Skip to main content

বেল বাজার আওয়াজে দরজা থেকে খবরের কাগজটা নেয় যশোদা চোখ রাখে প্রথমেই বাড়ির অন‍্যেরা তখনো ঘুমের দেশে।
          হেডলাইন আর ছবিটাতে চোখ পড়ে যায়,খবরটাতে একটু যেতেই চোখটা বুজে ফেলে যশোদা,তাড়াতাড়ি ছুটে বেডরুমে যায় রাহুল দিব‍্যি ঘুমোচ্ছে শান্তনুর গায়ে পা তুলে দিয়ে।
                 ঘুমন্ত রাহুলের গায়ে মমতায় হাত বোলায় যশোদা।তারপর ছুটে আসে এই ঘরে নিশা আর নীল ঘুমোচ্ছে নিশ্চিন্তে গুটিশুটি মেরে।
            সন্তানদের ঘুমোতে দেখে যেন স্বস্তিতে চোখ বোজে যশোদা। তবুও বার বারই কেন চোখের সামনে ভাসছে ছবিটা। রেলের প্ল‍্যাটফর্মে চাদর ঢাকা দিয়ে শুয়ে আছে মা আর ছোট্ট শিশুসন্তান যার একমাত্র অবলম্বন মা সেই মা মৃত তা না জেনেই...জানবেই বা কি করে ঐ দুধের শিশু? সে চাদর সরাচ্ছে মাকে দেখতে হয়ত বা মাতৃস্নেহ পাবার আশায় অথবা খাবারের খোঁজে।
                        রান্নাঘরে কাজে মন দিতে পারেনা যশোদা, বাচ্চাটা কত বড় হবে? একদম যেন রাহুলের মত। শ্বশুরমশাই উঠে পড়েছেন তাই চা বসানোর উদ‍্যোগ নেয় যশোদা।পরে আবার একবার চা হবে শান্তনু উঠলে।
               চা টা নিয়ে শ্বশরমশাইয়ের ঘরে দাঁড়িয়েছে যশোদা,উনি খবর চালিয়েছেন বড় স্ক্রীনের স্মার্টটিভিতে বার বারই ভেসে ওঠে বাচ্চাটার ছবি সে প্ল‍্যাটফর্মে শুয়ে থাকা মৃত মায়ের চাদর তুলছে আর তার সাথে নানা রকম মন্তব‍্য।

        " দেখেছো বৌমা,বুড়ো মানুষ কিই বা করবো সকালে উঠে একটু খবর শুনি।তা এমন একটা খবর! আর সব চ‍্যানেলে বার বার দেখাচ্ছে। মানুষের কি কোন কাজকম্ম নেই গো,বাচ্চাটাকে না সামলে বসে বসে ভিডিও করেছে। কি দিন এলো গো,সবেই লোকে ফুটেজ খেতে চায়?"
      " চুপ করুন বাবা,আপনি বরং রেডিওতে ভালো গান শুনুন।আমি চালিয়ে দেবো?"
      " তাই দাও মা,এইসব খবরে কেন যেন বুকের ভেতরের ঘা টা থেকে আবার রক্ত বেরোতে থাকে। বাচ্চাটাকে দেখেছো ঠিক দুবছর আগের আমাদের রাহুল।"
         গলাটা বুজে আসে যশোদার," হ‍্যাঁ বাবা দেখেছি। আপনি গান শুনুন,সেই একই তো খবর এখন বরং থাক।"
                 রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে তোমারও অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই।কোথাও দুঃখ,কোথাও মৃত‍্যু,কোথা বিচ্ছেদ নাই।
        যশোদা ময়দাতে জল দিয়েছে আলু চচ্চড়ি বসিয়ে। ছেলেমেয়েদের ভীষণ পছন্দ লুচি আর সাদা আলু তার মধ‍্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছোটছেলে রাহুলের। রান্নাঘরে লুচি ভাজার গন্ধ পেলেই হলো প্লেট নিয়ে হাজির,মাম্মা লুচি দাও।
                যশোদা দেখে দেখে ফুলকো লুচিগুলো দেয় ওকে,খেতে না পারলে নিশা একদম খাইয়ে দেয় ভাইকে। নিশা আর নীল বেশ কিছুটা বড় হয়ে যাওয়াতে পুরো আধিপত্য এখন এই কুচোটার বাড়িতে।
             ইশ্,ময়দাতে কতটা জল ঢেলে ফেলেছে বার বারই চোখে ভেসে আসছে ছবিটা।সকাল থেকেই আজ যেন একটা কান্না পাওয়া দিন। গতকাল আবার কিছুটা ঝড়বৃষ্টি হয়েছে,নিরীহ কয়েকটা প্রাণও গেছে।তার মধ‍্যে এই খবরটাই বারবার আহত করছে যশোদার মাতৃত্বকে।
           মনে করিয়ে দিচ্ছে দুবছর আগের একটা দিনের কথা। ওর শাশুড়িমা তখন বেঁচে,শান্তনুই প্রথম খবরটা এনে যশোদাকে দিয়েছিলো.." বুঝলে তোমার রাইবাঘিনী আর নেই,যশোদা সেই যে সে পালিয়েছিলো তোমার কথা না শুনে একেবারেই চলে গেলো।"
         শাশুড়িমা লুটিয়ে পড়েছিলেন কান্নায়।যশোদা হারিয়ে গিয়েছিলো বিন্দু বিন্দু মেঘভাঙা কান্নায়। ওর সেই আদরের ননদ,শান্তনুর চেয়ে অনেক ছোট,যশোদাই তো এই বাড়িতে এসে মানুষ করেছিলো তাকে।তার সব বায়নাই সামলাতে হত যশোদা আর শান্তনুকে। কলেজে পড়তে পড়তে কেমন যেন পাল্টাতে লাগলো কি একটা গোপন করছে মনে হত যশোদার।
         " টিকলি তুই আমার ছোট বোন থেকে সত‍্যিই এবার রাইবাঘিনী হয়ে গেছিস এবার। কিছু বললেই একদম খাই খাই করে তেড়ে আসিস কেন?"
     " আচ্ছা আমি কি বড় হইনি? সব সময় তোমার পারমিশন নিয়ে সব করতে হবে? কোথাও যাবো বললেই মা বলে বৌমাকে বলে যাবি।"
         " যেতেই হবে আমাকে বলে,মা তো আমাকেই তোর লোকাল গার্জেন করেছে। মা আর সামলাতে পারছেনা তার সুন্দরী মেয়েকে।"
          অদ্ভুত বিচ্ছিরি ভাবে কথা বলেছিলো টিকলি," শোন আমি এই বাড়ির মেয়ে আর তুমি বৌ,আমার অধিকার আছে নিজের মত চলার।"
          অপমানিত হয়েছিলো যশোদা তবুও বলেছিলো," টিকলি আমি অনেক বড় তোর থেকে এইভাবে কথা বলিসনা। শাসন আমি তোমাকে করবোই তা তোমার যতই রাগ হোক। ভালোবাসি তাই শাসন করি।"
          টিকলিকে জড়িয়ে ধরেছিলো যশোদা রেগে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছিলো টিকলি।
                তারপর একদিন হঠাৎই বাড়ি ছেড়েছিলো

Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।