দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আর দীর্ঘ পরিকল্পনার শেষে আমাদের যাত্রা শুরুর দিন এগিয়ে এলো। যদিও এই যাত্রাপথে হাঁটা শুরু করেছিলেন আমার কর্তা প্রায় আটমাস আগে থেকে। সঙ্গে ছিল আমাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে আমার পুত্র। প্রতিদিনই বাবা আর ছেলে সময় পেলেই বসত আলাপ আলোচনায় কিভাবে সব হবে,কোথা থেকে শুরু করে কোথায় শেষ হবে যাত্রাপথের। ভিসা কেমন করে পাবো ইত্যাদি। যদিও ইউরোপে যাওয়া এই নিয়ে আমাদের চতুর্থ বার সুতরাং ভিসা করতে কী লাগে সবই আমাদের জানা তবুও পাবো কী পাবোনা এই দোটানা থেকেই যায়।
নির্দিষ্ট সময়ে ভিসা আসার পর সমস্ত তোড়জোড় শেষে আমরা গত পয়লা অক্টোবর রওনা দিলাম নরওয়ের উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রথমে ইন্ডিগোর ডোমেস্টিক ফ্লাইট ছিল,সেখান থেকে দিল্লি এসে দিল্লি থেকে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দোহা এসে পৌঁছোলাম। দিল্লি এসে টার্মিনাল চেঞ্জ করে টি ওয়ান থেকে টি থ্রী এলাম। সেখানেই আমাদের ইমিগ্ৰেশন হল। তারপর যাত্রা শুরু। ইমিগ্রেশনের সময় আমাদের রিটার্ন টিকিট দেখাতে হয়েছিল,যে কবে আমরা ফিরছি দেশে। তবে এয়ারপোর্টে জুতো চক্করে প্রথমে একটু ভুগলাম,দেখলাম নিয়মকানুন একেক এয়ারপোর্টে একেক রকম।
দোহাতে ঘন্টা তিনেকের লেওভার ছিল,আমরা ট্রান্সফারে এসে সিকিউরিটি চেক করিয়ে একদম গেটে চলে এলাম যেখান থেকে আমাদের ফ্লাইট ছাড়বে। দোহা এয়ারপোর্ট আমার কাছে নতুন আমি এর আগে দুবাই এবং আবুধাবি আর শারজা হয়ে যাতায়াত করলেও দোহাতে কখনও আসিনি। তবে দোহাতে এসে সত্যি মুগ্ধ হলাম,ঠিক যেন মনে হল সুন্দর প্রকৃতি দিয়ে সাজানো এক শান্তিপূর্ণ এয়ারপোর্ট। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পাখি ডাকছে ভীষণ ভালো লাগলো। কিছু সময় কাটলো ঘোরাঘুরি করে এদিক ওদিক,নজর কাড়লো ব্রোঞ্জের বিশাল আকৃতির সিংহমশাই। একটু এগিয়ে দেখলাম পশুরা বসেছে ভোজনে,সামনে খাবারদাবার আর পানীয়। যেহেতু প্রথমবার দেখছি তাই আমি ছটফটে হয়ে উঠলাম আর মনটাকে কিশোরী করে ঘুরে বেড়ালাম চারদিকে। সত্যি কথা বলতে আবুধাবি এয়ারপোর্টের পরিবেশ খুবই ভালো।
সকালে হাতমুখ ধুয়ে আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এখান থেকে আমাদের আটটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ ফ্লাইট ছিল কাতার এয়ারওয়েজেরই সুতরাং মালপত্র যা দিল্লিতে দিয়েছি তা একদম চলে যাবে অসলোতে। দোহা থেকে অসলো মোটামুটি ছয় ঘন্টার যাত্রা পথ। ফ্লাইটে খাবার দিয়েছিল এছাড়া চা কফি এবং একটু হাল্কা স্ন্যাকসও দিয়েছিল লাঞ্চের কিছু পরে।
আমরা অসলো পৌঁছোলাম প্রায় আড়াইটা নাগাদ। প্রথমে ইমিগ্রেশন হল তারপর মালপত্র নিয়েই চলে এলাম লাগোয়া ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে লিফ্টে করে। এখানে এটা দারুণ সুবিধা যে এয়ারপোর্টের সাথেই আছে ট্রেন লাইন। টিকিট নিয়ে চলে এলাম প্ল্যাটফর্মে, একটু অপেক্ষা করতেই ট্রেন এলো,আমাদের নামার কথা অসলো সেন্ট্রালে,ছেলে স্টেশনের পাশেই হোটেল বুক করেছিল কারণ পরদিন এখান থেকেই আমাদের ট্রেন ছিল। আমাদের হোটেল ছিল র্যাডিসন ব্লু,প্রথমে একটু ম্যাপ দেখে কনফিউজড হয়েছিলাম কোনদিকে যাবো? কারণ ম্যাপে এখনও আমরা একটু অনভ্যস্ত। পরে দেখলাম স্টেশন লাগোয়া একটা ছোট ব্রীজ পেরোলেই কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে নেমেই আমাদের হোটেল। আমাদের ট্যুর প্রায় সতেরো দিনের হলেও অসলোতে আমাদের খুব কম সময় মানে সেই দিনের বিকেলটাই।
সেদিন ছিল দোসরা অক্টোবর,আমরা তাড়াতাড়ি হোটেলে চেক ইন করেই মালপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। এছাড়া কোন উপায় নেই। স্টেশনের বাইরে বেরিয়েই ট্রাম পেলাম,ট্রামের টিকিট অনলাইনে কেটে তারপরেই বেরিয়ে ছিলাম হোটেল থেকে। টিকিট চব্বিশ ঘন্টার ছিল। প্রথমেই চলে গেলাম ভিগাল্যান্ড স্ক্যাল্পচার পার্কে। পার্কটা ভীষণ সুন্দর এবং গুস্তভ ভিগাল্যান্ড নামে একজন শিল্পী তাঁর সারাজীবন ধরে প্রায় এখানে সৃষ্টি করে গেছেন অসংখ্য সুন্দর মূর্তি যেগুলো রীতিমত জীবন্ত শিল্পীর হাতের গুণে। নরনারীর সম্পর্ক,পিতাপুত্রের সম্পর্ক,মায়ের সাথে সন্তানের বন্ধন এবং বন্ধুত্বর বন্ধন সবের নিদর্শন আছে তাঁর সৃষ্টিতে। আমরা পার্কে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যে নেমে এল।নিশীথ সূর্যের দেশ হলেও এই সময় সূর্যাস্ত মোটামুটি সাড়ে ছটাতেই হয়ে যায়। তাই কিছুক্ষণ সময় এখানেই আনন্দে কাটালাম আমরা। আর পার্কটা তো অসামান্য,একটা পার্ক যে এভাবে একজন মানুষ ভাস্কর্যে সাজাতে পারেন তা না দেখলে বোঝা যায় না। মূর্তিগুলো এতটাই সুন্দর যে প্রতিটা শিরা এবং উপশিরা স্পষ্ট। পার্কের মাঝখানেই আছে একটা ঝর্ণা এবং সেই ঝর্ণাতে আছে অসংখ্য মূর্তি আর গাছ। এই মূর্তিগুলো এবং গাছপালা হচ্ছে প্রকৃতি এবং প্রাণের প্রতীক।
Comments
Post a Comment