#বৌ_সাজার_স্বপ্ন#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#
আমি মণিমালা,মা ডাকতো আদর করে মিনি।ছোটবেলা থেকেই আমার ছিলো খুব বৌ সাজার শখ। তাই মাঝে মাঝেই বায়না ধরতাম মা আমাকে বৌ সাজিয়ে দাওনা গো। এই যে আমি ছোট শাড়িটা এনেছি। মা তখন হয়ত কুটনো কাটছে এদিকে ঠাকুমা তাড়া দিচ্ছে," ও বৌমা আর কতক্ষণ লাগাবে,এবার চট করে আলুটা ছেড়ে দাও ওটা ভাজা ভাজা হতে তোমার বাঁধাকপিটা কাটা হয়ে যাবে। মাছের মাথাটা ভালো করে ভেজো কিন্তু।" আমাদের লম্বা চকমেলানো বাড়ির উঠোন দিয়ে ছুটে এসে আমি বলতাম আবারও মা দাওনা বৌ সাজিয়ে,আজ যে আমার মেয়ের বিয়ে। মা বিরক্ত হয়ে তাকাতো কখনো ধমকে বলতো," মিনি যা পড়তে বোস,সারাক্ষণ যত বাজে খেলা। এইটুকু বয়েস থেকেই মাথায় ঢুকেছে বৌ সাজার চিন্তা। যাও বই নিয়ে এখানে আসন পেতে বোসো।"
ধমকে উঠতেন ঠাকুমা,"একি বৌমা এইটুকু মেয়েকে বকছো কেন? মেয়েমানুষ বৌ সাজবেনা তো আর কি করবে। ওটাই তো মেয়েদের পরম ধর্ম মানে ঘর সংসার করা।''..ঠাকুমার বকা খেয়ে মায়ের অসহায় মুখটা দেখে আর কিছু বলতে সাহস পেতামনা। ঠাকুমাই তখন কাছে ডেকে শাড়ি জড়িয়ে মাথায় ঘোমটা তুলে বলতেন,"এই তো বৌ সেজে কি সোন্দর লাগছে। এরপর আসবে লাল টুকটুকে বর একদম ঘোড়ায় চেপে।''
তখনকার মত শান্ত হয়ে খেলতে গেলেও মায়ের কাছে পরে জুটতো বকুনি," কে তোর মাথায় ঢুকিয়েছে রে এই বৌ বৌ খেলা। আগে পড়াশোনা করে গাড়ি চেপে চাকরি করবি তারপরে বিয়ে।"..আমি যখন বলতাম মা তুমি চাকরি করোনা কেন? .." ও তুমি বুঝবেনা,আমার হয়নি তাই তো তোমাকে আমার মনের মত মানুষ করবো। হারিয়ে যাসনা মিনি।"..আমি মায়ের গলা জড়িয়ে আদর খেতাম। মা আমাকে সকাল সকাল খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো। আমাদের ব্যাবসা ছিলো,বাবা ফিরতো অনেক রাতে। বেশিরভাগই বাবা রাতে সুস্থ অবস্থায় ফিরতোনা। একেকদিন মায়ের কান্নার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যেত। " তুমি কি কোনদিন বুঝবেনা,নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেনা। মিনিটা বড় হচ্ছে।"..বাবা ধমকে বলতো," চুপ করো অপর্ণা,পুরুষমানুষের একটু নেশা আর স্বভাবের দোষ না থাকলে ঠিক মানায়না। না পোষালে অন্য কোথাও চলে যাও।"
সত্যিই আমাদের ঐ বড় উঠোনওয়ালা বাড়িটা যেখানে অনেক বড় একটা সংসারে মা দিনরাত রান্না করত আর আমি বৌ বৌ খেলতাম সেখানে থাকা হলোনা। অত্যাচারে বাবার শরীর ভেঙে গিয়েছিলো শুরু হলো বুকে ব্যাথা,নষ্ট হলো লিভার, কষ্ট পেয়ে পেয়ে বাবা চলে গেলো। আর তারপরেই শুরু হলো আমাদের কষ্টের জীবন,তখন বুঝতামনা পরে শুনেছিলাম আমার বাবার ভাগের যা ছিলো সবটাই নাকি বাবা জেঠুকে লিখে দিয়েছে টাকার বিনিময়ে তাই ঐ সম্পত্তিতে আর আমাদের কোন অধিকার নেই। জেঠিমা বললো," তার ওপর ঠাকুরপোর আবার মেয়ে, বংশধর নেই। ও কি করে ধরবে ব্যাবসার হাল। ছেলে হলে তবুও দোকানে কাজ করতে পারত।"...মায়ের কি সুন্দর সব গয়না ছিলো,একদিন বিয়েবাড়ি থেকে আসার পর আমি বায়না করাতে মা পরিয়ে দিয়েছিলো কিছুই ঠাকুমা আর জেঠিমা দিলোনা। সবই নাকি চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে।
আমরা এসে উঠলাম আমার মামাবাড়িতে,তিন মামা সবাই আলাদা। মামীরা আর মামারা ভাবলো কি এক আপদ এসে জুটলো ঘাড়ে। শুধু ছোটমামাই এগিয়ে এসে বললো," অপু আয় আয়,মনিমালা আয়তো এই ঘরে। আরে আমি তো একাই থাকি। বাউন্ডুলে বলে তো আর বিয়েই করিনি। তেমন ভালো করে রাখতে পারবোনা তোদের,তবে তাড়িয়েও দিতে পারবোনা।"...মা কেঁদে ফেললো ঝরঝর করে আর আমি মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে।" কাঁদছিস কেন? আরে আমারো লাভ আছে অপু,অন্তত দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটে যাবে।"
আমরা আশ্রয় পেয়ে গেলাম মামুর ঘরে। চকমেলানো বড়বাড়ির উঠোন আর আমার ভাইবোনেরা পরে রইলো পেছনে। এখানে আমার সাথে বিশেষ কেউ কথা বলেনা। আমি আর শাড়ি পরে পুতুল খেলিনা। সবসময় মনে হয় মায়ের ফ্যাকাশে মুখটা তাই মনে চলে একটাই শব্দের আনাগোনা আমাকে বড় হতেই হবে,অনেক বড়। আমাদের যে ওরা ও বাড়ি থেকে ভিখিরির মত তাড়িয়ে দিয়েছে। মায়ের গয়নাগুলোও দেয়নি আমাদের।
মামু আর মা দুজনেই সময় পেলেই আমাকে পড়াতো। পড়াশোনাতে আমি মোটামুটি ভালোই ছিলাম,রেজাল্ট এনে মাকে দেখালেই দেখতাম মায়ের মুখে খেলে যাওয়া রোদের ঝিলিক," মিনি,এই নে মামু তোর জন্য মিষ্টি কিনে রেখে গেছে।"...আমি পড়তাম রাত জেগে,মাও বসে বসে এটা ওটা করতো। কখনো সেলাই কখনো বই পড়া আবার কখনো খাতায় কিসব লিখতো। আমার পুরোনো খাতার পৃষ্ঠাগুলো দিয়ে সেলাই করা মায়ের খাতা। মা তুমি কি লিখছো গো খাতায়?"ও কিছুনা,ঐ বসে আঁকিবুকি কাটি,সময় কাটাই। তুই ভালো করে পড় মা। আমরা যে তোর মুখের দিকেই তাকিয়ে।"...আমার জামাকাপড় মা সেলাই করে দিত,বন্ধুদের মত অত ভালো জামাকাপড় আমার ছিলোনা। কিন্তু স্কুলের সরস্বতীপুজো বা ফাংশানে সবাই জিজ্ঞেস করতো," এই ব্লাউজটা কোথা থেকে কিনেছিস,এই হারটা? আর এই স্কার্টটা?"..আমি হেসে বলতাম মা বানিয়ে দিয়েছে। "এত সুন্দর কাপড় কোথায় পায় কাকিমা রে?"..ওদের সবটা বলতে পারতামনা যে আমরা একসময় বড়লোক ছিলাম মায়ের অনেক শাড়ি ছিলো,যেগুলো মা আর এখন পরতে পারেনা ওগুলো কেটে করে দেয়। আবার কখনো টুকরো কাপড় কিনে আনে সস্তায়। শুধু বলতাম মায়ের পুরোনো শাড়ি কেটে করে রে। মাকে এসে যখন বাড়িতে বলতাম মা হাসতো," ও বাড়িতে কত কাজ ছিলো এত লোকের রান্না,এখানে সারাদিন তো তেমন কাজ নেই।
মামুই একদিন বললো, "অপু তুই প্রাইভেটে মণিমালার সাথে বি.এ পরীক্ষাটা দে না। একটু পড়াশোনা কর ঠিক হয়ে যাবে। আর বাকিটা শিখে নিবি মেয়ের কাছ থেকে। আমাদের জন্য তোর পড়াটা হয়নি। বাবা সাত তাড়াতাড়ি তোর বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন।"
অদ্ভুতভাবে মা আবার পড়তে শুরু করলো,আশ্চর্য লাগতো মাকে দেখে এত পজেটিভ কি করে মা! মাঝে মাঝে আমি মাকে একটু সাহায্য করে দিতাম। মা সারাদিনে কোন সময় নষ্ট করতোনা। তখন মোবাইল ছিলোনা,টিভিও ছিলোনা মামুর ঘরে। তাই মা হাতের কাজ আর পড়াশোনা রান্না এই করেই কাটাতো। আর রাত জেগে পড়াশোনা করা বা খাতায় আঁকিবুকি কাটা। মা খাতাটা আড়াল করেই রাখতো আমিও কোনদিন কৌতূহল দেখাইনি। থাকনা কিছু একান্ত নিজের মায়ের জীবনেও।
এক সাথেই আমি আর মা পাশ করলাম। বড় উজ্জ্বল লাগছিলো সেদিন মামুর মুখটা। " এবার তোরা কিছু কর অপু,আমার তো একটু একটু করে বয়েস বাড়ছে। শরীরটাও মাঝে মাঝে খারাপ লাগে।" মনটা খারাপ হয়ে গেলো,মা গিয়ে বসলো মামুর পাশে। আমি ততদিনে কয়েকটা টিউশন করি। নিজের খরচটা চলে যায়। মাঝে মাঝে পুরোনো বাড়ি আর আমাদের দোকানটা দূর থেকে দেখে আসি মনে হয় আমাদের দুর্ভাগ্যের কথা। কানে বাজে একটা কথা,ও তো মেয়ে ছেলে হলে ব্যাবসার কাজে লাগতো।
একদিন মামুই বলে," অপু তোর সেলাইয়ের পোটলাটা খোল তো। দেখি তোর ঝুলিতে কি কি আছে। মা খুলে বসে ব্যাগটা,আমিও আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মা এইসব কি করেছে,কতরকমের সেলাই। অনেকগুলো এখনো হয়নি শেষ। মায়ের এত রকমের আইডিয়া! শুনলাম এবার পুজোতে মাকে একটা স্টল করে দেবে মামাদের পাড়ার মাঠে,সাথে থাকবে মায়ের তৈরি করা কিছু খাবারও। আমি আর মা লেগে পড়লাম দুজনে মিলে বানিয়ে ফেললাম বেশ কিছু নতুন নতুন কাপড়ের গয়না,ব্লাউজ,ওড়না,মেখলা এইসব। মা দেখছিলো খাবারের দিকটা। আর আমি গয়না ব্লাউজ ওড়না এগুলো। হঠাৎই এক ভদ্রমহিলা আসেন কি সুন্দর দেখতে ওনাকে। অনেক কেনাকাটা করেন আর যা কিছুই কেনেন শুধু বলেন," এই হারটা তোমার গলায় একবার দাও তো দেখি কেমন লাগে। এই ওড়নাটা একবার দেখি তো গায়ে ফেলো তোমার। কাল পারলে আরো কিছু এনো,এত সুন্দর জিনিস আমি দেখিনি।"
পরেরদিন মহিলা এসে আরো অনেককিছু কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। খুব প্রশংসা করে গিয়েছিলেন আমার আর মায়ের। মাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন," এমন সবার ট্যালেন্ট থাকেনা,আপনারা এটা নষ্ট করবেননা। একটু বেশি করে চেষ্টা করুন বানানোর। এমন জিনিস সত্যিই দেখা যায়না।"
মাঝে আমাদের খুব খারাপ সময় গেলো,মামা তখন খুব অসুস্থ। আমার খুব একটা চাকরির দরকার। মাও চেষ্টা করছে কিছু করার। হঠাৎই মা একটা পেপার কাটিং নিয়ে আসে,গয়নার ডিজাইন দেওয়ার কম্পিটিশন। আমি অবাক হয়ে বলি,আমি কি করবো এটা দেখে। মা বলে," ওরা হারের ডিজাইন দিতে বলেছে তিনটে তুই দিয়ে দে আমি এঁকে দেবো। অবাক হয়ে যাই আমি,মা নিয়ে আসে মায়ের খাতাটা। আশ্চর্য হয়ে যাই,পাতায় পাতায় কত গয়নার ডিজাইন। তাহলে মা রাত জেগে এইসব করত। মা তুমি! "হ্যাঁ রে আমি মায়ের কাছ থেকে শিখেছিলাম,আমার মামাদের বড় দোকান ছিলো তবে মা বাবাকে ভালোবেসে চলে এসেছিলো তাই দাদু আর সম্পর্ক রাখেনি। আমি স্বপ্ন দেখিরে যদি একদিন আবার তুই"...মায়ের চোখটা ছলছল করে ওঠে।
যথারীতি আমি অংশগ্ৰহণ করি ঐ প্রতিযোগিতায়। মাঝে বেশ অনেকদিন কেটে গেছে। হঠাৎই আমার নামে একটা চিঠি আসে। আমার ডিজাইন প্রথম পুরস্কার পেয়েছে তাই যেতে হবে। পুরস্কার নিতে গিয়ে একটু আশ্চর্য হলাম,একি ওনাকে যেন কোথায় দেখেছি। হ্যাঁ উনিই তো আমাদের কাছ থেকে মেলায় অনেক জিনিস কিনেছিলেন। আমায় দেখে একচিলতে খুশি ছড়িয়ে পড়লো ওনার মুখে।
আমাদের একটা কাজ হয়ে গেলো,মা করতো নেশার মত কাজটা। একটু একটু করে আমিও শুরু করলাম। ওনাদের দোকানের গয়নার ডিজাইনগুলো আমরা করতে শুরু করলাম। তার পাশাপাশি মায়ের একটা ছোট বুটিকও আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধবকে দিয়েই শুরু হলো সবটা। আমার মা,কম বয়সে বিধবা হয়েও মেরে ফেলেনি স্বপ্নগুলো,ছোট্ট ঘুপচি ঘরের মধ্যেও বসে মা স্বপ্ন দেখতো নিজের মত করে। ভাবত কোন দিন তা সফল হবে। একদিন মায়ের খাতার শেষ পৃষ্ঠায় খুব সুন্দর কতগুলো ডিজাইন দেখলাম,জিজ্ঞেস করলাম এগুলো কবে এঁকেছে মা? একটু চোখটা ছলছল করে মায়ের ওগুলো আমার গয়নার ডিজাইনগুলো,মা দিয়েছিলো বিয়ের সময়,মাকে দিয়েছিলো দিদা। সবই শেষ হয়ে গেছে একটা ছাড়া। মাকে দেখে বৌ সাজার ইচ্ছে আমার আর নেই তাই দেখতে ইচ্ছে করলোনা একটা গয়না কোনটা।
যখনই গয়নার ডিজাইন দিতে যেতাম ভদ্রমহিলা আমায় ডেকে অনেক গল্প করতেন,স্বপ্ন দেখাতেন,উৎসাহ দিতেন। অদ্ভুতভাবে উনিও স্বামীহারা,একা সামলান সবটা। " শোনো মণিমালা,আমার অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর ডিজাইন চাই,এখনো সময় আছে তুমি আস্তে আস্তে কোরো মাকে বোলো।" আমি জানতে চাইলাম কেন এগুলো ভালো হয়নি?
.." হয়েছে খুব ভালো হয়েছে,তবে ঐগুলো যেন একদম এক্সক্লুসিভ হয় আমার ছেলের বৌয়ের জন্য তো হবে ওগুলো।"..আমি আর মা লেগে গেলাম ডিজাইনের কাজে,মাকে বললাম মা যদি মায়ের গয়নার ডিজাইনগুলো দেয়। " ওগুলো দেবো মিনি? আমি ভেবেছিলাম তোকে বানিয়ে দেবো ঐ ডিজাইনগুলো।" আমি বিয়ে করবোনা মা, কি হবে বিয়ে করে,তোমাকেই বা দেখবে কে?"আমার জন্য তুই! মনে পড়ে তোর ছোটবেলার কথা?" আমিও হাসি শুনে।
খুব পছন্দ হলো ওনার ডিজাইনগুলো," এগুলো,পেলে কোথায়? ওহ্ সত্যি তোমার মায়ের কোন তুলনা হয়না। অথচ এই মানুষগুলোর স্বপ্ন কেমন ভেঙে মুচড়ে দেয় মানুষ। আমার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,স্বপ্ন দেখার আনন্দে।
বৌভাতের দিন আমাদের নেমন্তন্ন ছিলো,যেতে পারিনি আমরা মামুর শরীরটা আবার খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। গিয়েছিলাম কিছুদিন বাদে মায়ের বানানো একটা খাদির সাথে বেনারসীর টুকরো জুড়ে করা মেখলা আর কড়ি পুঁতি দিয়ে বানানো গলাবন্ধ হার নিয়ে। কিন্তু ওনার সাথে দেখা হলোনা, শুনলাম উনি কিছুদিন অফিসে আসছেননা। আমাকে একবার আমার বাড়িতে ডেকেছেন উনি,আমাদের ফোন না থাকায় যোগাযোগ করতে পারেননি।
জানিনা অপ্রত্যাশিত কিছু বোধহয় এইভাবেই ঘটে। এমনও হয়! সেদিন ওনার ছেলের বিয়েটা হয়নি,বড়সড় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিলো বরের গাড়িটার,এখনো ওনার ছেলে আর দুইবন্ধু হসপিটালে। মেয়ের বাড়ি থেকে এমন ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চায়নি। সেদিনই ওরা বিয়ে দিয়ে দেয় মেয়ের ওর দাদার বন্ধুর সাথে। অদ্ভুতভাবে আমি একটা চাকরি পেয়ে গেলাম উনাদের শোরুমে,বেশ দায়িত্বের কাজ। হিসেবপত্র যেগুলো উনি দেখতেন ওনার ব্যস্ততার জন্য দেখতাম আমি। মায়ের স্বপ্ন একটু সত্যি হলো,আমি এখন যাই সত্যিই গাড়ি করে অফিসে উনিই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবুও মা বলে," মিনি,তুই নিজে কিছু কর।"
হঠাৎই একদিন আমাকে অফিসের কাজে উনিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমাকে বসতে বলে উনি একটু ভেতরে গিয়েছিলেন। ভেতর থেকে আসার সময় সাথে একজন এসেছিলো বুঝতে পেরেছিলাম ওনার ছেলে ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটছে,আ্যক্সিডেন্টে একটা পায়ের শক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। আমার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। এরপর মাঝে মাঝেই গেছি ওনাদের বাড়িতে। একটা সময় মনে হত ওরা মা আর ছেলে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এদিকে বাড়ি যেতে দেরি হলে মা চিন্তা করত। অবশ্য ততদিনে আমাদের ঘরে ল্যান্ডফোন এসেছে। তার কয়েক মাস পর ম্যাডাম আসছেন অফিসে,আমি খুব কমই যাই ওনাদের বাড়িতে।
হঠাৎই একদিন মাকে দেখলামনা বাড়ি ফিরে,মামু ঠিক বলতে পারলোনা। মা ফিরলো বেশ অনেকটা রাতে,একটা গাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলো মাকে। মাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে জিজ্ঞেস করলাম আর একটু রাগও করলাম কেন এত দেরি হলো। মা বললো," মিনি বড় হচ্ছিস,এবার তো তোর একটা বর দেখতেই হয়। তাই গেছিলাম বর দেখতে। সবই মোটামুটি ভালো তবে না না অমন ছেলে তার ওপর ওদের আবার যৌতুক চাই তাই কিছু বলিনি। ওরা সামনের সপ্তাহে তোকে দেখতে আসবেন,দেখ তোর যদি ভালো লাগে।" খুব রাগ করলাম মায়ের ওপর,আমি তো বলেছি আমি বিয়ে করবোনা, তোমায় ছেড়ে কোথাও যাবোনা। হ্যাঁ আমিও তাই বলছিলাম মেয়ের বিয়ে দেবোনা,কিন্তু ওরা এত করে বলছে দেখ আলাপ করে। খুব রাগ হলো আবারও মায়ের ওপর,কিছুই তো বলছেনা।
পরের রবিবার মা আমাকে সাজাতে বসলো,আমি যেমন তেমন একখানা শাড়ি পরছিলাম,মা শুনলোনা। মায়ের নিজের হাতে করা শাড়ি,আর হাতে কুচি দেওয়া ব্লাউজ জোর করে পরালো। গলায় পরিয়ে দিলো একটা অপূর্ব সুন্দর হার,আগে কখনো দেখিনি। বললো এই একটা গয়নাই মা বাঁচিয়ে রেখেছিলো ওটা মায়ের দিদার হার।
একটা বড় গাড়ির আওয়াজ শোনা গেলো,এ কি! গাড়ি থেকে ম্যাডাম আর ওনার ছেলে নামছেন। আমি এবার সত্যিই লজ্জা পেলাম।
হঠাৎ ওরা আমাদের বাড়িতে কেন! মা বললেন উনি ওনার দুর্ভাগ্যের সব কথাই মাকে বলেছেন। সেই মেলা থেকেই ওনার আমাকে পছন্দ,কিন্তু তখন ছেলের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সবটাই বোধহয় ভগবান ঠিক করে রাখেন। আমি কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। " তোমার আপত্তি নেই তো মণিমালা, আমাদের দায়িত্ব নেবে তো?"..আমি কিছু বলার আগে মা বলে ওঠে," ও কি বলবে জানিনা। তবে আমার আপত্তি আছে। আমি মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে পারবোনা। অবাক হয়ে যাই আমি উনি যৌতুক চাইছেন! তখনি আমি বেড়িয়ে এলাম ঘর থেকে ভীষণ রাগ হলো। নাহ্ চাকরিটা আমি ছেড়ে দেবো,কালই গিয়ে চিঠি দেবো।
হঠাৎই হাসির আওয়াজ পাই," মণিমালাকে ডেকে দিন,দেখুন ও রাজি আছে কিনা। খুব রাগ হয়েছে মনে হলো।" উনি যৌতুক হিসেবে আমার মা আর মামুকে আমার বিয়ের পর উনাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে চান। "মণিমালা,আসলে আমার জহুরীর চোখ তাই জহর চিনতে ভুল করিনি।"..আমার আর আপত্তি করা হলোনা,একরাশ মুগ্ধতা দেখলাম আমার হবু স্বামীর চোখে। হয়ত নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন কোন। আমার মায়ের ডিজাইন করা গয়নাগুলো পরেই আমার বিয়ে হয়ে গেলো। আত্মীয়স্বজন অনেকেই বললো শেষে খোঁড়া বর জুটলো। ওনার হাতটা হাতে নিয়ে শপথ করলাম শুধু ছেলেরাই কেন,দায়িত্ব নিতে পারি আমরাও যদি পাশে থাকে দুই মায়ের আশীর্বাদের হাত। মা বুকে টেনে বলে," সুখে,থাকিস আর সুখে রাখিস মিনি। নিজের ভালো লাগাগুলোকে ভালোবেসে ভালো থাকিস,ভালোলাগাকে বাঁচিয়ে রাখিস। কই দেখি তো লাল বেনারসি আর গয়না পরে কি সুন্দর লাগছে আমার মিনিকে। একদম ছোট্ট বেলার মত মিষ্টি বৌ।"
সমাপ্ত:-
Comments
Post a Comment