Skip to main content

বাসা

ফোনটা খুলতেই একটা ছোট্ট নোট পায় রাজ,একটু অবাক হয় এত সকালে মা আবার কী মেসেজ করল? ঘুম থেকে উঠেই তো মাকে না দেখলে ওর দিনই শুরু হয় না। কখন কী খাবে? কোথায় ওর জিনিসপত্র সবই মা হাতের কাছে গুছিয়ে দেয় বরাবরই। সেখানে একটা ছোট্ট নোটস লেখা,' বাবু আজ একটু ম‍্যানেজ করে নে আমি একটু দরকারে বেরোলাম। চাবি আমার কাছে আছে।'
  কী জানি কোথায় এমন দরকার পড়ল যে সাতসকালে মাকে বেরোতে হল। এখন কে ওকে সকালে গরম জলে লেবুর রস দেবে? তারপর আমন্ডের খোসা ছাড়িয়ে,ওয়ালনাট ভেজানো হাতের কাছে ধরবে?
  মনটা একটু তেঁতো হয়ে গেলেও নিজেকে সামলায় রাজ। মায়ের কথা মনে পড়ল আবার..' বড়ো হবি না নাকি কখনও? আমি কী চিরকাল থাকব? সবসময় খালি মা আর মা। এত বড় ছেলেকে সব গুছিয়ে দিতে হয়। ওহ্ আর পারি না বাপু। তোর কাজ সারাদিন সারতে সারতে আমি হাঁপিয়ে উঠি। ঘরটার কী অবস্থা করে যাস খেয়াল আছে? আর কত জ্বালাবি আমাকে? ভুলে যাস বোধহয় আমিও একটা মানুষ।'

   মায়ের রাগ হয়েছে বুঝতে পারে রাজ,অবশ‍্য এমন রাগ মাঝেমধ‍্যেই মায়ের হয়। তখন একপ্রস্থ চ‍্যাঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় করে। ছোটবেলা থেকেই এমন দেখে এসেছে মাকে। তখন মা রাগ করে বকলে ওর কান্না পেত,চোখে জল আসত। কাঁদলে মা বকত,' ছেলেদের কাঁদতে নেই বলেছি না। একদম কাঁদবি না, অন‍্যায় করেছিস তাই বকছি। তুই কী একটুও আমাকে বুঝবি না?' এভাবেই দুজনে দুজনকে বুঝেই আর দুজনের মুড সামলে কেটে গেছে এতগুলো বছর।
এখন মাকে আরেকটু বেশি খামখেয়ালি লাগে ওর। গুগল থেকে জেনেছে কিসব হরমোন টরমোনের ব‍্যাপার এসব। মায়ের মাঝেমধ‍্যেই মুডসুইং হয়। কখনও ওকে বকতে বকতে ভ‍্যা করে কেঁদে ফেলে। তখন ওকেই স্বান্তনা দিতে হয়। মা বাচ্চাদের মত বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদে,' আমার সারা জীবনটা এভাবেই কেটে গেল। তোরা কেউ আমাকে বুঝিসনা। কখনও আমার কথা ভাবিস না। ঐ একটা মানুষ আমার ঘাড়ে তোকে চাপিয়ে চলে গেল আর তারপর থেকে চলছে...'
    এই কথা কতবার যে মায়ের মুখে শুনেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। ছোটবেলায় চুপ করে শুনেছে,কখনও ঐ একটা মানুষের অপদার্থ ছেলে হওয়ার অপরাধে বা ঐ বদমাশ লোকটার মতই হওয়ার জন‍্য মায়ের যত রাগ পড়েছে ওর ওপরে। চুপ করে মারধোরও হজম করেছে কখনও।
 অথচ ঐ বদমায়েশ লোকটার প্রেমে পড়ে মা ভুলেছিল সমাজ,সংসার এমনকি ভুলেছিল মা বাবাকেও। তারপর ভালোবাসা ফিকে হয়েছিল একটা সময় মা বুঝতে পেরেছিল ভুল আর তবে ঐ ভুলের মাশুল হিসেবে আমি নামক অপদার্থ তততক্ষণে পৃথিবীতে চলে এসেছি। তারপর যা হয়,আমি ঐ বদমাইশ লোকটার দান হলেও মা ঐ লোকটাকে আর তার ঘর ছাড়লেও ছাড়তে পারেনি আমাকে। ট‍্যাকে বেঁধে ছেলে নামক আবর্জনাটাকে তুলে নিয়ে এসেছিল কয়েক বছরের সংসারাবাস থেকে। মায়ের চিৎকার বকাঝকাতে কোন সময় নিজেকে সেটাই মনে হত ওর। একদিন বলেও ফেলেছিল সে কথা..' সবসময় এত বকা,মার না দিয়ে আমাকে মেরে ফেল মা তোমরা। আমি বেঁচে যাই। তোমরা সবসময় তোমাদের দুঃখের কথা ভেবেছো। কখনও কী ভাবো আমাকে কী যন্ত্রণা নিয়ে বাঁচতে হয়? তোমাদের ইগো,তোমাদের সমস‍্যা,ঝগড়া আর আমার বদমাইশ বাবা আমার জীবনটা নরক করে দিয়েছে। সবাই কী সুন্দর মা,বাবার সাথে থাকে। আমাকে বন্ধুদের কাছে,স্কুলে কত কী শুনতে হয়। আমাকে মেরে ফেলো মা।'
   কথাগুলো বলে কাঁপছিল রাজ উত্তেজনায়। আরও কিছু চড় থাপ্পড় জুটেছিল কপালে সত‍্যি কথাগুলো বলার জন‍্য। ওর মরে যাওয়ার কথায় খুবই কষ্ট পেয়েছিল মা। অনেক কেঁদেছিল।
    তারপর রাগ কমে গেলে মা আবার নিজেও প্রচুর কান্নাকাটি করে জড়িয়ে ধরে বুকে আদর করেছে। তখন অভিমানে ওর চোখ ভরেছে,কিন্তু আর কিছু বলেনি।
       রাজের মা অনু সেই ঘটনার পর থেকে একটু চুপ করে গেছিল। হঠাৎই বুঝেছিল ছেলে বড় হয়ে গেছে এখন প্রতিবাদ করতে পারে। আজ মরে যাবার কথা বলে ফেললো কেন এভাবে? তাহলে কী ভেতরে ভেতরে ওরও কষ্টের পাহাড় জমছে ওর নিজের মতই? 
      নিজে একটা ছোটখাটো চাকরিও করে অনু,আর বাবার দেওয়া কিছু টাকাতে ওদের চলে যায় মোটামুটি। যদিও টাকাটা ও কিছুতেই নিতে চায়নি তবুও বাবা জোর করে দিয়েছিলেন এই বলে যে এই টাকাটা ওর বিয়ের জন‍্যই রাখা ছিল। যেহেতু বিয়েতে কোন খরচ হয়নি তাই টাকাটা উনি ওকেই দেবেন। এছাড়া মা কিছু গয়নাও দিয়েছিলেন। সেগুলো নাকি ওর জন‍্যই রাখা ছিল। সব মিলিয়ে চলে গেছে এতগুলো বছর কখনও টেনেটুনে কখনও ভালো করে। রাজের বাবার মারধোরও খেয়েছে একটা সময় ঐ টাকার জন‍্যই। তখন যদি বাবার দেওয়া টাকাগুলো ওর হাতে থাকত তাহলে সেগুলোও লুটপাট করত ঐ লোকটা। একটুও ছিটেফোঁটা সহানুভূতিও জাগে না আর আজকাল লোকটার ওপর। ভালোবাসার মিঠাস মুছে গেছে সেই কবেই অত‍্যাচারের গভীর ক্ষততে। প্রথম দিকটা ছেলের সাথে দেখা করতে আসত মাঝেমধ্যে। তারপর আর আসেনি,কারণ ততদিনে নতুন সংসার ফেঁদেছে লোকটা। এমন লোকের আবার বিয়েও হয়? সত‍্যিই পুরুষ মানুষ বড় দামি এই পৃথিবীতে!

     মা ছেলের সংসারে মান অভিমান,ঝগড়া,শাসনের মাঝে ভালোবাসা আর কর্তব‍্যের টানাপোড়েনের মাঝে হঠাৎই অনুর জীবনে এলো এক দখিনা বাতাস। বুঝতেই পারেনি প্রথমে একটু কথা আর সহানুভূতির বাতাস কখন দখিনা বাতাস হয়ে মন জুড়োবে তার শ্রান্ত,ক্লান্ত জীবনে। 
সেদিন অনেক রাতে মেসেজ এসেছিল দিল্লী থেকে আসছেন ওদের সুপারভাইজার আর তাকে রিসিভ করতে অনুকেই যেতে হবে এয়ারপোর্টে কারণ যার যাওয়ার কথা ছিল সে হঠাৎই তার মা অসুস্থ হয়ে পড়াতে যেতে পারছে না। তাই রাজকে একটা ছোট নোট লিখে সকাল সকাল রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অনু। আর সত‍্যিই সেদিন ছেলের জন‍্য কোন কিছুই রেখে যেতে পারেনি তাড়াহুড়োয়। একটু খারাপ লাগলেও পরে ভেবেছে শিখুক নিজেরটা নিজে করে নিতে। অনেক বড় হয়ে গেছে এখন,একটা চাকরিও করছে সুতরাং এবার নিজেকে সামলাতে শেখা জরুরী। আর নিজেকে সামলাতে তো শিখেছে বেশ,এখন কত বন্ধু,বান্ধবী হয়েছে। তাদের সাথে ঘুরছে,বেড়াচ্ছে,পার্টি করছে। কখনও সেই পার্টি থেকে ফিরতে রাতও হয়ে যায়। এই নিয়ে অশান্তিও হয়েছে কয়েকবার অনুর সাথে। ছেলের মুখের থেকে সেই গন্ধটা পেয়ে প্রথমদিন খুব চিৎকার করেছিল অনু..' আর কী রক্ত তো কথা বলবেই? যেই নিজের হাতে টাকা পেয়েছিস ব‍্যাস শুরু হয়ে গেছে তাই তো..আর কী এবার থেকে প্রতিদিন এগুলো খেয়ে আয়। হে ভগবান কার জন‍্য আমি এতদিন এত কষ্ট করলাম?'
     মেজাজ হারিয়েছিল রাজও,' মা প্রতিদিন এত ঝামেলা আর ভালো লাগে না। তুমি কথায় কথায় বাবার সাথে আমার তুলনা কর কেন বলত? আমি কী মাতাল? আজ সুফিয়ার বার্থডে ছিল তাই সবাই একটু আনন্দ করল। মা ঐ ব‍্যাকডেটেড মেন্টালিটি এবার ছাড়ো। একটু আধটু ড্রিংক অকেশনালি এখন সব ছেলেমেয়েরা করে। এত রিজিড হলে তো মুশকিল।'
     রাতের মত অশান্তি থেমেছিল,সরি বলেছিল রাজ। কিন্তু বন্ধুবান্ধব আর পার্টি ছিল আগের মতই। একটু সংযম দেখিয়েছিল ছেলে। আর অনু নিজেকে শান্ত করেছিল ওর বন্ধুরা বুঝিয়েছিল ছেলে বড় হয়েছে। এত খিচখিচ করলে আরও বিগড়ে যাবে। 
    আজকাল মনে মনে অনেক একা হয়ে গেছিল অনু। মাঝেমধ‍্যেই হঠাৎই একলা হয়ে গিয়ে কান্না করা মনে অনেক কথা জমছিল। একা একা কতই না চোখের জল ফেলত। আর কিছুটা দূরত্ব বাড়ছিল মা আর ছেলের। আগের মত আর মা ছেলের আদুরে গল্পগুলো কমছিল,ছেলে কাজ থেকে ফিরে এসে ব‍্যস্ত হত ফোনে। বাইরের মানুষের সাথে সময় কাটিয়ে তেমনভাবে সময়ই পেত না মায়ের মনের খবর নেবার। ঐ খাওয়ার টেবিলে অল্প কিছু কথা। অনু ভাবে ভাগ‍্যিস একটা চাকরি করত কে জানে নাহলে কী করে সময় কাটাতো কে জানে?
  তবে কাজের জায়গাতে সত‍্যিকারের বন্ধু কজন পায়? আর দুঃখের কথাও সবার সাথে শেয়ার করা যায় না,অনেকেই শোনে পরে সেগুলো খবর হয়ে যায়।
        অন‍্যদিনের থেকে সকালে একটু বেশিই পরিপাটি হয়ে বেরিয়েছিল অনু,ওর পছন্দের উড়িষ‍্যার তুঁতে হলুদ টেম্পল পাড় শাড়িটাই বেছেছিল আজকের জন‍্য..লম্বা চুল ভালো করে আঁচড়ে ক্লিপ করেছিল। চোখে দিয়েছিল আইলাইনারের ছোঁয়া আর ঠোঁটে লিপস্টিক। শুনেছে ভদ্রলোক প্রবাসী বাঙালী,এমনিতে অন কল মিটিংয়ে কথা হলেও সামনাসামনি আজ প্রথম। তাই আজ শাড়িই পরল,অফিসে যাবার সময় তাড়াহুড়ো করে সবসময় শাড়ি পরা হয়ে ওঠে না তবে শাড়িতে ওকে বেশি সুন্দর লাগে এমন কমপ্লিমেন্ট ঘরে বাইরে সবাই দেয়।
             অনু গাড়ি চালাতে পারে,নিজে একটা গাড়িও কিনেছে অনেকদিনই। একটা জেদ চেপে গিয়েছিল নিজেকে ভালো রাখার,তবে হয়ত চাইলেও মানুষ সবসময় ভালো রাখতে পারে না। মন যে বড় অভিমানী, ঘুরে ফিরে পুরোনো কথাগুলো ফিরিয়ে মন খারাপ করায়। কিছুই যেন ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে না। হাল্কা গান চালিয়ে দিয়েছে,কলকাতার ভোরটা বেশ সুন্দর তবে ওর দেখার সৌভাগ্য কম হয়..অত ভোরে উঠতে পারে না আর উঠেই শুরু হয় ছোটাছুটি। অফিস থেকে গাড়ি দেবে বলেছিল,অনু নিজেই আপত্তি করেছে..গাড়ি আসা মানেই বারবার ফোন আসবে। ছেলেটা কালও রাতে ফিরেছে তাই মুখোমুখি কথা হয়নি নোট রেখে দিয়েছে একটা।
           অনু অপেক্ষা করছে এয়ারপোর্টের বাইরে,ভদ্রলোককে ছবিতে দেখেছে তাই চিনতে অসুবিধা হয় না,সামনে গিয়েই দাঁড়ায় একেবারে। 
-' আই অ্যাম অনুমিতা হেয়ার টু রিসিভ ইউ স‍্যার।'
   কাঁচা পাকা চুল কপাল পর্যন্ত ছড়ানো,মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরা মুখটাতে হাসি ছড়িয়ে পড়ে..' আমি সুন্দর বাংলা বলতে পারি,আপনি আমার সাথে বাংলাতেই কথা বলুন। মায়ের ভাষা ভোলা কী এত সহজ? কিন্তু আমি শুনেছিলাম আরেকজনের কথা..'
-' রাতে হঠাৎই প্ল‍্যান চেঞ্জ হয়েছে,ওনার একটু সমস‍্যা তাই আমি..'
  গাড়িতে এসে অনু পেছনের দরজা খুলে দেয়,ওকে সামনের সীটে বসতে দেখে একটু অবাক হন ভদ্রলোক..'আপনি ড্রাইভ করবেন?'
-'হ‍্যাঁ,ওরা বলেছিল গাড়ি অ্যারেঞ্জ করবে,আমি আর রাতে ওদের সমস‍্যায় ফেলিনি। নিশ্চিন্তে চলুন,কোন অসুবিধা হবে না মনে হয়।'
  অনু হাসে একটু জোরেই তারপরেই নিজেকে সংযত করে। সারা রাস্তা টুকটাক কথাবার্তা হয়,তারপর উনাকে হোটেলে পৌঁছে ছাড়া পায় না অনু এক কাপ চা খেয়ে আসতেই হয়। তার সাথে হয় কিছু টুকরো কথা। কথাবার্তা বেশ ভালো ভদ্রলোকের কোন ইগো নেই মিঃ সৌজন‍্য সেনের। বরং নামের সাথে মিলেমিশে সৌজন‍্য বোধটা একটু বেশিই। ভালো লাগে কথা বলতে অনুরও,ভদ্রলোক বেশ মজার মজার কথা বলেন। তাই অনেকদিন বাদে অনেকটা হাসলো অনু..আর কথার শেষে একটা কমপ্লিমেন্ট পেল .. 'আ লেডি উইথ বিউটিফুল স্মাইল মেকস মাই ডে,থ‍্যাঙ্ক ইউ।'
   অনুর হৈমন্তিক সৌন্দর্যে একটু লালচে আভা যোগ হল,হাসলো ও। এই কথাটা কাউকে বললে বলবে ভদ্রলোক ওকে ফ্লার্ট করেছেন..তাই ফেরার সময় গানটা আরেকটু জোরে করে দিয়ে ফিরলো অনু,গাড়িতে এখনও ভদ্রলোকের পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে।
     অফিসে যাওয়া আছে সুতরাং বাড়ি এসে হুটোপুটি শুরু করল,ছেলেকে প্রথমে একটা ফোন করল। প্রথমবার রিসিভ করল না তারপর আবার কলব‍্যাক করল। কিছু টুকরো অভিযোগ হল,তারপর জিজ্ঞাসা। অনু বললো কাকে আনতে গিয়েছিল। ওপার থেকে আওয়াজ এল তোমাকেই যেতে হল? উপায় ছিল না রে। ও আচ্ছা।
   অনু ব‍্যস্ত হয়ে পড়ল অফিসের জন‍্য। আজ তো মিটিং আছে,সবাই থাকবে। তাই ঠিক করল শাড়িই পরবে। পছন্দের সমুদ্র নীল নতুন ক্রেপ শিফনটা বের করে রাখলো। তারপর নিজেকে গুছিয়ে রেডি হয়ে বেরোলো,চুলটা বান দিয়ে খোঁপা করে নিল। যা গরম পড়েছে!
   অফিসের মিটিংয়ে স‍্যার একটু বেশিই অ্যাটেনশন দিচ্ছিলেন অনুদিকে তাই না? আরে তাই তো স‍্যারকে আনতে চলে গিয়েছিল গাড়ি চালিয়ে। বুদ্ধি আছে বাপু তোরা যাই বলিস না কেন?
  আনাচে কানাচে এমন অনেক কথা হল। কিছু অনুর কানে এল,কিছু হাওয়াতে ভাসলো। কিন্তু আরেক বসন্তের হাওয়া বইলো হঠাৎই অনুর জীবনে। আজকাল অনুর ফোনে প্রায়ই আসে সৌজন‍্য সেনের মেসেজ। একটা সময় কাজ আর পরিবারের নানা দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে কখন যে বয়েসটা পঞ্চান্ন পেরিয়ে ষাটের দিকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটেছিল বুঝতেই পারেননি,এই শীত আসছে আসছে এমন সময়ে হৈমন্তিকা অনুমিতার সাথে কথা বলতে ভালো লেগেছিল।
   সৌজন‍্য মুম্বাইয়ে ফিরে যাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে বছর খানেক,তবে এই বছর খানেক সময়ে আরও দু তিনবার এসেছেন কলকাতায়। কখনও কাজে আবার কখনও শুধুই অনুমিতার সাথেই দেখা করতে।
     অনুমিতার অকাল চঞ্চলতা ধরা পড়ে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন বাদে ছেলের কাছেও। গোপনে কথা বলা আর দেখা করার গল্প বেশিদিন গোপন রাখতে পারেনি।
 -' কে এই ভদ্রলোক? তোমার সাথে তার কিসের সম্পর্ক?'
 সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেছিল ছেলে।
-' আমরা বন্ধু,আমার খোঁজ খবর নেন। আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।'
-' তোমার তো অনেক বন্ধু আছে মা,তবে ইনি মনে হচ্ছে স্পেশাল কেউ। আমার তো মনে হচ্ছে ইউ আর ইন লাভ।'
চিৎকার করে উঠেছিল হঠাৎই অনু,' কি বলছিস?'
-' ঠিকই বলছি মা,আমি কেন সবাই বলছে। তোমার বডি ল‍্যাঙ্গুয়েজ বলছে। আমি তোমাকে সবচেয়ে কাছে থেকে চিনি।'
 কেঁদে ফেলে অনু,' কিচ্ছু চিনিস না,মায়ের সাথে কটা কথা বলিস সারাদিন? বাড়িতে এলেও সেই ফোনেই থাকিস। আমার শরীর মন খারাপ হল কিনা খবর রাখিস?'
-' না আমি কিছু রাখি না,অথচ একসময় তুমিই বলতে আমি তোমার সব। এখন তো আমাদের মধ‍্যে অলরেডি একজন এসে গেছে। সকালে বেরিয়ে যাচ্ছো। ছুটির দিন বাইরে কাটাচ্ছো।'
-' তুই বেরোস না? আমি একা একা বাড়িতে থাকি। আমি বেরোলেই দোষ?'
-' তুমি আমার মা,মায়েরা বাড়িতেই থাকে। নিজের বয়েসটা একবার ভাবো।'
-' তাই নাকি? আমার বয়েস হয়েছে আমি জানি। তাই বলে তুই আমাকে কোন কাজে হেল্প করিস? সব আমাকে একা করতে হয়। আমার মাঝে মাঝে ভীষণ একা লাগে,দমবন্ধ লাগে। ওর সঙ্গে কথাই তো বলি একটু।'
-' কথা শুধু কেন? আরও এগোও..'
কানে চাপা দেয় অনু.' মানে?'
'মানে বিয়ে করে নাও,শুধু বদনাম বাড়াচ্ছো কেন?'
  কিছুদিন একদম চুপ হয়ে যায় অনু। সৌজন‍্যর সাথে কথাবার্তা একদমই বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ছেলের সাথে তেমন দূরত্ব কমে না। শুধু নিজেকে গুটিয়ে একটা অদ্ভুত অন্ধকারে ডুবে যায়। সারা বাড়ি জুড়ে একটা গুমোট ভাব আর মনকেমনের ঘোর আঁধার। যেন যন্ত্রদানব চালাচ্ছে বাড়ি।
 অবাক হন সৌজন‍্য, কিছুতেই অনুর সাথে যোগাযোগ না করতে পেরে কলকাতায় চলে আসেন একদিন হঠাৎই। সেদিন ছুটি ছিল তাই অনুমিতাকে বাড়িতে পাবেন বলেই কলিংবেলে হাত রাখেন। 
  কিন্তু অনুমিতার বদলে দরজা খোলে রাজ,চোখ কচলাতে কচলাতে। মুখটা সৌজন‍্যর চেনা,তবে এই প্রথম মুখোমুখি হওয়া। তাই কোন ভনিতা না করেই প্রথমেই বলেন,' অনুমিতা আছে বাড়িতে? আমি ওর অফিসে কাজ করি একটু ডেকে দিলে ভালো হয়।'
 ইচ্ছে করেই নামটা বলে না সৌজন্য। যাক,তবু ছেলেটা ঢুকতে দিয়ে বসতে দিয়েছে। অশান্তির কথা একটু হলেও তাঁর জানা।
  অনুকে দেখে দুজনেই চমকে ওঠেন। এ কোন অনুমিতাকে দেখছেন? এই কয়েকদিনে কেমন যেন ভেঙেচুরে গেছে অনুমিতা,হয়ত বা অসুস্থও।
  -' কী হয়েছে তোমার? কোন খবর পাচ্ছি না। একি চেহারা করেছো?'
 অনুমিতা সোফায় বসে প্রথমে মুখটা ঢাকে,কিছুটা সময় মাথা নিচু করে সোফাতে বসে তারপর বলে,' তুমি এখানে কেন? আমি তো বলেছি আমি কোন কথা বলতে চাই না।'
  -' কিন্তু আমি চাই,এভাবে তোমাকে শেষ হয়ে যেতে দেখতে ভালো লাগছে না।'
-' বয়েস হয়েছে,আর আমার দায় দায়িত্ব প্রায় শেষ এখন শেষটাই তো ভালো।'
 সৌজন‍্য অনুমিতার হাতটা ধরেন,' শেষ হতে না দিয়ে যদি যা আছে বেঁচে সেটুকু দিয়ে আমরা..'
-' বাহ্ দারুণ রোমান্টিক সিন চলছে তো..আপনি সেই? আগে বলবেন তো,তাহলে তো ঢুকতেই দিতাম না। এক্ষুণি বেরিয়ে যান এখান থেকে।'
-' এসব তুমি কী বলছ! অনু তোমার কত প্রশংসা করে,কত ভালোবাসে তোমাকে।'
-' হ‍্যাঁ সে তো দেখতেই পাচ্ছি,আসলে সবাই স্বার্থপর। নিজেরটাই বোঝে।
  ওদের কথার মাঝে কখন যে ছেলে এসেছে ওরা বুঝতে পারেনি।
অনুমিতা আর পারে না,এতদিনের চেপে থাকা রাগ আর দুঃখ সব বেরিয়ে আসে,' আর কবে নিজের স্বার্থ দেখব বলতো? তাই ভাবছি এবার স্বার্থপরই হব। যতই করো সবার জন‍্য এটাই শুনব তা তো জানাই।'
 ওকে পাত্তা না দিয়ে ছেলে বলে,' এই যে আপনি বসে নাটক দেখছেন কেন? আমাদের মা ছেলের ঝামেলায় আপনার কোন দরকার নেই,উনি এখন অনেক কিছু বলবেন। আপনি যান এখন,প্লিজ যান। নাহলে আমি পাড়ার বন্ধুদের ডাকব।'
 -' এসব কী বলছ? তোমার মাকে তুমি..'
 অনুমিতা এবার উঠে দাঁড়ায়,' তুমি যাও এখন,চিন্তা কোরনা অনু এত সহজে মরবে না। আমি তোমাকে ফোন করব..কাল তোমার সাথে দেখা করব।'
  সেদিনটা ভীষণ খারাপ যায় অনুর,একটার পর একটা কথা বলে রাজ। অনু কোন উত্তর দেয় না,কথাও বলে না। কোথায় যেন রাজের মনে হয় মা খুব একটা শক্ত সিদ্ধান্ত নেবে। মায়ের এই চুপ করে যাওয়াকে একটু হলেও ভয় পায় রাজ।
  কদিন কথা বন্ধের পর,দিন সাতেক বাদে অনু বললো সে সৌজন‍্যকে বিয়ে করবে এবং সৌজন‍্যর কাছে গিয়েই থাকবে। রাজকে তার প্রয়োজনে সব সাহায‍্য করবে এবং রাজের যে বান্ধবী আছে তাকে সে যদি জানাতে চায় তো জানাতেও পারে মায়ের বিয়ের কথা। দিন পনেরো বাদেই তাদের বিয়ে। এবাড়িতে রাজ যেমন আছে তেমনি থাকবে। এই দমবন্ধ জীবন সে আর নিতে পারছে না। প্রথমে চুপ থাকলেও যথেষ্ট বাজে কথা বলে রাজ তারপরে দুজনেই চুপ করে যায়।
------------------------
আগামীকাল রবিবার খুব ভোরেই বেরিয়ে যাবে অনু,সৌজন‍্যর কলকাতা আসছে আজই। অনুর কাছে বিয়েটা লজ্জার হলেও তার কাছে আনন্দের,তাই তার অনেক প্ল‍্যান হেমন্তের রঙীন সন্ধ‍্যাটাকে ঘিরে। এই কদিন নিজেকে অনেকবার ভেঙেছে আর গড়েছে অনু। কত চোখের জল বয়েছে,তারপর আবার ভেবেছে ছেলে তো চিরকাল তার থাকবে না,তারও তো বিয়ে হবে। আর রাজের সাথে কোথাও একটা বিচ্ছেদের পাঁচিল অনেকদিন গড়ে উঠেছে যা বুঝতে পারেনি অনু। সে আর তেমন করে মাকে চায় না,কোথাও একটা আলাদা হবার গল্প গড়ে উঠেছিল অনেকদিনই ওর অজান্তেই।
ভোরবেলা উঠে নিজে তৈরি হয়ে বাবা মায়ের ছবিতে প্রণাম করে ছেলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। কদিন রোজই রাত্রি করে ফেরে রাজ,নিজেই দরজা খুলে ঢোকে। বেশিরভাগ খাবার খায় না,কালও খায়নি। তেমনভাবে আর কথাও বলে না মায়ের সাথে। যদিও যান্ত্রিকতাকে বন্ধু করে দুজনেই যেন একটু একটু করে অভ‍্যস্ত হয়ে উঠেছিল নিজেদের যান্ত্রিক জীবনে।

       বেশ অনেকটা বেলায় ঘুম ভাঙে রাজের,সে জানতো আজ তার জীবন থেকে মা নামক ডাক হয়ত মুছে যাবে চিরকালের মতই। বাবা মা দুজনেই স্বার্থপর,কেউই তার কথা ভাবেনি। একথাটাই বারবারই তার মনে হয়েছিল এই কয়েকদিন এবং দুজনেই তার কাছে ঘৃণার‍। মাও নিজের দরকারেই তাকে ব‍্যবহার করেছে।
 আসলে মানুষ যখন কাউকে অপছন্দ করতে শুরু করে তখন সে কেবলই নিজের কথাটাই ভাবে। সে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত? সে কী পায়নি ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। উল্টোদিকটা রাজের কখনও ভাবতে ইচ্ছে করে না মা এতদিন কিভাবে তাকে আগলে বড় করেছে? মায়েরও কিছু ইচ্ছে আর চাওয়াপাওয়া থাকতে পারে..মা মানে কোন জড় পদার্থ বা রোবট নয় যে মাতৃত্বের দায়িত্ব কর্তব‍্যই সামলে যাবে আজীবন।
       কাজের বৌকেও সে ফিরিয়ে দিয়েছে আজ,ও শুনতে না চাইলেও মা বলেছিল বহু পুরোনো যমুনা মাসি ওর রান্নাবান্না সব করে দেবে। 
   সময়ের গাঢ় অন্ধকার চারদিক দিয়ে যেন ঘিরে ধরেছে ওকে..একসাথে ভেঙে যাচ্ছে দুটো সম্পর্ক। বেশ কিছুদিন হল সুফিয়া ওর সাথে কথা বলে না,দেখাও করে না। তাই কাল ওদের বাড়িতে গিয়েছিল,সেখানে গিয়ে অবাক হয়েছিল ওর পুরোনো বয়ফ্রেন্ডের সাথে ওকে দেখে। ছেলেটা নাকি স্টেটসে সেটল করবে। ছবিটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল। রাজের মনে জমে আছে শুধু ঘেন্না ও সবাইকে ঘেন্না করে..

    ঘরভর্তি নেশার সরঞ্জাম ছড়ানো,বাড়িতে বসে যা খুশি করতে ইচ্ছে হয়েছে ওর। আজ আর কেউ বাধা দেবার নেই,নিজেকে ওপারের ঠিকানায় পৌঁছনোর ব‍্যবস্থাও সে করে রেখেছে। আর কারও গলগ্ৰহ আবর্জনা হয়ে সে বাঁচতে চায় না। তাছাড়া কেউ তো তাকে ভালোবাসে না,সুতরাং বেঁচে থেকে কী লাভ? বাপ তো সেই কবে তাকে ছেড়েছে,মা এতদিন নিজের সিকিউরিটি বাবদ ওকে রেখেছিল কাছে।
 চিৎকার করে ওঠে রাজ..' বাঁচো সবাই বিন্দাস বাঁচো। পথের কাঁটা আপদ এবার বিদায় হবে।'
    সিলিং ফ‍্যানটাতে ফাঁসটা ভালো করেই আটকানো হয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা..হঠাৎই দেওয়ালে মায়ের গলা জড়ানো ওর ছবিটা নজরে পড়ে রাজের. ছুঁড়ে ফেলে দেয় মাটিতে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে কাঁচগুলো আর সেই ঝনঝনানির মধ‍্যেই কলিংবেল বেজে ওঠে। না এখন দরজা খুলবে না কাউকেই,কিন্তু বেলটা বাজতে থাকে বারবার.. তারপরে বাজতে থাকে ফোন।
  ওহ্ আপদটাকে বন্ধ করা হয়নি,ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে মায়ের নং থেকে বারবার ফোন আসছে। ওহ্ বিদায় নিয়েও মমতার ভান্ডার খুলে বসেছে,কেন ফোন করছে?
  বাইরে থেকে এবার ভারী গলায় আওয়াজ আসে,' দরজাটা খোলো প্লিজ,তোমার মায়ের অনেক বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। না খুললে এবার আমাকে ভাঙতে হবে।'
  রাজকে দরজাটা খুলতেই হয় বাধ‍্য হয়ে,মেঝেতে ছড়ানো কাঁচে পা কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। ওকে দেখে অবাক হয়ে যান সৌজন‍্য..আধাখোলা দরজার বাইরে থেকে দেখতে পান অনুর রক্তাক্ত সংসার। ইশ্ আরেকটু বাদে এলেই বোধহয় সব শেষ হয়ে যেত। এ কোন ঘর বাঁধতে চলেছিলেন তিনি অনুকে নিয়ে?
  কোন রকমে টেনে হিঁচড়ে রাজকে ঘর থেকে বের করে আনেন। দু পা কেটে রক্ত গড়াচ্ছে।
-'আপনি এখানে কেন? আমাকে কী শান্তিতে মরতেও দেবেন না আপনারা? বলেছি তো যা ইচ্ছে করুন আপনারা। আমি আর কারও পথের কাঁটা হব না। উঃ..একটা ফালতু আবর্জনা বাজে মাল ছিলাম,যাকে আমার মা বাধ‍্য হয়ে বয়ে টেনে চলেছে এতদিন..আহ্!'
-' তুমি আমার সাথে চল,দরজা বন্ধ করতে হবে। পরে শুনছি সব।'
-' আমি কোথাও যাব না আপনার সাথে,বেরিয়ে যান।'
গলার স্বর কড়া করেন সৌজন‍্য,' যেতেই হবে,নাহলে পুলিশ ডাকব। তোমার মায়ের একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তোমাকে সেখানে যেতে হবে,সে বারবার তোমাকে ডেকেছে যতক্ষণ জ্ঞান ছিল।'
   হঠাৎই চুপ করে রাজ, অনেকদিন সে মায়ের মুখের দিকেও তাকায়নি ঘেন্নায় ভালো করে। নিজেকে,মাকে,বাবাকে সবাইকে ঘেন্না করেছে। মায়ের হঠাৎ কী হল? আজই তো বোধহয় বিয়ে ছিল। এই লোকটা এখানে কেন? কী করবে ও?
 পা ফেলতে পারে না ভালো করে রাজ,লোকটা ওকে টেনে নিয়ে গাড়িতে বসায়।
  এই কদিন একটা বিরাট ঝড় বয়ে যায় সৌজন‍্যর ওপর দিয়ে। সত‍্যিই বোধহয় ওর কপালে সংসার নেই তাই তো এই আধবুড়ো বয়েসেও আইবুড়ো নাম ঘোচেনি।
    অনুর এয়ারপোর্ট যাবার পথে সাঙ্ঘাতিক গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট,অপারেশন,ছেলের অ্যাটেম্পট টু সুইসাইড.. পায়ের পাতায় কাঁচ ফুটে একাকার কান্ড। এই কদিন একবার অনুকে আর একবার ছেলেকে দেখেছেন। তারমধ্যে রাজের কাউন্সেলিং চলছে,ওকে হয়ত বাড়ি আনা যেত ইচ্ছে করেই আনেননি। একেবারে অনু সুস্থ হয়ে উঠলে একসাথে দুজনকে বাড়িতে পৌঁছে দেবেন....
নার্সিংহোমের বাইরে বসে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে,সত‍্যিই বোধহয় কোন দরকার ছিল না ওদের মা আর ছেলের মধ‍্যে উনার আসার। ওর জন‍্যই বোধহয় দুজনেই আজ কষ্ট পাচ্ছে। ছিল তো এতগুলো বছর অনু বেশ ছেলেকে নিয়ে,আর একাকীত্ব? তাও তো মানুষের সঙ্গী,কোথাও একটা গিয়ে তো সব মানুষই একা শুধু তার ভাবনাটুকু আর শরীরটাই তখন সাথে থাকে।
---আজ অনেক কথা বলেছে রাজ ডাক্তারের সঙ্গে,এরা মনের কথা কোন ম‍্যাজিকে ঠিক বের করে নেয়। অবশ‍্য তাতে অনেক হাল্কা লাগছে ওর। শুধু অবাক লেগেছে এই কদিন তাকে মায়ের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি বলে। প্রথমটা হাঁটতে পারেনি সে নিজেই তবে তারপর যেতে চেয়েছে কিন্তু দেওয়া হয়নি,বলা হয়েছে এখন সম্ভব নয় দেখা করা। ফোনটা ওর কাছে আছে,প্রথমটা খুব সঙ্কোচ হয়েছে কতদিন মায়ের সাথে ফোনেও কথা বলেনি ও,তবুও গতকাল ফোনে চেষ্টা করেছে কিন্তু মায়ের ফোনটা বন্ধ পেয়েছে। আচ্ছা মা কী ওর সাথে কথাও বলবে না? দেখাও করবে না? এর মধ‍্যে ঐ ভদ্রলোককে এক দুবার দেখেছে,উনি তেমন কোন কথা বলেননি। দূর থেকে দেখে চলে গেছেন।
   সিস্টারের কাছে রাগ করেছে গতকাল, আজও অভিযোগ জানিয়েছে তাকে ছেড়ে দেবার জন‍্য কাউন্সিলিং করার সময়। জানতে চেয়েছে কে ওকে এখানে আটকে রেখেছ?
    পরে সবটা শুনে চুপ করে গেছে,মায়ের কোমরে হাতে,মাথায় খুব চোট আছে। সৌজন‍্য বাবু প্রতিদিনই আসেন,ওর খেয়াল রাখেন। তবে ও রাগ করবে বলে সামনাসামনি আসেন না খুব একটা। মাকে ওরা ক্রিটিক্যাল ইউনিটে রেখেছে,একটু সুস্থ হলেই ওকে নিয়ে যাওয়া হবে সেখানে। সব শেষে ডঃ বলেছেন,' তোমার মাও তোমাকে খুব মিস্ করছেন,সবাই তোমাকে ভীষণ ভালোবাসে ইয়ঙ্গ ম‍্যান..এই পৃথিবী তোমাকে চায়,ভীষণভাবে চায়। তোমার তুমির জন‍্যই বাঁচবে এবার।'
       -' আমি সৌজন‍্য বাবুর সাথে দেখা করতে চাই। একবার দেখা হবে?'
-' তুমি যদি উত্তেজিত না হও তো দেখছি..'

*********************
অনেকটা লড়াইয়ের পর একটা স্বস্তির সকাল আজ সৌজন‍্যর জীবনে,মা আর ছেলেকে মিলিয়ে দিয়ে ফিরিয়ে দেবেন আজ সকালে ওদের নিজের বাড়িতে।    ফুলের দোকানে গিয়ে ফুলের বোকেটা নিজে পছন্দ করে বানিয়েছেন অনুর জন‍্য। গাড়ির পেছনে সব কিছু গুছিয়ে রেখেছেন। মা আর ছেলেকেও এরমধ্যে মিলিয়ে দিয়েছেন নার্সিংহোমে অনেকটা অভিমান আর রাগের বাষ্প উড়ে গিয়ে দুজনেই অনেকটা হাল্কা হয়েছে দুজনের কাছাকাছি আবার ফিরে এসেছে আবার। অনু কিছুটা সেরে উঠলেও এখনও বেশ দূর্বল। গাড়িতে উঠে মা ছেলে দুজনের মনেই একটা অস্বস্তি,রাজের একটা গভীর অপরাধবোধ হয় যা অবস্থা করে এসেছে বাড়ির ইশ্ মা গিয়ে কী যে ভাববে?এমনকি ওর আর মায়ের ছবিটাও ভেঙেছে... যদিও কথাগুলো সৌজন‍্য বাবুকে বলতে পারেনি।

        রাজের হাতে চাবিটা দেন সৌজন‍্য..' তুমি দরজাটা খোলো,আমি তোমার মাকে একটু হেল্প করে দিই গাড়ি থেকে নামতে।'
    এক বুক মেঘ নিয়ে দরজা খোলে রাজ,দরজাটা খুলে অবাক হয়ে যায়..ভেতর থেকে হাল্কা একটা সুবাস ভেসে আসে। সিলিং ফ‍্যানটা পরিস্কার,কোন কিছু নেই ওখানে..মেঝে পরিস্কার। এমনকি ভাঙা ছবিটাও জায়গামত ঝুলছে।
   ততক্ষণে মা এসেছে ঘরে,উনিই মাকে ধরে বসিয়েছেন সোফাতে। ওর অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে একটু রহস‍্যময় হাসি হাসেন ভদ্রলোক..
সত‍্যি কথা বলতে জীবনে পুরুষ বন্ধু অনেক থাকলেও এই বয়েসী পুরুষ মানুষের সাথে তেমনভাবে কখনও পাশাপাশি থাকার সুযোগ হয়নি রাজের। এই কদিন ভদ্রলোককে দেখে অবাক হয়েছে আর ভেবেছে কী জন‍্য এত কিছু করছেন উনি? এমনকি ও সাঙ্ঘাতিক অপমান করা সত্ত্বেও হয়ত এই লোকটার জন‍্যই ও আবার পৃথিবীতে বেশ কয়েকটা নতুন সকাল দেখলো এই কয়দিনে।
  অন‍্যদিকে সৌজন‍্য ভেবেছেন হয়ত অনুর অ্যাক্সিডেন্ট ভালোর জন‍্যই হয়েছে একদিকে,সেদিন সেইসময় না এলে ছেলেটা! উঃ ভেবেই অস্থির হয়ে উঠছে মন। এই বয়েসে আর কী আছে জীবনে? তবুও হয়ত একটু ভালোলাগা আর ভালো থাকার আশাতে দুজনে হাত ধরতে চেয়েছিলেন দুজনের।
   ছেলের থেকে প্রত‍্যাখান আর দুর্ব‍্যবহার কখনও বা অবহেলা একলা অনুকে আরও একলা করেছিল তাই হয়ত সেও চেয়েছিল একজন পাশে থাকার কাউকে।
     ততক্ষণে একজন সিস্টার এসে পৌঁছেছেন,কিছুদিন অনুর একটু যত্নের প্রয়োজন। তাকে কিছুটা বুঝিয়ে দিয়ে সবকিছু সৌজন‍্য গাড়ির দিকে পা বাড়ান,ডিকি থেকে বের করে আনেন সেই ফুলের বোকেটা যা অনুর জন‍্য কিনেছিলেন।
  এমনি একটা বোকে তার জন‍্য অনু কিনে এনেছিল প্রথম দিনে,প্রশংসা করেছিলেন সৌজন‍্য।
-' আমার পছন্দের এই ফুলগুলো, সত‍্যিই আপনার ভালো লেগেছে?'
   আজকের ফুলের বোকেটা আরও বেশি সাজানো। অনুর হাতে ফুলগুলো দেন সৌজন‍্য,অনুর মুখটা খুবই ম্লান। একটা বড় ঝড়ে জীবনটাই যেন উল্টেপাল্টে গেছে,হয়ত বা কিছু মানুষ এমন উপকূলে ঘর বাঁধে যেখানে সব ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে।
         -' আমাকে এবার যেতে হবে অনু,আমার কাজ শেষ। আমি সিস্টারকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি,তুমি পুরোপুরি সুস্থ হলেই উনি যাবেন।'
     অনুর মন কাঁদলেও চোখ ভেজে না,এই কদিন সে অনেক কেঁদেছে,ভগবানের কাছে অভিযোগ করেছে আবার ক্ষমাও চেয়েছে যে দিনের শেষে ছেলেটা বেঁচে গেছে তার। ওর জন‍্য তো কত কিছু সয়েছে জীবনে..মা হওয়া কী মুখের কথা? বাবা বলতেন। এখন বুঝতে পারে কথাটা কত সত‍্যি.. তাই তো চলে গিয়েও আবার ফিরে আসতে হল।
   একবার ভাবলো জিজ্ঞেস করে,' আমাদের কী আর দেখা হবে না? আবার কবে আসবে?'
  তারপরই মনে পড়ে সে বারণ করেছে সৌজন‍্যকে আর না আসতে,নিজেকে সব কিছু ভুলতে সময় দিতে চায় অনু।
    সৌজন‍্য তাকান ওর দিকে,তারপর এগিয়ে যান দরজার দিকে।
-' আমাকে না বলেই চলে যাচ্ছেন? যখন খুশি আসবেন আর হঠাৎই চলে যাবেন? সবটাই আপনার ইচ্ছে?'
-' রাজ! কী বলছিস? উনি তো চলেই যাচ্ছেন। আর আসবেন না। আমি বারণ করে দিয়েছি। শুধু শুধু কেন?...'
  রাজ মায়ের কথার কোন জবাব না দিয়ে সৌজন‍্যর মুখোমুখি দাঁড়ায়..' যদি বলি আপনাকে যেতে দেব না।'
 সৌজন‍্যর মুখটা একটু কঠিন হয়,' কেন? তোমার সব বলাই আমাকে শুনতে হবে নাকি? তাছাড়া এখানে আমি থাকবই বা কেন? আমার অনেক কাজ আছে। এই কদিন কিছুই দেখতে পারিনি।'
  ভদ্রলোকের এমন করে বলাতে একটু থমকে যায় রাজ কিন্তু থামে না বলে,' আমরা কী বন্ধু হতে পারি না? আমি তো বলেছি আমার ভুল হয়েছে আগেও..'
সৌজন‍্য এবার হাসেন অনুর দিকে তাকিয়ে,' অনু ছেলেকে শুধু আদরই দিয়েছো। বড় করতে পারনি,নামেই চাকরি করে বুদ্ধিসুদ্ধি কিছুই হয়নি।'
    অন‍্য কেউ এ কথা বললে রাজ তর্ক করত কিন্তু এই মুহূর্তে ওর কেন যেন মনে হল সত‍্যিই বোধহয় বিশেষ কোন হিতাকাঙ্খী বিদায় নিচ্ছেন ওদের জীবন থেকে। বাবারা কেমন হয় ও দেখেনি তেমন করে।
   রাজ মুখটা ঢেকে চেঁচিয়ে ওঠে,' সত‍্যিই আমার বুদ্ধিসুদ্ধি নেই,আমি মাকে ছাড়া থাকতে পারি না এখনও। যদিও মাকে বুঝতেও চাইনি,অনেক কষ্ট দিয়েছি..আপনাকে সহ‍্য করতে পারিনি। কিন্তু এই কয়েকদিনে মনে হয়েছে আপনি অনেকটা...মানে অনেকটা।'
  গলাটা বুজে আসে রাজের, উত্তেজনায় কথা জড়িয়ে যায়।
 অনু বলে,' চুপ কর,ওকে যেতে দে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।'
   রাজের হাতটা ধরেন সৌজন‍্য,' বলো,মানেটা কী? কী বলতে চাইছো?'
  অনেকটা ঘৃণা যে শব্দের সাথে জড়িয়ে সেটা একপাশে সরিয়ে রাজ বলে,' অনেকটা বাবাদের মত। মানে বাবারা হয়ত এমনি হয়।'
   নিজেকে সংযত করেন সৌজন‍্য তারপর বলেন,' মন খারাপ কোরনা,যে কোন প্রয়োজনে জানিয়ো আমি আছি। আছি পাশে..'
 বুকের মধ‍্যে একদলা কষ্ট নিয়ে রাজ বলে,' আর আপনাদের বিয়েটা?'
 -' চুপ কর রাজ,ওসব কেন বলছিস?'
-' আমাকে বলতে দাও মা। আর আপনাদের বিয়েটা হবে না?'
 সৌজন‍্যর গলার স্বর গম্ভীর হয়,' না।'
-' কিন্তু কেন? আমার জন‍্য? আমিও চাই বিয়েটা হোক। সত‍্যিই বলছি।'
-'বুঝলাম,কিন্তু আমি চাই না,তোমার মাও চায় না। আর এটাই শেষ কথা। এতে তোমার কোন দায় নেই। নিজেকে অপরাধী ভেবোনা। আজ আসি,আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। ফ্লাইট ধরতে হবে।'
-' কোথায় যাবেন? আবার কবে আসবেন?'
-' অনেকটা দূরে এখান থেকে।'
-' দূরে কেন?'
হাসেন সৌজন‍্য,' অনু সত‍্যিই তোমার ছেলেকে শুধু আগলেই রেখেছো,বড় হতে দাওনি।
দূরে যাবো এইজন‍্যই যাতে তোমাদের মধ‍্যে নড়বড়ে সম্পর্কটা আবার মজবুত হয়,আমি তৃতীয় ব‍্যক্তি হয়ে তোমাদের মাঝে চলে এসেছিলাম। হয়ত বা বলতে পারো তোমাদের সুখের বাসায় আমি ছিলাম এক উড়ন্ত চিল,যে ছোঁ মেরে ছোট ছানার কাছ থেকে তার মাকে তুলে নিতে এসেছিল।'
  কথাগুলো বলেই হো হো করে হেসে ফেলেছিলেন সৌজন‍্য,রাজও হাসছিল..হাসি ফুটেছিল অনুর মুখেও।
-' কী সুন্দর কথা বলেন আপনি!'
-' হ‍্যাঁ, তা বলি,আর এই কথার জোরেই তো তোমার মায়ের মন জয় করে নিয়েছিলাম। মায়ের সাথে কথা বোলো। আসলে জানো তো,কথা হচ্ছে সম্পর্ক জোড়ার ফেভিকলের মত..কথা ফুরোলে সম্পর্কের বাঁধনও আলগা হয়। হয়ত তুমি মায়ের ছোটছোট অনুভূতিগুলো বুঝতে চাওনি বলেই মা আমার সাথে কথা বলে হাল্কা হত। কথা মনের ভার দূর করতে পারে এক নিমেষেই..জানো প্রতিদিন কত সম্পর্ক মরে যায় একটু ভালো কথার অভাবে।'

     সৌজন‍্য চলে গেছেন বেশ কয়েকদিন হল। অনুর মন আর শরীর একটু একটু করে সেরে উঠছে। আবার মা ছেলের আলগা হয়ে যাওয়া সম্পর্ক মজবুত হয়েছে কথা নামক ফেভিকলে এই কথা অবশ‍্য সৌজন‍্যের...রাজ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায় না। জীবনটাকে আরেকটু বেশি ভালো লাগে এখন কারণ ওর দু দুটো ভালো বন্ধু আছে। তবুও মাঝেমধ্যে মনটা যেন কেমন করে মায়ের জন‍্য,চুপটি করে ভাবে মা কী পেল জীবনে?
     মাকে বলতে বকুনি খেয়েছিল..' তোকে আবার কাছে পেয়েছি,তুই আর আমি যে বেঁচে ফিরেছি সেটাই বা কম কী?'


     
    
  

     


Comments

Popular posts from this blog

রীল ভার্সেস রিয়াল

বাড়ি থেকে বেরিয়ে এয়ারপোর্টে আসা পর্যন্ত সময়ের মধ‍্যেই একটা ছোটখাটো কনটেন্টের ওপর শর্টস বানিয়ে নেবে ভেবেছে পিউলি। তারপর যখন এয়ারপোর্টে ওয়েট করবে তখন আরেকটা ছোট ভ্লগ বানাবে সাথে থাকবে প্লেনের টুকিটাকি গল্প। দেশে ফেরার আনন্দের সাথে অবশ‍্যই মাথায় আছে রেগুলার ভিডিও আপডেট দেওয়ার ব‍্যাপারটা। আর এই রেগুলারিটি মেনটেইন করছে বলেই তো কত ফলোয়ার্স হয়েছে এখন ওর। সত‍্যি কথা বলতে কী এটাই এখন ওর পরিবার হয়ে গেছে। সারাটা দিনই তো এই পরিবারের কী ভালো লাগবে সেই অনুযায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েট করে চলেছে। এতদিনের অভিজ্ঞতায় মোটামুটি বুঝে গেছে যে খাওয়াদাওয়া,ঘরকন্নার খুঁটিনাটি,রূপচর্চা,বেড়ানো এইসব নিয়ে রীলস বেশ চলে। কনটেন্টে নতুনত্ব না থাকলে শুধু থোবড়া দেখিয়ে ফেমাস হওয়া যায় না। উহ কী খাটুনি! তবে অ্যাকাউন্টে যখন রোজগারের টাকা ঢোকে তখন তো দিল একদম গার্ডেন হয়ে যায় খুশিতে। নেট দুনিয়ায় এখন পিউলিকে অনেকেই চেনে,তবে তাতে খুশি নয় সে। একেকজনের ভ্লগ দেখে তো রীতিমত আপসেট লাগে কত ফলোয়ার্স! মনে হয় প্রমোট করা প্রোফাইল। সে যাকগে নিজেকে সাকসেসফুল কনটেন্ট ক্রিয়েটার হিসেবে দেখতে চায় পিউল।         এখন সামার ভ‍্যাকেশন চলছে...
প্রায় আঠেরো দিন ঘরছাড়া হয়ে আজ সকালে এক কাপ চায়ের কাপে জানলা দিয়ে দেখা সমুদ্দুরের পাড়ে থাকা সূর্যধোয়া সুইডেনের স্টকহোম শহরটাকে বন্দি করার চেষ্টা করছি...ঘরছাড়া মন হয়েছে বাইন্ডুলে এই মাঝবয়েসে। আর অবশ্যই কিছুটা ছন্নছাড়াও,কারণ খাওয়া,শোওয়া আর ঘুম কিছুরই ঠিক,ঠিকানা নেই। বঙ্গনারী এয়ারপোর্টে এসে সিকিউরিটি চেকের উৎপাতে টুক করে হাতের নোয়াখান খুলে ব‍্যাগে রাখছি,ঠান্ডাতে কাবু হয়ে কোট প‍্যান্টলুন পরে ঘুরছি এই সমস্ত সব কান্ড এর মাঝেই বেজে উঠলো ফোনখানা।  সুতরাং ফটো তোলাতে ক্ষান্ত দিয়ে মন দিলাম ফোনে,মেয়ের ফোন..এখানকার সকালবেলায়  একবার কথা হয়েছে,ঘন্টাখানেক বাদে আবার ফোন তাই বুঝলাম কোন বিশেষ দরকার। ডাক ছাড়লাম, -' হ‍্যালো,বুড়ো(আমাদের আদরের ডাক) কিছু বলবি? ওপাশ থেকে একটু লজ্জা লজ্জা ঢোক গেলা গলায় শুনলাম..' হ‍্যাঁ,মা এখন কি করছো? উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম,' শহরটাকে দেখছি রে,এমন সকাল জানি না আবার কবে হবে। অপূর্ব লাগছে রে হোটেলের জানলায় বসে শহরটা দেখতে।'  ওপাশ থেকে আবার মিহি গলায় ভেসে এল,' আচ্ছা মা চোদ্দ শাক কেমনভাবে বিক্রি হয়?'  এদেশে এসে বেড়ানোর গুঁতোতে অনেক কিছুই মাথা থেকে মিসিং,অবশ‍্য মে...

জন্মে জন্মে

চাকরির বদলি নিয়ে এক নির্জন জায়গাতে গেছেন একজন। জায়গাটা নির্জন তাই বৌকে নিয়ে যেতে পারেননি। তারপর বদলি হয়েছেন বিজয় নগরে। এখানকার মিউজিয়াম দেখাশোনার দায়িত্ব তার ওপরে।     এবার ঠিক করেছেন কুসুমকে নিয়ে আসবেন এখানে। মায়ের কাছে শুনেছেন কুসুম খুব মন মরা। কুসুমকে বিজয়নগরে আনার পরই সে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল। জায়গাটা তার ভীষণ পছন্দের। তার বায়নাতে ছুটি পেলেই সুরজ সিংকে ঘুরিয়ে দেখাতে হয় জায়গাটা।    কিন্তু পূর্ণিমার রাতে ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। কুসুমকে পাওয়া যায় না। বিজয়নগরের শুকনো চান ঘরে কলকলিয়ে ঢোকে জল। আর সেই জলে ভাসে কুসুম।     অবাক হয় সুরজ ওর সাথে কে? কেয়ারটেকার ছেলেটাকে দেখে মাথা গরম হয়ে যায়। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে।