Skip to main content

ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে এখনো ফিরলোনা রজত! কিছুক্ষণ ব‍্যালকনিতে বসে থেকে আবার ঘরে আসে মিলি দশটা পনেরো।ফোনটাও সুইচড অফ সত‍্যিই এবার চিন্তা লাগে।পিউসোনা অনেকক্ষণ "বাপি এখনো এলোনা কেন?কখন আসবে?"বলে বায়না করছিলো অনেক কষ্টে ওকে ঘুম পাড়িয়েছে। তারপর থেকে ঠাঁই বসে এদিক ওদিক করছে। দুদিন ধরে বাড়ি নেই রজত অফিসের কাজে বাইরে যাওয়াটা যেন আজকাল খুব বেশি হয়ে গেছে।আগে ছ মাসে ন মাসে একটা ট‍্যুর থাকতো এখন পনেরো দিন অন্তরই বাইরে বেরোচ্ছে।আর গেলেই দুতিন দিনের ধাক্কা।বললে বলে," আরে বাইরে গেলে অনেকগুলো টাকা হাতে পাই। পিউসোনা বড় হচ্ছে।টাকা ছাড়া চলবে কি করে শুনি।"
  " তাই নাকি?তাহলে আমি চাকরির খোঁজ করি।
আমি তো চাকরি করতাম,কিন্তু পিউ হবার পর তো ওর জন‍্যই ছেড়ে দিলাম। আয়ার হাতে কি বাচ্চা মানুষ হয় ঠিকমত?"
  দীর্ঘশ্বাস ফেলে রজত,মনে মনে ভাবে পিউকে বেশি সময় দিতে গিয়ে আমাদের সময়গুলো যে হারিয়ে যাচ্ছে তা বোধহয় বুঝতেই পারেনা মিলি।
সারাক্ষণ পিউ কি খাবে?কি করবে? ওর শরীর ঠিক নেই এই তো চলছে। মাঝে মধ‍্যে সত‍্যিই বাড়িতে এসে দমবন্ধ লাগে।দুজনের মধ‍্যে কোন কথা নেই ঐ একটা কথা ছাড়া। বেশিরভাগ সারাদিন বাড়ি থাকতে থাকতে ম‍্যাডামের মাথা গরম থাকে আর তার চোটটা পড়ে রজতের ওপরে।অফিসে দমবন্ধ কাজ,বাড়ি আর অফিস করা তারপর ছুটির দিন বাড়ি থাকলেই গুচ্ছের বাজার করো,নাহলে এটা করো সেটা করো লেগেই আছে। আর কিছু বলার তো উপায়ই নেই বললেই বলবে ,"শুধু বাবাই হয়েছো কি আর করো এমন?"এই করে করে পিউরও আড়াইবছর বয়েস হয়ে গেলো।
           অপেক্ষা করতে করতে চোখটা একটু লেগে আসে মিলির,বিছানাতে আধশোয়া হয়েই চোখটা বুজে দেয়। দরজার আওয়াজ হতেই উঠে বসে। রজতের কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি থাকে সবসময়ই। দেখে রজত ঘরে ঢুকছে খুব ক্লান্ত মনে হয় ওকে।দুদিনেই যেন চোখমুখ বসে গেছে।কে জানে কি খাওয়া দাওয়া করেছে না করেনি।
     "কি ব‍্যাপার বলতো?বাড়ির লোকের কথা একবারও ভাবোনা নাকি? কটা বাজে বলতো?"
     " সরি ডিয়ার,আরে রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না। তারপর ফোনটাতে চার্জ নেই।আমারই বিরক্ত লাগছে কখন তোমাকে আর পিউসোনাকে দেখবো।"
" কারো ফোন থেকে একটা ফোন তো করে দিতে পারতে নাকি? আমার যে কোন চিন্তা হচ্ছিলো।"
" আরে চিন্তা কোরনা,খারাপ কিছু হলে খবর পেয়ে যাবে ঠিক।"
   " কি যে বলোনা,মুখে কিছু আটকায়না। যাও মুখ হাত ধুয়ে এসো। আমার খুব খিদে পেয়েছে।"
  " হ‍্যাঁ যাচ্ছি,এখুনি।"
"হ‍্যাঁ যাও শিগগির হাত পা ধুয়ে পরিস্কার হয়ে এসো।"
ফোনটা চার্জে দিতে যায় রজত।
" এখন কিছুতে হাত নয়,খবর দেখোনি কলকাতাতে কি কান্ড! এতদিন নিশ্চিন্ত ছিলাম আর থাকা যাবেনা। আমি সব জিনিসে আগে স্প্রে করি তারপর।বাথরুমে সব রেডি আছে একদম পরিস্কার হয়ে নাও।"
"এই শুরু হলো তোমার।"
চিৎকার করে মিলি," শুরু হলো মানে?পিউসোনা ছোট।তোমার কোন সেন্স নেই।যা বলছি করো।"
      রজত বাথরুমে গেছে বাধ‍্য ছেলের মত পিউসোনা মাঝখানে তাই কোন কথা নয়। ফোনটাতে ভালো করে স্প্রে করে মিলি এবার চার্জে দিয়ে একটু বাদে সুইচ অন করে।
        রজত বাথরুম থেকে এসে ঘাবড়ে যায় মিলির কুর্তার ওপর ওড়না জড়ানো হাতে ট্রলি। এত রাতে কোথায় যাচ্ছে মিলি।তাহলে কি?
           " কি হচ্ছে মিলি দরজা খুলছো কেন? এত রাতে কোথায় যাচ্ছো?কি হলো কিছু বলছো না কেন?"
        তোয়ালে জড়িয়ে মিলির দিকে এগিয়ে আসে রজত।মিলি ততক্ষণে ট্রলিটাকে বাইরে রেখেছে। রজতও বাইরে বেরিয়ে আসে। " আমি কোথাও যাচ্ছিনা।যাবে তুমি এবং এখুনি।"
     রজতকে কোন কথা বলতে না দিয়ে ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেয় মিলি। বাইরে থেকে দরজায় ঠকঠক আওয়াজ শুনতে পায়।কোন উত্তর দেয়না মিলি।ওর মাথায় তখন আগুন জ্বলছে।স‍্যানিটাইজার দিয়ে হাতটা ধুয়ে নেয় ভালো করে। এত বড় ফাঁকি,কি মরতে যে ফোনটাকে অন করেছিলো!
    ওকে মিথ‍্যা কথা বলে একদম কলকাতার বাইরে বেড়াতে চলে গেছে অফিসের নাম করে ছি ছি।ভেবেই কেমন রাগে ঘেন্নায় গা জ্বলে ওঠে কত বড় একটা মিথ‍্যাবাদী অথচ এই মিথ‍্যাবাদীটাকে একসময় ও ভালোবেসে বিয়ে করেছে।
         রজত আর বাধা দিতে পারেনা,কিন্তু মিলি কি করে জানলো?যত নষ্টের গোড়া রথীনটা সমানে উস্কানি দেয়।কি মরতে যে একদিন বলে ফেলেছিলো.." আরে লাইফটা হেল হয়ে গেলো মাইরি।সারাদিন এটা করো,সেটা কোরনা।বৌ আর বাচ্চা ছাড়া আমার যে একটা লাইফ আছে তা তো ভুলতেই বসেছি।"
" আরে বদ্ধ ঘরে না থেকে একটু নিঃশ্বাস নাও বস্। নাহলে জীবন একেবারে হেল হয়ে যাবে। ওরা তো আমাদের একদম হোলটাইম আ্যটেনডেন্ট ছাড়া আর কিছুই ভাবেনা।"
    কথাগুলো খুবই সত‍্যি,মাঝে মাঝে তো মনে হয় জীবনটাই শেষ হয়ে গেলো।না পার্টি,না স্মোকিং না ড্রিঙ্কস।সবসময় মাঝে পিউসোনা এসে যায় বা মিলি। এখন বাবা হয়েছো তাই আগের মত চলা যাবেনা।
      তাই মুখ বেজার করে বলে," কি করবো তাহলে শুনি।বৌ মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে আবার ব‍্যাচেলার হয়ে যাবো নাকি?"
    " ধ‍্যাৎ বৌ মেয়ে ছাড়তে যাবি কেন?এইসব পাপের কথা বলতে নেই। শুধু একটু প্ল‍্যান করে চলতে হবে। একদম দুদিকে ব‍্যালেন্স করে চলা আর কি।"
   আর সেই থেকে চলছে মাসে একবারের আউটিং।বেশ চলছে,একবার অফিস ট‍্যুর আর একবার ব‍্যাচেলার সাজার সুখ। প্রথমে একটু অপরাধ বোধ হয়েছিল মনে..." ধ‍্যাৎ মিথ‍্যে কথা বলে যাবো।মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক হচ্ছেনা।"
" তাই নাকি?তাহলে সত‍্যিটা বলে দেখ।"
  চেষ্টা করেছিলো মিনমিন করে সত‍্যি বলার.."
        " বুঝলে রথীনরা বলছিলো মন্দারমণি যাবার কথা এই উইকএন্ডে।"
   তারপর আর কিছু বলতে হয়নি বাকিটা বলেছিলো মিলি,সে অনেক অনেক কথা আর শেষ হয়েছিলো কান্নায়।শেষে অনেক বুঝিয়ে আদর টাদর করে আর বিরিয়ানি ঘুষ দিয়ে রাতে প্রায় একসপ্তাহ বাদে মিলিকে কাছে পেয়েছিলো।
      " কি রে বৌ পারমিশন দিয়েছে?বলেছিস?"
     "হুঁ বলেছিলাম ভীষণ অশান্তি করেছে।না রে আমার যাওয়া হবেনা।"
  " জানতাম, আরে ওরা হচ্ছে অসুরের মত।কখনো মোহিনী আবার কখনো রাক্ষসী।"
  রথীনটা কেন যেন বৌদের ব‍্যাপারে একটু বেশিই বাজে কথা বলে। ছোট থেকে শুনে এসেছে মেয়েরা বাড়ির লক্ষ্মী।
               
   
             

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...
সালটা দুহাজার এগারো,মেয়েটা তখন বেশ ছোট,ছেলেটা সে বছরেই কলেজে ঢুকেছে। আর আমার মেয়ের কথায় আমরা তখন খুব গরীব ছিলাম। তবে সে আরও বলে তখন আমাদের মুঠোতে সুখ ছিল,আমরা তখন বেঁধে বেঁধে ছিলাম। ডাইনিং স্পেশে পাতা পুরোনো সোফাটায় আমি বসে শনিবার রাতে ডিডি ন‍্যাশনালে সিনেমা দেখতাম আর বুধবারে দেখতাম চিত্রহার। কখনও ওরাও এসে বসত আমার কোলে পিঠে,একসাথে বসে আমাদের চলত কত কথা আর ওদের দুই ভাইবোনের খুনশুটি। কখনও বা ঝগড়া আর মারামারিও হত,ধুপধাপ তাল পড়ত পিঠে। ওদের বাবা অফিস থেকে এলে দুজনেই উৎসুক হয়ে তাকাতো বাবার হাতের দিকে,তারপর পড়ার মাঝে জুটত ব্রেক বাবার আসার উপলক্ষে চপ,বেগুনী আর চুরমুর সেলিব্রেশনে। আমাদের হাতে তখন ফোন এলেও মুঠোতে বিশ্ব ছিল না,ছিল না ফেসবুক পাড়ায় যখন তখন ভ্রমণ। আমরা একই ছাদের তলায় বাস করেও আলাদা ছিলাম না,আমাদের অনলাইন শপিং ছিল না তখন তাই ছেলেমেয়েদের নিয়ে শপিং করে কিছু খেয়ে ফেরার দিনগুলো খুব আনন্দের ছিল। ছেলের দীর্ঘ পরীক্ষার সমাপ্তির পর আমরা চলে গিয়েছিলাম তালসারিতে। গত দুদিন ধরে তালসারির কথা এত পড়ছি যে আজ হঠাৎই মনে হল আমরাও তো গেছিলাম তালসারিতে। ছবিগুলো অ্যালবাম করে রাখা ছিল বলে পেলাম। আমাদের মধ‍...