ক্যালেন্ডারের দিকে চোখ পড়ে নীলিমার মেয়াদের সময় শেষ হয়ে গেছে কতদিন আগেই তবুও ইচ্ছে অনিচ্ছার গন্ডীতে আবদ্ধ হয়েই আটকে গেছেন সোমকের এখানে। অথচ এখন তার থাকা উচিত সায়কের কাছে।মানে চুক্তি অনুযায়ী তেমনি কথা।তিনমাসের চুক্তি,আবার তিনমাস বাদে ঠিকানা বদল করে পরিযায়ী পাখির মত অন্য জায়গায় পাড়ি দেওয়া।হাতের ব্যাগটা সেখানে রেখে তাদের মন মত চলা আবার মেয়াদের শেষে ঠাঁই বদল।
এপ্রিলের প্রথমেই কথা ছিলো সায়কের কাছে চলে যাবেন, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আর যাওয়া হয়নি। লকডাউন ঘোষণা হতেই প্রথমেই বড় বৌমা বলেছিলো.." আর কি হয়ে গেলো,এখন টানা ছয়মাস না একবছর কতদিন চলবে কে জানে? আমরাই কি খাবো,কি করবো তার ঠিক নেই তার মধ্যে আমিষ নিরামিষের ঝামেলা।"
কথাগুলো কানে এসেছিলো নীলিমার বুঝতে পেরেছিলেন মেয়াদ শেষের পরেও তার থেকে যাওয়া নিয়ে খুবই অসন্তুষ্ট বৌমা। যদিও কানে এসেছিলো ছেলের কথা.." মা শুনতে পাবে,একই ব্যাপার পরে আ্যডজাস্ট করে নেবো সায়কের সাথে।এত ভাবছো কেন?"
ভাবনা বেড়েছিলো নীলিমারও বড় বৌমার অসন্তুষ্ট আচরণে। সত্যিই তো কি সমস্যা,সব গাড়ি,ট্রেন সবই বন্ধ তাই কোথাও যাবারই উপায় নেই এখন।
সায়ক ফোন করলো," মা কিছু করার নেই।দাদাকে সব বলেছি কয়েকদিন একটু আ্যডজাস্ট করো। ট্রেন চালু হলেই আমি চলে যাবো। রুম্পাও বলছিলো তোমার কথা। অন্য সময় ও অফিসে চলে গেলে তুমি একা হয়ে যাও এখন কম্পানি দিতে পারতো।"
ছেলেদের কথা শুনে হ্যাঁ না করে উত্তর দেন নীলিমা। রুম্পা সায়ক বাড়িতে না থাকলে বাইরে থেকে তালা দেওয়া থাকে নিরাপত্তার খাতিরেই কারণ অজানা কাউকে দরজা খুলে দিলে বিপদ হতে পারে। তাই সারাদিন হয় শুয়ে থেকে নাহলে বারান্দায় বসে দাঁড়িয়ে সময় কেটে যায় নীলিমার।মাঝে মাঝে খবরের কাগজ আর বই পড়েন।
রুম্পা সায়কের বছর চারেক বিয়ে হয়েছে ওদের বিয়ের এক বছর বাদেই হঠাৎই অংশু চলে গেলো।তারপর একটা বছর বর্ধমানের বাড়িতেই একা ছিলেন,যদিও চারিদিকে অনেক শূন্যতা তবুও তারমধ্যে নিজের মত থাকা। আসেপাশের লোকেরা অবশ্য খবর নিতো সবসময়ই।মণির মা,সরলা ওরা তো প্রায় প্রত্যেকদিন এসে গল্প করতো।
তার মধ্যেই হঠাৎই শরীর খারাপ হলো।দুই ছেলেই এলো ছুটে।ওখানকার সবাই বললো 'এবার মাকে নিয়ে তোমাদের কাছে রাখো।একা থাকা আর ঠিক হবেনা।'
তারপর থেকেই এই ব্যবস্থা চলছে গত একবছর।নীলিমা বুঝতে পারেন হঠাৎই এসে ঢুকে পড়েন ওদের নিজের নিজের সুখী গৃহকোণে আগন্তুকের মত। শুধু ঝিনুকের মুখে হাসি দেখা যায়," ও ঠাম্মি বাবাকে বলবো কুল আনতে।তুমি কুলের আচার বানাবে তো? আর সাবুর পাপড়?"
ওর কচিমুখের কথাগুলো শুনে কেমন যেন অসহায় লাগের নীলিমার। রান্নাঘরে কোন কাজ করলেই বৌমা বিরক্ত হয়,কাজের লোকও বিরক্ত হয়। " মাসিমা কি পুড়িয়েছে গো কড়াটা,বাবা মাজতে হাত ব্যথা হয়ে গেলো।"
বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল। এখন সামার ভ্যাকেশন চলছে...
Comments
Post a Comment