Skip to main content

কাঙ্খিত স্বীকৃতি

#সেরা_স্বীকৃতি#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#

আমার বাবা মায়ের আমি একমাত্র মেয়ে,ছোট থেকেই শুনেছি আত্মীয়স্বজনরা বলতো বাবার বংশধর নেই। বুঝতাম বাবারও ছিলো একটা চাপা কষ্ট তাই নাতি হওয়াতে খুব খুশি হয়েছিলেন বাবা। ছেলে হতে পারিনি,তবু চেষ্টা করেছি বাবামায়ের পাশে দাঁড়াতে। বাবা আমায় চলে যাওয়ার আগে সেরা স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন," তুমি আমার কন‍্যারত্ন,আমার পারলৌকিক কাজ তুমিই করবে।"..চোখের জল মুছে বাবার দেওয়া স্বীকৃতি মাথায় করে বাবার শেষ কাজ করলাম। মায়ের চলে যাবার আগের দিনগুলোতে মুখে হাসি নিয়ে বলতাম,আমি আছি মা,তোমার চিন্তা কি।..মা বলতো,"তোর বাবা তাই তো তোকে কন‍্যারত্ন বলে গেছে।"জীবনের সেরা স্বীকৃতি কখনো সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এনে দেয়।

#শত_শব্দের_গল্প#
#সেরা_স্বীকৃতির_আনন্দ#
রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে শ্রুতি মুখোপাধ‍্যায় বাবার অমতে মাইকেলকে বিয়ে করে হয়েছিলো শ্রুতি জোনস্। বাবা বলেছিলেন,"ওর শরীরে আমার রক্ত নেই।",ত‍্যাজ‍্য করেছিলেন। মা লুকিয়ে মাঝে মাঝে ফোন করতেন। সবচেয়ে কষ্ট হত যখন দেখতো ওর ছেলের দাদুবাড়ি বলে কিছু নেই। হঠাৎই,মায়ের ফোন পায়," মণি তোর বাবাকে রক্ত না দিলে বাঁচানো যাবেনা,তুই একবার দেখনা পাচ্ছিনা কোথাও।".." কিন্তু মা আমি!"..পাশ থেকে ছেলে জানতে চায় ব্লাডগ্ৰুপটা। নাতির দেওয়া রক্তে সে যাত্রা বেঁচে যায় দাদু। নাতিকে কাছে টেনে বলেন," একই রক্ত বইছে তো আমাদের শরীরে,তাইনা দাদুভাই?"..শ্রুতির চোখটা ছলছল করে বহু আকাঙ্খিত স্বীকৃতি পাবার আনন্দে।

#কাঙ্খিত_স্বীকৃতি#
#রুমাশ্রী_সাহা_চৌধুরী#

"রানী''.."যাই মা"।
"সন্ধ‍্যে হয়ে আসছে এবার তো ঘরে আয়,আর কত বন্ধুদের সাথে গল্প করবি। তোর বাবা তো জানিস সন্ধ‍্যেবেলা বাইরে থাকা পছন্দ করেনা।"
...."বাইরে কোথায় মা এই তো আমাদের উঠোনের বাইরেই আছি। সবিতা আর রিয়ার সাথে একটু গল্প করছি। সামনেই তো বড়দিন তাই রিয়ারা কি সব প্ল‍্যান করেছে তাই কথা বলছি।"
       মায়ের ডাকাডাকিতে আর বেশিক্ষণ থাকা হয়না ইরাণীর,ঘরে চলে আসতে হয়। বাবাকে ওরা সবাই ভয় পায়। বাবা একদম আড্ডা দেওয়া পছন্দ করেনা।
     ...."মা কখন থেকে বারান্দায় একা একা বসে আছো, কি ভাবছো গো?" "ওহ্ তুই এসে পড়েছিস হসপিটাল থেকে বুঝতেই পারিনি। চল খেতে দিই তোকে।" ছেলের কাছে ধরা দেয়না সবসময় ইরাণী নিজেকে। কোন একটা দূর্বল মুহূর্তে হয়ত বলে ফেলে স‍্যামুয়েলকে ওর মনের কথা। তবে স‍্যামুয়েলকে বলতে হয়না ও সবটাই জানে তাইতো খুব যত্নে রাখতে চায় ইরাকে,না না ও রানী বলে ডাকেনা। থাকনা ঐ নামটা ওর একান্ত ভালোবাসায় মাখানো নাম। আজও হয়ত ও প্রতীক্ষায় থাকে ঐ নামটা শুনবে বলে। কিন্তু কই এত বছর পার হয়ে গেলো তবুও তো বাবা কখনো এসে ডাকলোনা,"রানীমা দেখি কেমন সংসার করছিস?বাহ্ এই তো আমার মা পাকা গিন্নী হয়েছে তো। ওমা কত বড় হয়ে গেছে দাদুভাই! ইস্ মাঝে কতগুলো দিন যে চলে গেলো বৃথা অভিমান করে।"
           অনেকদিন আগে চাবাগান ছেড়ে এসেছে রানী আর কখনো যায়নি সেখানে,ভীষণ মনখারাপ লাগে আজকাল মনে হলেই। স‍্যামুয়েল দুএকবার বলেছে,চলো ইরা তোমায় নিয়ে যাই প্রজাপতিদের দেশে যেখানে আজও হয়ত টিয়াপাখির ঝাঁক দেখা যায়। মুখটা খুশি খুশি হলেও চোখটা হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় ইরাণীর না না ও কথা খেলাপ করতে পারবেনা বাবা যে বলে দিয়েছিলেন আর যেন কখনো ঐ গ্ৰামে পা না রাখে রানী।
        ওদের গ্ৰামের এক কোণে ছিলো চার্চ আর সেখানেই ছিলো স‍্যামুয়েলদের বাড়ি,আরো ছিলো কিছু খ্রীষ্টান পরিবার। একসাথে মজা করে করত বড়দিনের উৎসব পালন। ওর বাবা উমাকান্তবাবু পুজো করতেন ওরা ছিলো ভট্টাচায‍্যি পরিবার। চা বাগানের আসেপাশে রঙিন প্রজাপতির মত ঘুরে বেড়াতো রানী কখনো স্কুলে যাওয়ার পথে সাইকেলের সামনে বসে আলতো ছোঁয়ায় মন রাঙতো গভীর প্রেমে। আবার কখনো বা বইয়ের ভাজে থাকতো স‍্যামুয়েলের দেওয়া ছোট ছোট অনুভূতির চিরকুট। মা জানতে পেরে খুব সাবধান করেছিলেন," শোন স‍্যামুয়েলের শুনেছি তেমন কেউ নেই,অনাথ। চার্চের ফাদারের কাছেই মানুষ, তোর সাথে ওর এত বন্ধুত্ব কিসের? যত নষ্টের গোড়া তোর বন্ধুগুলো। রানী খুব সাবধান আর বেশি এগোসনা। আমরা ছেলে দেখছি,তোর বিয়ে দিয়ে দেবো।" রানী তখন সবেই টুয়েলভের পরীক্ষা দিয়েছে।
      মায়ের কথা শুনেও সাবধান হতে পারেনি রানী,আরও আঁকড়ে ধরেছিলো স‍্যামুয়েলকে। রিয়ার দিদির বৌভাতে ওরা সবাই গিয়েছিলো। ভেসে গিয়েছিলো হঠাৎই ইরাণী কোন এক নির্জনে খুব কাছাকাছি এসেছিলো স‍্যামুয়েলের। দুজনেই হয়েছিলো বাঁধনহারা উদ্দাম। কেউই সামলাতে পারেনি নিজেদের।সদ‍্য যৌবনে পা রাখা ইরাণী হারিয়ে গিয়েছিলো,উজাড় করে দিয়েছিলো নিজের সবটা।
          বাড়ি থেকে তখন জোরকদমে পাত্র দেখা হচ্ছে। অস্থির হয়ে যায় ও," মা আমি বিয়ে করতে পারবোনা,তুমি একটু বাবাকে বুঝিয়ে বলো।" সাহস করে বলতে গিয়েছিলো মা কিন্তু জোর খাটিয়েছিলেন বাবা," আমি কিছুতেই হতে দেবোনা এই বিয়ে,আমি ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি।"..অসহায় রানী বুঝতে পারেনা কি করবে,স‍্যামুয়েলকে ছাড়া ও বাঁচবেনা অথচ স‍্যামুয়েল চায় সবার মতে যা হবে হোক। তাছাড়া তখন দুজনেরই বয়স কম।
      তবুও শেষরক্ষা হয়নি,অনভিজ্ঞ রানী অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। ডাক্তার জানিয়েছিলো ও মা হতে চলেছে,তখনকার দিনে সমাজের কঠোরতায় রানীর লাঞ্ছনা হয়েছিলো প্রচুর। নিন্দা,সমালোচনা,বাবার কাজ বন্ধ। রাগে অন্ধ হয়ে বাবা বলেছিল," বংশের কলঙ্ক একটা,সব রক্তের দোষ। আমার নিজের রক্ত এত জঘন‍্য কাজ করতে পারেনা। ছিঃ ভাবতেই লজ্জা লাগে এ আমার মেয়ে!"..মাথা নিচু করেছিলো মা,রক্তের দোষ কথাটা হয়ত মাকেই ইঙ্গিত করে বাবা বলেছিলো।
               রানীকে বেড়িয়ে এসেছিলো বাড়ি থেকে স‍্যামুয়েলের সাথে। পেছন থেকে শুনেছিলো আর যেন কখনো পা না দেয় এই গ্ৰামে। রাগে হাঁপাচ্ছিলো বাবা,মা কাঁদছিলেন। ছোট ভাইটাও কাঁদছিলো,কিন্তু কিছু করার ছিলোনা। বড় অসহায় লেগেছিলো এতদিনের বাড়ি ছেড়ে গ্ৰাম ছেড়ে অজানা ভবিষ‍্যতে পা রাখতে। ভুল করেছিলো রানী তাই হয়ত তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিলো। ফাদার সব ব‍্যবস্থা করে দিয়েছিলেন,সন্তানের জন্ম হওয়ার পর আবার পড়াশোনা শুরু করে ও। স‍্যামুয়েল ততদিনে একটা কাজ করছে। ছোট্ট সংসারে টানাটানি করে চলত ওদের। অনেকদিনই ভালো করে খাওয়া জুটতোনা,ছেলের খাবার জোগাড় করতে হিমসিম খেতে হত। দিন ফিরেছে,ভালো আছে ইরা আর স‍্যামুয়েল,বড় হয়েছে মাইকেলও। অনেক সুখের মাঝে আজও বৃষ্টিতে মন ভিজে যায় ইরাণীর,মনে পড়ে চাবাগানের সোঁদা গন্ধ আর রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মা বাবাকে অগ্ৰাহ‍্য করে সাহস পায়নি যোগাযোগ করার। বাবা দিব‍্যি দিয়েছিলেন, "ওর সাথে সম্পর্ক রাখলে আমার মরা মুখ দেখবে।"..ভাই বড় হয়েছে ,বিয়ে করেছে। সব খবরই পায় বন্ধুদের কাছ থেকে ও। শুধু মনে মনে বলে ভালো থাক ওরা। সবিতা মাঝে মাঝে হোয়াটস আ্যপে ছবি পাঠায়,তাতেই দেখতে পায়। শোনে বাবার শরীর খুব একটা ভালো যায়না তবুও জেদ আছে একই রকম। মা কাঁদে ওর কথা হলেই। ছবি দেখতে চায় লুকিয়ে,নাতিকে দেখে খুশি হয়।
               " মা,আমার চাকরিটা হয়ে গেছে গো,কি যে ভালো লাগছে পাহাড়ের দেশে পোষ্টিং।".." বাবু আরেকটু ডিগ্ৰীটা বাড়ালি না?".." আমি পড়াশোনা ছাড়বোনা মা,কিন্তু চাকরিটা যে আমাদের দরকার তাইনা? বাবা আর তুমি কত লড়াই করেছো আমাকে বড় করতে।...মনটা ভালো হলেও খারাপ হয়ে যায় ইরাণীর,পাহাড়ের দেশে! ঐ পাহাড়ের কোলেই তো ওর বাপের বাড়ি। মাইকেলের হসপিটালের থেকে খুব বেশি দূর নয়। ছেলের কোয়ার্টার গুছিয়ে দিয়ে এলো স‍্যামুয়েল,ওর যেতে ইচ্ছে করলোনা। ওরাও জোর করলোনা। সবসময়ই কথা হয় ছেলের সাথে,ভালো আছে ও। আরো একা হয়ে গেছে রানী ও চলে যাবার পর। স‍্যামুয়েল বলে," ইরা, সামনের গরমে আমরা দুজনেই যাবো ওর ওখানে,ছেলেটা একদম নতুন গেছে। তোমার কথা খুব বলছিলো। কি খাওয়াদাওয়া করছে কে জানে?"..বুকটা কেঁপে ওঠে ইরাণীর,এতদিন বাদে বাবুর জন‍্য যেতে হবে ওখানে!
             দেখতে দেখতে ছয়মাস কেটে গেছে। অনেক টুকিটাকি জিনিস গোছাচ্ছে কদিন ধরেই ইরাণী,ছেলের অনেক ফরমায়েশ। সামনের সপ্তাহেই তো যাওয়া।
       ট্রেনে বসে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হারিয়ে যায় ও,সকালে উঠেছে ওরা ট্রেনে। ওখানে পৌঁছতে রাত্রি হয়ে যাবে,যতক্ষণ আলো থাকলো ইরাণী মাটির গন্ধে আর স্বাদে মশগুল হয়ে থাকলো। ইশ্ দেশের মাটির গন্ধ বড় মিঠে,মন ভরিয়ে দেয়। গাছপালাগুলো কেমন বদলাচ্ছে একটু একটু করে। ইরানী মনে মনে বলে এই তো তোরা একই আছিস,খুব চেনা আর তেমনি গাঢ় সবুজ। ঐ তো ধানের গাছগুলো কেমন সবুজ গালিচার মত। আরে ঐ তো পাটগাছ,পাটশাকের ভাজার স্বাদ জিভে লাগলো। এই জন‍্যই বোধহয় কবিরা বার বার বাংলার রূপ দেখেছেন গ্ৰাম বাংলার গাছপালা,নদী,মাঠঘাট,প্রান্তরে।
           খুব সুন্দর জায়গায় হসপিটালটা,এখানে এর আগে কখনো আসেনি ইরাণী। মনটা জুড়িয়ে যায়। ছেলে তো মহা খুশি মা বাবাকে পেয়ে। অনেকদিন বাদে চাবাগানের চাদরে হাত রাখে ইরাণী,স‍্যামুয়েল দাঁড়ায় পাশে। হাতটা রাখে ওর কাঁধে,অনেকদিনের সঙ্গী ওরা,সুখে দুঃখে বিপদে সম্পদে আঁকড়ে রেখেছে দুজনকে। ইরা কখনো মুখ ঢেকেছে কান্নায় ওর বুকে। আবার কত বন্ধুর পথ হাত ধরে হেঁটেছে ওরা।
                    ছেলেটা দুপুরে খেতেও এলোনা,বড় অস্থির লাগে ওদের। কি এমন কাজের চাপ ওর বুঝতে পারেনা ফোন করতেও সঙ্কোচ হয়। একটা সময় ওই খবর পাঠায় আজ লাঞ্চটা পাঠিয়ে দেবার জন‍্য হসপিটালে। অনেকগুলো এমার্জেন্সি আছে। যথারীতি রাতেও ফিরতে অনেকটা দেরি হয় ওর। " কি রে এত দেরি?"..." হ‍্যাঁ মা আজ সারাদিন খুব টেনশনে কাটলো,এখন একটু এলাম আবার হয়ত বেড়িয়ে যেতে হবে। একটু টায়ার্ড লাগছে,তুমি খাবার দাও আমি ফ্রেশ হয়ে নিই। একজন পেশেন্টকে ব্লাড দিতে হলো।".." সে কি কেন? তোকেই ব্লাড দিতে হলো কেন?"..." এত রেয়ার গ্ৰুপের ব্লাড মা পাওয়া যাচ্ছেনা,অথচ এমারজেন্সি ছিলো তাই আমিই দিয়ে দিলাম নাহলে লাইফ রিস্ক হয়ে যেত। ভাগ‍্যিস আমার সাথে ম‍্যাচ করে গিয়েছিলো।"
        একটু অস্থির হয়ে পড়ে ইরাণী। "চিন্তা কোরনা মা,আমি তো বরাবরই ব্লাড ডোনেট করি। কোন অসুবিধে হচ্ছেনা।..আমি একটু রেস্ট নিয়ে নি,ফোন এলেই বেরোতে হবে।" সারাটা রাত একটু উৎকন্ঠায় কাটে ইরাণীর আজকাল একটুতেই যেন বেশি চিন্তা হয়,নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা।
          সকাল সকাল বেড়িয়ে,হসপিটালে চলে যায় মাইকেল। নিশ্চিন্তে তখনো ঘুমোচ্ছে পেশেন্ট,নার্স জানায় অনেকটা ভালো এখন। একটু বাদে খবর পায় উনি জেগেছেন বাড়ির লোকও এসে পড়েছে,সারারাত ওরা প্রায় এখানেই ছিলো যদি দরকার হয়।
...." দেখি হাতটা,বাহ্ এই তো অনেকটা ভালো আছেন। কাল যে অবস্থায় এসেছিলেন। আর চিন্তা নেই তিনদিন বাদেই ছেড়ে দেবো।"...হাতটা ছাড়াতে পারেনা মাইকেল,শীর্ণ হাতটা জড়িয়ে আছে ওর হাতটা পরম নির্ভরতায়," আজ আপনার জন‍্য আমি বেঁচেছি ডাক্তারবাবু সিস্টারদিদি বলেছে আপনি আমায় রক্ত দিয়েছেন।" হাসে মাইকেল," ওটা আমার ডিউটি।"
              ততক্ষণে ওনার ছেলে এসে পড়েছে,এসেছেন স্ত্রীও। সবার মুখেই প্রশান্তির ছাপ। " জানো এই ডাক্তারবাবু আমায় রক্ত দিয়েছেন কাল।".."কিন্তু তুমি শেষে খ্রীষ্টানের রক্ত নিলে। শুনেছি উনি খ্রীষ্টান।".." ছি ছি কি বলছো তুমি,উনি কি ভাববেন?রক্তের আবার জাত হয় নাকি? সবই আমাদের করা নিয়ম,রক্তের রঙ সবারই লাল।"
        আজ স্বামীর মুখে অনেক বড় কথা শুনে বুকের মধ‍্যেটা বড় অস্থির হয় তাই বলেই ফেলেন," তোমায় হয়ত বাঁচাতে পারতামনা আমরা যদি আমাদের দাদুভাইয়ের রক্ত না মিলত তোমার সাথে। কি করে যে এমন মিল হলো কে জানে!"...বড় অস্থির হয়ে ওঠে উমাকান্তবাবুর সারা শরীরটা। " উনাকে এখন উত্তেজিত করবেন না প্লিজ।" এই বলে চলে যেতে যায় মাইকেল।
           " দাঁড়াও দাদুভাই,আমার চশমাটা একবার দাওনা,একটিবার ওকে ভালো করে দেখি। ও যে আমার রক্তের জিনিস।"..বড় অভিমান হয় মাইকেলের মনে পড়ে মায়ের কষ্টের কথা। কত রাত চোখের জলে ভেজে মায়ের মুখটা,কতদিন মা মনখারাপ করেছে। নষ্ট হয়ে গেছে কতগুলো
বছর মাঝখানে। মা সবিতামাসির পাঠানো ছবি ওকে না দেখালে তো চিনতেই পারতনা দাদুকে।
                চোখটা বড় ঝাপসা আজ উমাকান্তর যে ভুল তিনি করেছেন শুধুমাত্র জেদের বশে তা আজ তার চরম বিপদের দিনে এলো আশীর্বাদ হয়ে। বড় ইচ্ছে করছে আজ দাদুভাইকে জড়িয়ে কাছে রাখতে,হাতটা বাড়ান কিন্তু দেখেন স‍্যালাইন চলছে। ততক্ষণে চলে গেছে মাইকেল। কাল মাকে কিছুতেই বলতে পারেনি দাদু অসুস্থ। ও জানতো মা খুব অস্থির হবে অথচ এক অদৃশ‍্য গন্ডী পেরিয়ে কখনো যেতে পারবেনা দাদুর কাছে।
             ..." মা আজ বিকেলে যাবে আমাদের হসপিটালে? চলোনা একটু দেখে আসবে আমার কাজের জায়গা।" "আমি কি করবো বাবু ওখানে গিয়ে?".ছেলে জোর করেই নিয়ে যায় মাকে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। মনটা ভরে যায় ইরাণীর কত ভালোবাসে ওকে সবাই,কি সুন্দর সবার সাথে মিষ্টি সম্পর্ক। সবশেষে মাকে এনে দাঁড় করায় ফেলে আসা নিষিদ্ধ অতীতের সামনে।" এসো মা ইনিই তোমায় খুব করে আনতে বলেছেন।"..কাদের দেখছে চোখের সামনে! চোখের জল আজ বাধ ভেঙেছে ইরাণীর,মা এসে শীর্ণ হাতের মুঠোয় আকড়ে ধরে ওর হিম হয়ে যাওয়া হাতটা," আয়,রানী।"
         সবার মিলে যাওয়াটা আজ যেন একটা ছায়াছবির মত লাগলো মাইকেলের। সম্পর্কগুলো এত মিষ্টি হয়! দাদুর চোখ ভর্তি জল,"রানী,আমাকে ক্ষমা করে দে মা। আমার সুদটা যে এত মিষ্টি বুঝতেই পারিনি। আমিই অভাগা তাই জেদ আর অহঙ্কারে নষ্ট করেছি এতগুলো বছর।"...আজ রানীর কিছুই বলতে ইচ্ছে করলোনা বড় গর্ব হলো ছেলের জন‍্য,ও যে মায়ের সব কলঙ্ক ধুয়ে মুছে দিয়েছে। বড় ভালো লাগলো বাবার মুখে শুনতে," দাদুভাই যে আমার রক্তের জিনিস তাইতো রক্ত মিলে গেলো দুজনের।" কতদিন শুধু এই স্বীকৃতির জন‍্যই হয়ত অপেক্ষা করেছে।
     স‍্যামুয়েলের ইচ্ছে হয়নি ওদের মাঝে আসতে। অনেকদিনবাদে ইরাণী আজ রানী ডাক শুনতে পেয়েছে। থাক আজ মেয়েটা একটু স্নেহের বন্ধনে। বাবা মায়ের হাত ধরে অনেকবছর বাদে গ্ৰামে ফিরলো ওরা। সত‍্যিই বোধহয় বাপের বাড়ির চেয়ে মিষ্টি কিছু হয়না। চেনা মাটির গন্ধ,আত্মীয়স্বজন,ফুলপাতা,চা বাগান সবটাই বড় মিঠে মিঠে লাগলো ইরাণীর। বাবা যেন ওকে কাছছাড়াই করতে চাননা। ভালো থাক ওরা কাঙ্খিত স্বীকৃতি পেয়ে সম্পর্কের মিষ্টি বন্ধনে।

সমাপ্ত:-
         
       

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।