছিলো, কি মনে হয়েছিলো তা অনেকদিন মনেই করতে পারেনি। কি করেছিলো তাও মনে পড়েনা ভালো করে। সামলেছিলেন শাশুড়িমা বলেছিলেন," স্বর্গে বোধহয় আবার ভালোমানুষের অভাব পড়েছে। কিন্তু আমার কোলটাই খালি হোলো। আমাকেও তো নিতে পারতো ডেকে। আমি কি সত‍্যিই অকম্মা কারো কোনো কাজে লাগিনা! আছে ও আমাদের মাঝেই কোথাও আছে।"
       হঠাৎই বসুধার ঘোরের মাঝে শুনতে পায় একটা গান। স্তব্ধ হয়ে হঠাৎই উঠে যায় শাশুড়িমায়ের ঘরের দিকে। পুরোনো টেপরেকর্ডারটা চালিয়ে শুনছেন," যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।"...কার গাওয়া গান? অদ্ভুত সুন্দর! দুচোখ বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পরে বসুধার। আত্মমগ্ন হয়ে রয়েছেন মা,খেয়ালই করেননি বসুধাকে। গান শেষ হওয়ার পর চোখ খুলেই বসুধাকে বলেন," তোমার শ্বশুরমশাইয়ের গাওয়া। অদ্ভুত সুন্দর গাইতেন। বরুণের গলাতেও সুর ছিলো কিন্তু আমি আর শিখতে দিইনি। ভেবেছিলাম যদি অসময়ে ডাক পড়ে স্বর্গে,গাইবার জন‍্য। কিন্তু সেই তো চলেই গেলো।"
               ভেঙে পড়া বসুধাকে সামলেছিলেন একটু একটু করে রবিঠাকুরের হাত ধরে। "তোকে তো বাঁচতে হবে সুধা। দিদিভাইকে কে দেখবে শুনি? আমি এবার আর কোনদিকে তাকাবোনা,অনেকদিন আছি সংসার বুকে নিয়ে। সবাই স্বার্থপর যে যার মতো চলে গেলো মজা করে।"
             হাতটা চেপে ধরে বসুধা খোঁজে একটু অবলম্বন। কখন যে গানটা বেজে ওঠে বুঝতেই পারেনি," আছে দুঃখ,আছে মৃত‍্যু বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি,তবু আনন্দ,তবু অনন্ত জাগে।"
   মা চালিয়েছিলেন হয়ত ওরই অজান্তে। গান শেষ হওয়ার পর দুজনেরই চোখে জলের ধারা। নীরবতা ভাঙেন মা," আসলে আমাদের শোক,দুঃখ,আনন্দ আর ভালোবাসায় আছেন কবিগুরু পরম অবলম্বন হয়ে। তোদের বাবা চলে যাবার পর এই গান গুলোর জন‍্যই যে কখন উঠে দাঁড়িয়েছি বুঝতেই পারিনি। অথচ একসময় রবীন্দ্রসঙ্গীত ভালো লাগতো বলেই শুনতাম,এভাবে অর্থ উপলব্ধি করাই হয়নি কোনদিন। সেইজন‍্যই তো বাবু তোর গান শুনেই ভালোবেসে ফেলেছিলো। দুষ্টুটা সব কথা আমায় বলতো,না বললে শান্তিই পেতোনা। গানই তোকে বাঁচিয়ে রাখবে,গান যে তোকে গাইতেই হবে। নিজেকে সঁপে দে পরম নির্ভরতায় কবিগুরুর গানে।"
         কোথা থেকে এতো শক্তি পেয়েছেন মা,আশ্চর্য হয় বসুধা সত‍্যিই হয়ত সঙ্গীতেই খুঁজে পেয়েছেন জীবনের উপলব্ধি। বসুধাকেও যে বাঁচতে হবে,ভালো থাকতে হবে ওদের সন্তানের জন‍্য। শোক আর বিরহের মধ‍্যেও তাই মনে এলো," ভরা থাক স্মৃতিসুধায়,হৃদয়ের পাত্রখানি।"
                 বসুধার গানের স্কুলের উদ্বোধন আজ, আলমারি খুলে ঘিয়ে লাল,সবুজ,হলুদ দেওয়া যত্নে রাখা ঢাকাইটা হাতে তুলে দিয়ে মা বলেন," অন‍্য সব রঙের মতো লালও একটা রঙ। তোমায় ভালো থাকতে দেখলে দিদিভাই খুশি হবে। জীবনে আনন্দ,দুঃখের সাথে সাথে থাক সঙ্গীত আর রামধনুর সাতরঙের মেলবন্ধনও।"
              দক্ষিণের জানালা খোলা,টেবিলে বাবুর ছবিখানা রাখা ওর বাবার পাশেই। বসুধার গান ভেসে আসছে,' আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তাই সকল খানে।।'
     সমাপ্ত:-

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।