দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আর দীর্ঘ পরিকল্পনার শেষে আমাদের যাত্রা শুরুর দিন এগিয়ে এলো। যদিও এই যাত্রাপথে হাঁটা শুরু করেছিলেন আমার কর্তা প্রায় আটমাস আগে থেকে। সঙ্গে ছিল আমাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে আমার পুত্র। প্রতিদিনই বাবা আর ছেলে সময় পেলেই বসত আলাপ আলোচনায় কিভাবে সব হবে,কোথা থেকে শুরু করে কোথায় শেষ হবে যাত্রাপথের। ভিসা কেমন করে পাবো ইত্যাদি। যদিও ইউরোপে যাওয়া এই নিয়ে আমাদের চতুর্থ বার সুতরাং ভিসা করতে কী লাগে সবই আমাদের জানা তবুও পাবো কী পাবোনা এই দোটানা থেকেই যায়।
ভূতত্ত্ব: পার্কটি একটি ফাটল উপত্যকায় অবস্থিত, যেখানে টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রতি বছর প্রায় ২ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যায়, যার ফলে আলমান্নাগিয়া গিরিখাতেরমতো নাটকীয় ফাটল সৃষ্টি হয় । সিলফ্রা ফিসার: মহাদেশীয় পাতগুলোর মাঝখানে অবস্থিত অত্যন্ত স্বচ্ছ হিমবাহের জলে ডাইভিং ও স্নোরকেলিংয়ের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান। অক্সারারফস জলপ্রপাত: পার্কের মধ্যে অবস্থিত একটি মনোরম জলপ্রপাত, যেখানে অল্প পথ হেঁটে যাওয়া যায়। ( এই লেখাটা গুগল থেকে নেওয়া) এখানে নীচে নেমে ঝর্ণা দেখে ওপরে উঠে আসা যায়,আবার বাসে করে ওপরে এসেও ওপর থেকে পুরো দৃশ্য দেখা যায়। এই জায়গাটা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত একটি ভৌগোলিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেখার মত সুন্দর জায়গা। সেদিনের মত আমাদের ঘোরাঘুরি শেষ হল। এখানে যখন এলাম তখন আবহাওয়া ভালো হয়ে গেছে তাই মনটা একটু ভালো হল। এখানে আসার আগে একদল মানুষকে স্ক্যানডেভিনিয়ন হর্সের পিঠে চেপে ঘুরতে দেখেছি যা দেখতে খুবই ভালো লাগছিল। আমরা পরের দিন আইসল্যান্ড ছাড়বো এবার আমাদের গন্তব্য ফিনল্যান্ডে একদম স্যান্ট্যার দেশে। পরদিন ভোরে আমরা বেরোব,তাই হোটেলে বলে দিলাম বাসে সীট বুকিং করার জন্য। এখানে ওটাই নিয়ম,সীট আগে বুক করা না থাকলে আপনাকে বাসে নেবে না কারণ এয়ারপোর্ট যাবার জন্য ভীড় থাকে বাসে। বাসে রিজার্ভেশন বুক করে নিশ্চিন্ত হলাম। এবার ব্রেকফাস্ট প্যাক করে দেবে কিনা জিজ্ঞেস করলাম। এখানে তেমন সিস্টেম নেই তবে ক্রোশা আর চা কফি ফ্রুট জুস ইত্যাদি থাকে যেগুলো আমরা নিতে পারি। পরদিন ভোর ভোরই ওঠা ছিল কারণ আমাদের এয়ারপোর্ট যেতে হবে। তাই রেডি হয়ে ক্রোশা আর চা কফি খেয়ে চলে এলাম বাসস্টপে। আমাদের ফ্লাইটের যাত্রাপথ অনেকটা সময়ের ছিল,আমরা যাবো হেলসিঙ্কি,মাঝে কোপেনহেগেনে আমাদের লে ওভার ছিল কিছুটা সময় তারপর ওখান থেকে হেলসিঙ্কি। এয়ারপোর্টে নেমে আমরা ট্রেনে করে এলাম হেলসিঙ্কি সেন্ট্রালে। এখানে এসে বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হল আমাদের কারণ এখান থেকে আমাদের ট্রেন ছিল একটু রাতে। হেলসিঙ্কি স্টেশনটা বেশ ভালো, প্রচুর খাবারের দোকান সুতরাং আমরাও পরিচিত দোকান সাবওয়েতে গিয়ে পছন্দসই দুখানা র্যাপ নিলাম আর পরেরদিনের সকালের জন্যও কিছু খাবার নিলাম প্যাক করে। এরপর আছে আবার সারারাত ট্রেনের সফর আর তাই করে পৌঁছবো ফিনল্যান্ডের রোভানিয়ামিতে যেখানে স্যান্টা ক্লজ থাকেন। আমাদের ট্রেনের দোতলায় উঠতে হল মালপত্র নিয়ে,আমাদের কেবিন ছিল। এখানে কেবিনের সাথে অ্যাটাচড বাথরুম থাকে। ছোটখাটো জায়গাতে সব ব্যবস্থাই আছে। বাথরুম বেশ অন্যরকম,মানে অনেকটা ফোল্ডিং বাথরুম টাইপ। স্নানের জায়গাটা একটা ফোল্ডিং দরজায়,ওটা খুললেই স্নানের জায়গাটা বেরিয়ে পড়ে। ওরা শুধুই জলের বোতল দেয়। রাতের ঘুম বেশ নিশ্চিন্তেই হল। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাদের নিজেদের ইলেকট্রিক কেটলিতে করে চা বানানো হল। ট্রেনে বসেই রাতে কেনা খাবার খেয়ে,স্নান করে একদম রেডি হয়ে নিলাম। রোভানিয়ামিতে পৌঁছে গেলাম। একদম ছোট্ট স্টেশন রোভানিয়ামি,আমাদের হোটেল স্টেশন থেকে বেশ দূরে ছিল তাই আমরা স্টেশনের লকারে আমাদের মালপত্র রেখে স্যান্টা ভিলেজে যাবো বলে ঠিক করলাম। লকারে জিনিস রাখতে গিয়ে এক কান্ড ঘটালাম আমার কর্তার সৌজন্যে। তিনি আমাকে বড় তাড়া দিতে লাগলেন লকার দখলের জন্য কারণ ছোট স্টেশন। একটা লকার খোলা পেয়েই উনি তাতে আমাদের ট্রলিদ্বয় আর পিঠের ব্যাগ রেখে দুম করে দরজা দিয়ে কুপন সংগ্ৰহ করলেন। আমি যতই বলি কুপনে লকার নং দেখো,সেখানে রাখো সে আর সে কথা শুনলো না। বৌয়ের কথা শোনা মানেই তো সে স্ত্রৈণ সুতরাং বৌয়েরও যে কিছু বুদ্ধি আছে তাতে গুলি মেরে সে বললো চলো আমি লকার বন্ধ করে দিয়েছি আর খুলবে না। আমরা কুপন নিয়ে রওনা দিলাম স্টেশনের বাইরে,সেখানেই বাসস্ট্যান্ড ছিল ওখান থেকেই স্যান্টা ক্লজ ভিলেজে যাবার বাস ছিল তাতে উঠে বসলাম। বাসের চালক মহিলা। আমার ক্যামেরাম্যান বর ছবি তুলছিলেন,একটা জায়গাতে বাস স্টপ দিয়েছিল সেখানে নেমে। আমি হাতে ক্যামেরার ব্যাগ ধরেছিলাম দেখে উনি সেটা হাত থেকে নিয়ে বাসের ওপরের র্যাকে তুলে রেখে দিলেন। আমি আপত্তি করলাম,ওখানে না রাখতে কারণ নামার সময় ভুলে যেতে পারি। অবশ্যই আমার আপত্তি শোনা হল না এবং যথারীতি যখন স্যান্টা ভিলেজে নামলাম তখন দেখা গেল ক্যামেরার ব্যাগটা বাসেই রয়ে গেছে। কিছু করার নেই,আফসোস তার যথেষ্ট হল। আমাকে বললেন তুমি কেন জোর করলে না যে কিছুতেই রাখবে না ব্যাগটা তাহলে আমি রাখতাম না। আমি শুধু বললাম তুমি তাও শুনতে না যাক যা গেছে গেছে। স্যান্টা ক্লজ ভিলেজে এলে সত্যি মন ভালো হয়ছ যায়,মনে হচ্ছে সারাবছর এখানে বড়দিনের মরশুম চলছে। আমরা ঘুরে ঘুরে সবটা দেখছি। প্রথমেই মার্কেট,নানা সামগ্ৰী সেখানে তবে দামও বেশ চড়া। তারপর চলে এলাম স্যান্টা ক্লজের বাড়ির সামনে। চারদিকে লালের ছড়াছড়ি। এই জায়গাটাকেই আর্কটিক সার্কেল বলে,সবাই লাফালাফি করে আর্কটিক সার্কেল পার হবার চেষ্টা করছে। আমার কর্তাও করল। তারপর আমরা চলে এলাম স্যান্টা ক্লজের বাড়িতে ঢুকব বলে। এখানে প্রবেশ করতে কোন টিকিট কাটতে হয় না। আমরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম চারদিকে স্যান্টার গিফ্টের বাক্সের ছড়াছড়ি। দোতলায় উঠে আমরা লাইনে দাঁড়ালাম,আমাদের সামনে কয়েকজন অপেক্ষায়। দরজায় দাঁড়িয়ে খুব হাসিমুখের মিষ্টি একটা মেয়ে মাথায় রেইনডিয়ারের সিংয়ের হেয়ারব্যান্ড বাঁধা। ওরা একটা একটা গ্ৰুপ ধরে পাঠাচ্ছে স্যান্টা ক্লজের সাথে দেখা করার জন্য। আমার তখন ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে,যে স্যান্টাকে আমরা টিভিতে দেখি তাঁর সাথে দেখা হবে! উঃ কেমন যেন একটা স্বর্গীয় ফিলিংস জায়গাটাতে। আমরা অপেক্ষায় আছি,যেহেতু আমাদের গ্ৰুপে মাত্র দুজন তাই আমরাই ভেতরে ঢুকলাম। আমাদের ব্যাগ রেখে দিতে হল। ভেতরে ছবি তোলা বারণ,ওরা ওদের ক্যামেরায় আমাদের ছবি আর ভিডিও তুলবে। আমরা প্রয়োজন হলে সেই ছবি আর ভিডিও নিতে পারি। স্যান্টাক্লজ যেন একটা তুলোর মানুষ,ধবধবে সাদা রঙ বড় দাড়ি আর গায়ে লাল পোশাক। আমাদের দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে একগাল হাসি দিয়ে হাত মেলালেন। তারপর আমরা গিয়ে উনার দুই পাশে বসলাম। আমাদের দেশ কোথায়? উনি তাজমহল দেখেছেন সব গল্প করলেন। আমিও একটা লাল কোট পরে গিয়েছিলাম,মজা করলেন যে তাঁর সাথে আমার ড্রেসের রঙ ম্যাচ করে গেছে। কিছুটা সময় যেন এক রূপকথার রাজ্যে থেকে আমরা বিদায় নিলাম। নীচে নেমে এলাম,এখানে সবারই লাল পোশাক আর মাথাতে রেইনডিয়ারের শিং। আমাদের ছবি আর ভিডিও রেডি,ছবি নিলে পঞ্চাশ ইউরো,ভিডিও আর ছবি নিলে পঁচাত্তর ইউরো। আমরা পঞ্চাশ ইউরো দিয়ে বোর্ডে ফ্রেম করা ছবিটাই নিলাম। এরপর চলে এলাম রেইনডিয়ার পার্কে,এখানে অনেকেই উঠছেন স্লেজ গাড়িতে। আমরা উঠলাম না,কারণ বরফে স্লেজ গাড়িতে চড়ার মজা আছে। বরফবিহীন জায়গাতে ঠিক জমবে না ব্যাপারটা। তবে দারুণ সুন্দর হরিণগুলো আর গাড়িটাতে হরিণের লোমশ চামড়া পাতা। বেশ কিছু সময় আমরা ওখানে কাটিয়ে আর স্যান্টাক্লজ ভিলেজের বিরাট বড় কর্মশালা দেখে ওখান থেকেই ফিরতি বাসে ফিরে এলাম স্টেশনে। কারণ সেখানেই আমাদের লাগেজ। এরপর আমাদের যেতে হবে আমাদের হোটেলে। এখানে সব হোটেলে মোটামুটি চেক ইন দুপুর দুটোতে আর চেক আউট বেলা বারোটায়। আমরা চলে এলাম স্টেশনে,লকার রুমে ঢুকে তো আমাদের চক্ষুস্থির। আমাদের দুখানা ট্রলি আর পিঠের ব্যাগ বাইরে রাখা। ব্যাপারটা আগেই ভেবেছিলাম এখন বুঝলাম আগে টোকেন নিয়ে লকার নং রেখে ব্যাগ রাখতে হত। ব্যাগ রাখারও মেয়াদ আছে সেই অনুযায়ী টাকা দিতে হয়। যাক ফিনল্যান্ড বলেই হয়ত খোয়া যায়নি,না হলে ওভাবে দুটো নতুন ট্রলি আর ব্যাগ কিছুতেই থাকত না। অবশ্যই চুরি যেত। ইউরোপের দেশ মানেই কিন্তু কিছু চুরি হবে না,একথা ভাবা ঠিক নয়। এখানে প্রচুর চুরি হয়,শুধু ফিনল্যান্ড বলেই হয়ত আমাদের ব্যাগগুলো আমরা পেলাম। ফিনল্যান্ড সত্যিই ভালো জায়গা,এখানে মেয়েরা নিরাপদ। সারারাত ঘুরে বেড়ালেও কোন ভয় নেই এখানে। যাক আমাদের জিনিসপত্র খোয়া যায়নি এটাই আমাদের সৌভাগ্য, না হলে এই শীতের দেশে যে কী হত কে জানে? আমরা এবার স্টেশনের বাইরে এসে একটা ক্যাব নিলাম কারণ আমাদের এবার হোটেলে যেতে হবে। এখান থেকে হোটেল অনেকটাই দূর,আমাদের ট্যাক্সিচালক বাংলাদেশী ছিলেন যেতে যেতে টুকরো কিছু কথাবার্তা হল। হোটেলে আসতে প্রায় পঁচাত্তর ইউরো লাগলো। ওরা আমাদের জিজ্ঞেস করল যে রাতের ডিনারে আমরা কী খাবো? এখানে কাছাকাছি কোন রেস্তোরাঁ না থাকায় আমাদের রাতে এখানেই খেতে হবে। ওদের তিন রকম অপশন ছিল,ভেজ,ফিশ আর রেইনডিয়ারের মাংস। আমার কর্তার খুবই ইচ্ছে ছিল সেই মাংসের স্বাদ নেবার তাই তাঁর জন্য রেইনডিয়ার আর আমার জন্য স্যামন মাছ বলে দেওয়া হল। জায়গাটা খুবই নিরিবিলি,আমাদের হোটেলের ঘর ছিল ইগলু টাইপ মানে হোটেলের নামই ছিল গ্লাস ইগলু হোটেল। বাইরে বেশ ঠান্ডা তবে ঘরের ভেতরে গরম,আর বাইরেটা পুরোটাই দেখা যায় ভেতর থেকে। বিছানায় শুয়ে দেখা যায় নীল আকাশ। তবে শীতে এখানে থাকার অন্য মজা আছে। কাঁচের ইগলু তখন পুরোটাই বরফে ঢাকা থাকে। তবে ওরা ছাদের উপরিভাগ পরিস্কারের ব্যবস্থা রাখে যাতে রাতে অরোরা দেখা যায়। এখানে অরোরা দেখার অ্যালার্ম লাগানো থাকে,রাতে অরোরা দেখা গেলেই অ্যালার্ম বাজে। আমরা বেশ কিছুটা সময় আনন্দে উপভোগ করলাম ইগলুর ভেতরে থাকার সুন্দর অনুভূতি। হাতে এক কাপ চা নিয়ে বাইরের সৌন্দর্য ঘরে বসে উপভোগ করার আনন্দই আলাদা। বাইরে কিন্তু বেশ হাওয়া আর ঠান্ডা তখন। বেশ কিছুটা বাদে সন্ধ্যে নামলো। ওরা আমাদের ডিনার করার জন্য সময় দিয়েছিলেন সন্ধ্যে সাতটা থেকে নটার মধ্যে। আমরা সাড়ে সাতটা নাগাদ চলে এলাম ডাইনিং হলে। বাইরেটা তখন বেশ কনকনে ঠান্ডা আর একটু অন্ধকার মত। তবে ডাইনিং হলের ভেতরটা বেশ গরম আর এখানকার ডেকোরেশন অসাধারণ। এখানে স্টাফ করা আর্কটিক ফক্স রাখা রয়েছে নিভু নিভু আলো আর মাঝখানে জ্বালিয়ে রাখা ফায়ারপ্লেসের আগুনের তাপে অসাধারণ লাগছিলো। ডাইনিং হল ভর্তি লোকজন,সকলেই খাবার এবং পানীয় উপভোগ করছেন। আমাদের টেবিল আমাদের নাম দিয়ে বুক করা ছিল প্রথমেই ওরা সার্ভ করলেন স্যুপ আর ব্রেড সাথে বাটার। তারপর এল আমাদের মেইন কোর্স,আমার কর্তার জন্য রেইনডিয়ারের মাংস,কিছুটা ভাত আর তার সাথে কিছু সবজি এবং বেদানার দানা। মাংসটা তবে কিমা মত করে দেওয়া। আমার জন্য ছিল বাটার আর চিজ দেওয়া মাছ আর সাথে সবজি। আমার কর্তা ওর প্লেট থেকে মাংস দিতে চাইলেও আমি তার স্বাদ নিতে পারলাম না। ইচ্ছে করল না খেতে। তবে আমার মাছটা আমি পুরোটা খেতে পারলাম না উনাকে দিতে হল। সব শেষে ছিল ডেজার্টে কেক আর মিষ্টি। যাক মোটামুটি ভালোই খাওয়া হল। আমরা চলে এলাম আমাদের গ্লাস ইগলুতে। আকাশ একটু মেঘলা তবে মাঝেমাঝে তারারা উঁকি দিচ্ছে। যদি অরোরা দেখতে পাই সেই চিন্তাতে আমার ভালো করে ঘুম এল না। তবে না আর কোন অ্যালার্ম বাজেনি রাতে। সুতরাং অরোরা হয়ত দেখা যায়নি। কিন্তু দেখার চান্স ছিল কারণ আকাশ মোটামুটি পরিস্কার ছিল। পরদিন আমাদের ট্রেন ছিল রাতে। হোটেল ছাড়তে হবে বারোটায়,তাই আমাদের হাতে অনেকটা সময়। ছেলে বলেছিল আমরা আরেকবার স্যান্টাক্লজ ভিলেজে যেতে পারি কিন্তু দেখা যায়গাতে আর না গিয়ে আমরা ঠিক করলাম রানুয়া জুতে যাবো। যেখানে আর্কটিক অ্যানিম্যাল আছে। ছেলে কলকাতাতে বসেই সব বুক করে দিল। পরদিন ব্রেকফাস্ট করার পরই আমাদের গাড়ির ড্রাইভার চলে এল। আমরা আমাদের লাগেজ নিয়ে একদম উঠে বসলাম গাড়িতে,হোটেল ছেড়ে দিলাম। গাড়ি এল স্যান্টাক্লজ ভিলেজে সেখান থেকে একটি কমবয়েসী মেয়ে উঠলো,একাই এসেছে ট্র্যাভেল করতে। আমাদের তিনজনকে নিয়েই গাড়ি চলতে শুরু করল,রোভানিয়ামি থেকে রানুয়া বেশ অনেকটা। পথের শোভা অসাধারণ আর যেতে যেতে অনেক রেইনডিয়ারকে ঘুরতে দেখলাম পাশের মাঠে। আমাদের ড্রাইভার বললেন এগুলো পোষা। আরও বললেন যে গতকাল রাতেও এখানে অরোরা দেখা গেছে। আমাদের হোটেল তো কিছু অ্যালার্ম দিল না,হয়ত এদিকে দেখা যায়নি। আমরা রানুয়াতে এসে পৌঁছোলাম,আমাদের ড্রাইভার আমাদের একদম গেটের কাছে এন্ট্রি পয়েন্টে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। হাতে পেলাম একটা ম্যাপ,তারপর হাঁটতে শুরু করলাম নানা ধরনের আর্কটিক সার্কেলে বাস করে এমন পশু আর পাখি এখানে আছে। তবে অনেক খাঁচা ফাঁকাও আছে। জীব জন্তুদের রাখা হয়েছে বেশ নিরাপদ জায়গাতে,খাঁচা একদম দুর্ভেদ্য। তবে তারা অনেকটা জায়গা নিয়ে একদম প্রকৃতির মধ্যে আছে। জায়গাটা একদম প্রকৃতির মধ্যে আর অনেকটা জায়গা নিয়ে। তবে দিকনির্দেশনা ভালোভাবে করা আছে। পোলার বিয়ার দেখে দারুণ লেগেছে,যদিও সে ছিল অনেকটা নীচে তবুও তার স্নানের দৃশ্য দারুণ উপভোগ করলাম। এছাড়াও প্রচুর রেইনডিয়ার,উল্ফ,আউল,হক,বিয়ার এসব দেখলাম। ওখানে দোকান থেকে কিছু কেনাকাটাও করলাম। তারপর ফিরে এলাম গাড়িতে। আমরা বিকেল বিকেলই স্টেশনে চলে এলাম। এখানে একটা খুব ভালো যে স্টেশনের ভেতরগুলো খুব গরম। আমাদের ট্রেন ছিল রাতে তাই অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় নেই। রোভানিয়ামি স্টেশন বেশ ছোট,হেলসিঙ্কির মত নয়। পাশে একটা ক্যাফে ছিল সেখানে কফি খেয়ে একটু তেষ্টা মেটালাম। তারপর ট্রেন এলে উঠে বসলাম তাতে। রাতে আমাদের কাছে থাকা ম্যাগি ইলেকট্রিক কেটলির গরম জলে সেদ্ধ করে পেট ভরালাম। এইসব খাবার খেলে শরীরটা ঠিক থাকে। কারণ ওদের সব খাবার আমাদের পেটে ঠিক সয় না। পরদিন সকালে হেলসিঙ্কি পৌঁছবো। ওখান থেকে বিকেলে আমাদের ক্রুজ আছে স্টকহোম যাবার। ট্রেন থেকে নামার আগে দুজনেই ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর হেলসিঙ্কি পৌঁছে ব্রেকফাস্ট করে একদম লকারে লাগেজ রেখে বেরোলাম শহর ঘুরতে। এবার আর লাগেজ রাখতে গন্ডগোল হয়নি। আগে কুপন কাটলাম,লকার নং পেলাম তারপর সেই লকারে জিনিস রাখলাম। যখন ফিরে এলাম আমাদের কুপন স্ক্যান করা মাত্রই লকার খুলে গেল। সবটাই মেশিনের মাধ্যমে নিজেকে করতে হয়। কেউ থাকে না সাহায্য করার জন্য। আমরা একটা ক্যাব নিয়ে চলে এলাম উসপেনসকি চার্চের কাছে। এখানে আরেকটি বড় চার্চ আছে তার নাম হেলসিঙ্কি চার্চ। উসপেনসকি চার্চের কাছটা দারুণ সুন্দর। চার্চের বাইরেটা ইটরঙা আর বেশ অন্যরকম দেখতে। এখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্র আর শহর দেখা যায় সুন্দর। বাইরে তখন শরতের রঙ লেগেছে প্রকৃতিতে। আমরা কিছুটা সময় দেখে ঢুকলাম ভেতরে। এখানে প্রতি চার্চের ভেতরে প্রবেশ করতে টিকিট লাগে। এই চার্চের ভেতরটা যেন সোনায় মোড়ানো। একদম সোনার বিরাট বড় ফ্রেমে আছেন যীশু,মা মেরী অপূর্ব সুন্দর চার্চের ভেতরটা। তেমন সুন্দর ছাদের আর দেওয়ালের নকশা। বেশ কিছু সময় ওখানে থেকে আমরা এলাম পোর্টে এখান থেকেই আমাদের ক্রুজ ছাড়বে। পোর্ট এরিয়াতে একটা ছোটখাটো বাজার বসে। আমরাও একটু কেনাকাটা করলাম সেখানে তারপর হাঁটতে শুরু করলাম হেলসিঙ্কি চার্চের দিকে। কিন্তু বৃষ্টি নামলো পথেই। তবুও এলাম চার্চের কাছে,এই জায়গাটাকে সেনেট স্কোয়ার বলে। চার্চের রেনোভেশন চলছে বলে আমরা সামনেটায় ঘুরে আবার একটা ক্যাব নিয়ে চলে এলাম স্টেশনে। বৃষ্টি বেশ জোরেই পড়ছে তাই আর অন্য কোন জায়গাতে গেলাম না। হেলসিঙ্কি স্টেশন বিরাট বড়,অসংখ্য দোকান এখানে আছে প্রচুর বসার জায়গা এবং ভেতরটা গরম তাই আমরা ওখানেই অপেক্ষা করলাম কিছুটা সময় তারপর আবার সাবওয়েতে গিয়ে খাবার খেয়ে লকার থেকে জিনিস নিয়ে একদম ক্যাব ধরে চলে এলাম অলিম্পিয়া টার্মিনালে এখান থেকে আমাদের ক্রুজ ছাড়বে স্টকহোম যাবার। এবার আমরা ফিনল্যান্ড ছেড়ে সুইডেনে যাবো। সারাটা রাত আমাদের থাকতে হবে ক্রুজে পরদিন সকাল দশটা নাগাদ পৌঁছবো।
নির্দিষ্ট সময়ে ভিসা আসার পর সমস্ত তোড়জোড় শেষে আমরা গত পয়লা অক্টোবর রওনা দিলাম নরওয়ের উদ্দেশ্যে। আমাদের প্রথমে ইন্ডিগোর ডোমেস্টিক ফ্লাইট ছিল,সেখান থেকে দিল্লি এসে দিল্লি থেকে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দোহা এসে পৌঁছোলাম। দিল্লি এসে টার্মিনাল চেঞ্জ করে টি ওয়ান থেকে টি থ্রী এলাম। সেখানেই আমাদের ইমিগ্ৰেশন হল। তারপর যাত্রা শুরু। ইমিগ্রেশনের সময় আমাদের রিটার্ন টিকিট দেখাতে হয়েছিল,যে কবে আমরা ফিরছি দেশে। তবে এয়ারপোর্টে জুতো চক্করে প্রথমে একটু ভুগলাম,দেখলাম নিয়মকানুন একেক এয়ারপোর্টে একেক রকম।
দোহাতে ঘন্টা তিনেকের লেওভার ছিল,আমরা ট্রান্সফারে এসে সিকিউরিটি চেক করিয়ে একদম গেটে চলে এলাম যেখান থেকে আমাদের ফ্লাইট ছাড়বে। দোহা এয়ারপোর্ট আমার কাছে নতুন আমি এর আগে দুবাই এবং আবুধাবি আর শারজা হয়ে যাতায়াত করলেও দোহাতে কখনও আসিনি। তবে দোহাতে এসে সত্যি মুগ্ধ হলাম,ঠিক যেন মনে হল সুন্দর প্রকৃতি দিয়ে সাজানো এক শান্তিপূর্ণ এয়ারপোর্ট। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পাখি ডাকছে ভীষণ ভালো লাগলো। কিছু সময় কাটলো ঘোরাঘুরি করে এদিক ওদিক,নজর কাড়লো ব্রোঞ্জের বিশাল আকৃতির সিংহমশাই। একটু এগিয়ে দেখলাম পশুরা বসেছে ভোজনে,সামনে খাবারদাবার আর পানীয়। যেহেতু প্রথমবার দেখছি তাই আমি ছটফটে হয়ে উঠলাম আর মনটাকে কিশোরী করে ঘুরে বেড়ালাম চারদিকে। সত্যি কথা বলতে আবুধাবি এয়ারপোর্টের পরিবেশ খুবই ভালো।
সকালে হাতমুখ ধুয়ে আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এখান থেকে আমাদের আটটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ ফ্লাইট ছিল কাতার এয়ারওয়েজেরই সুতরাং মালপত্র যা দিল্লিতে দিয়েছি তা একদম চলে যাবে অসলোতে। দোহা থেকে অসলো মোটামুটি ছয় ঘন্টার যাত্রা পথ। ফ্লাইটে খাবার দিয়েছিল এছাড়া চা কফি এবং একটু হাল্কা স্ন্যাকসও দিয়েছিল লাঞ্চের কিছু পরে।
আমরা অসলো পৌঁছোলাম প্রায় আড়াইটা নাগাদ। প্রথমে ইমিগ্রেশন হল তারপর মালপত্র নিয়েই চলে এলাম লাগোয়া ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে লিফ্টে করে। এখানে এটা দারুণ সুবিধা যে এয়ারপোর্টের সাথেই আছে ট্রেন লাইন। টিকিট নিয়ে চলে এলাম প্ল্যাটফর্মে, একটু অপেক্ষা করতেই ট্রেন এলো,আমাদের নামার কথা অসলো সেন্ট্রালে,ছেলে স্টেশনের পাশেই হোটেল বুক করেছিল কারণ পরদিন এখান থেকেই আমাদের ট্রেন ছিল। আমাদের হোটেল ছিল র্যাডিসন ব্লু,প্রথমে একটু ম্যাপ দেখে কনফিউজড হয়েছিলাম কোনদিকে যাবো? কারণ ম্যাপে এখনও আমরা একটু অনভ্যস্ত। পরে দেখলাম স্টেশন লাগোয়া একটা ছোট ব্রীজ পেরোলেই কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে নেমেই আমাদের হোটেল। আমাদের ট্যুর প্রায় সতেরো দিনের হলেও অসলোতে আমাদের খুব কম সময় মানে সেই দিনের বিকেলটাই।
***************
সেদিন ছিল দোসরা অক্টোবর,আমরা তাড়াতাড়ি হোটেলে চেক ইন করেই মালপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। এছাড়া কোন উপায় নেই। স্টেশনের বাইরে বেরিয়েই ট্রাম পেলাম,ট্রামের টিকিট অনলাইনে কেটে তারপরেই বেরিয়ে ছিলাম হোটেল থেকে। টিকিট চব্বিশ ঘন্টার ছিল। প্রথমেই চলে গেলাম ভিগাল্যান্ড স্ক্যাল্পচার পার্কে। পার্কটা ভীষণ সুন্দর এবং গুস্তভ ভিগাল্যান্ড নামে একজন শিল্পী তাঁর সারাজীবন ধরে প্রায় এখানে সৃষ্টি করে গেছেন অসংখ্য সুন্দর মূর্তি যেগুলো রীতিমত জীবন্ত শিল্পীর হাতের গুণে। নরনারীর সম্পর্ক,পিতাপুত্রের সম্পর্ক,মায়ের সাথে সন্তানের বন্ধন এবং বন্ধুত্বর বন্ধন সবের নিদর্শন আছে তাঁর সৃষ্টিতে। আমরা পার্কে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যে নেমে এল।নিশীথ সূর্যের দেশ হলেও এই সময় সূর্যাস্ত মোটামুটি সাড়ে ছটাতেই হয়ে যায়। তাই কিছুক্ষণ সময় এখানেই আনন্দে কাটালাম আমরা। আর পার্কটা তো অসামান্য,একটা পার্ক যে এভাবে একজন মানুষ ভাস্কর্যে সাজাতে পারেন তা না দেখলে বোঝা যায় না। মূর্তিগুলো এতটাই সুন্দর যে প্রতিটা শিরা এবং উপশিরা স্পষ্ট। পার্কের মাঝখানেই আছে একটা ঝর্ণা এবং সেই ঝর্ণাতে আছে অসংখ্য মূর্তি আর গাছ। এই মূর্তিগুলো এবং গাছপালা হচ্ছে প্রকৃতি এবং প্রাণের প্রতীক। ওখানে ঘুরে ঘুরে সব দেখতে দেখতেই সন্ধ্যে নেমে এল প্রায়,পার্কে আলো জ্বললো তবে ফিরে আসার পথটায় খুব একটা আলো ছিল না। পার্ক দেখে ফিরে এলাম রাস্তায়,বাইরে তখন বেশ একটা হিমেল হাওয়ার পরশ। পার্কের সামনের বাসস্টপ আর ট্রামস্টপ ছিল। আমরা ট্রামে উঠে বসলাম। ট্রাম চলতে শুরু করল সামনের দিকে। শহর দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। অসলো যেহেতু নরওয়ের রাজধানী শহর তাই চারপাশটা খুবই সুন্দর করে সাজানো গোছানো। আমাদের ইচ্ছে ছিল একটু শিপিং হারবারে নামব কিন্তু ততক্ষণে আঁধার নেমেছে আর সেই আলোতেই দেখলাম আলোর মালাতে সাজানো পোর্ট এরিয়া। কিছুটা বাদে আমরা ট্রাম থেকে নামলাম উল্টোদিকের ট্রাম ধরে স্টেশনে আসব বলে কারণ আমাদের হোটেল ছিল একদমই স্টেশনের কাছে।
যে ট্রামে উঠেছিলাম আমরা সেই ট্রামটা আমাদের একটু দূরে নামালো স্টেশন থেকে। ওখানকার মানুষজন বেশ ভালো,এক মহিলা আমাদের সাহায্য করলেন স্টেশনে আসতে পথ দেখিয়ে।
স্টেশন থেকে হোটেল একদম কাছে চলে এলাম হোটেলে। তখন আমার কর্তার হঠাৎই ইচ্ছে হল অপেরাতে যাবার। যদিও অপেরা স্টেশন থেকে খুব দূর নয় তবুও সারাদিন রাত জার্নির পর আমার আর তখন হাঁটতে ভালো লাগছে না একদমই তাই হোটেলের বাইরে অপেক্ষারত ক্যাব বুক করলাম। কথা হল উনি ওখানে পনেরো কুড়ি মিনিট অপেক্ষা করবেন আর তারপর আমাদের নিয়ে চলে আসবেন।
সেই মত আমরা অপেরা হাউস দেখলাম,একদম সমুদ্রের পাশেই অপেরা হাউস তাই অনেক পাখি এসে ভীড় করেছে এখানে। আর বিরাট বড় সুন্দর ডিজাইনের অপেরা হাউস। হোটেলে যখন ফিরলাম হঠাৎই মনে হল হাতের আঙুলের মাথাগুলো ফুলে ভারী হয়েছে। এটাকে ব্লু ফিংগার বলে,ঠান্ডাতে একটা অবশ ভাব আসে। হাতটাকে গরম করার চেষ্টা করলাম,অনেকটা পরে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেল।
কলকাতা থেকে নরওয়ে আসার আনন্দ,নতুন দেশ দেখার অনুভূতি আর সাথে অনেকটা ক্লান্তি নিয়ে সেদিনের মত ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন ভোরে উঠতে হবে কারণ আমাদের ট্রেন ছিল অসলো স্টেশন থেকে Myrdal যাবার সকাল আটটা পঁচিশ মিনিটে।
পরদিন অক্টোবরের তিন তারিখে আমরা ভোরে উঠে একদম রেডি হয়ে অল্প কিছু ব্রেকফাস্ট করে একদম চেক আউট করলাম। তারপর চলে এলাম মালপত্র নিয়ে স্টেশনে। আমাদের ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ছিল দাঁড়িয়ে, আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কোচে উঠে একদম মালপত্র জায়গা মত রেখে বসে পড়লাম। এখানে মালপত্র রাখার জায়গা নির্দিষ্ট থাকে,আর মোটামুটি সুরক্ষিত সেই জায়গা সুতরাং সেখানে নিশ্চিন্তে রাখা যায়। স্টেশন থেকে আমাদের হোটেল দেখা যাচ্ছিলো। ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়লো,আমাদের পাশের সীটে দুজন ছিলেন তাদের সাথে ছিল একটি পোষ্য কুকুর,সে দিব্যি সীটের নীচে তার নরম বিছানায় বসে ঝিমোতে লাগলো। আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে,কখনও সমুদ্র,পাহাড় আর প্রকৃতির সাথে হাত মেলাতে মেলাতে ট্রেন চললো এগিয়ে। তারই মাঝে থামলো স্টেশন পেলেই। আমরা ফ্লাক্সে কফি করে এনেছিলাম আর সাথে ছিল কিছু শুকনো খাবার। যখন খেতে ইচ্ছে করবে খাবো। এভাবেই একটা সুন্দর যাত্রাপথের শেষ হল মিয়রডেলে এসে। এই ট্রেন আমাদের নামিয়ে আবার অসলো ফিরে যাবে। আর আমরা উঠবো এবার ফ্ল্যাম রেলওয়েজের কাঠের ট্রেনে। এখানে বেশ ঠান্ডা, স্টেশনটা খুবই সুন্দর আর শান্ত। সবুজ পোশাক পরে পুরুষ এবং নারী ট্রেনের স্টাফরা ঘোরাঘুরি করছেন। গাড়ির রঙও সবুজ। একদম তিন কামরার ছোট্ট ট্রেন। আমরা গার্ডকে জিজ্ঞেস করে নিলাম কোনদিকে বসব,উনি বললেন বামদিকে বসতে। মানে ট্রেন যেদিকে যাবে তার বামদিকের জানলায়। এখানে কোন সীট রিজার্ভের ব্যাপার নেই তাই ওঠার সময় একটু ভীড় জমলেও পরে সবাই মোটামুটি সীট পেয়ে গেলেন পছন্দমত জায়গাতে। ট্রেন চলতে শুরু করল,চারদিকের দৃশ্য স্বর্গীয় একদম। সবুজ পাহাড়,ছোট ছোট বাড়ি আর ঝর্ণা। তার মাঝে অ্যানাউন্স করা হল ট্রেন এবার থামবে। আর আমরা পাব পনেরো মিনিট মত সময়। এখানে একটা সুন্দর ঝর্ণা আছে। যা দেখা যাচ্ছে একটু দূরে। ওপরে সবুজ,তারপর আছে পাথর আর সেই পাথরের গা বেয়ে নেমে আসছে জলধারা। সকলেই ছবি তুলছি,হঠাৎ শোনা গেল গান আর তারপর অবাক হয়ে দেখলাম। লাল গাউন পরা একটি মেয়ে গান গাইছে পাহাড়ের ওপর,একটু বাদেই দেখলাম সে এভাবেই গান গাইতে গাইতে এক পাহাড় থেকে নেমে এল আরেক পাহাড়ে। সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধ আমরা। এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম অর্জন করলাম।
ট্রেন আবার চলছে,শুধু ভাবছি কোন দৃশ্যকে ক্যামেরায় তুলব? সবই তো অসাধারণ। যেমন প্রকৃতি,তেমন ঝরণা আর তেমনি সাজানো গোছানো নদীর ধারে ছোট ছোট শহর। এভাবেই মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে দেখতে চলে এলাম ফ্ল্যামে। এখান থেকে আমাদের ফিওডে যাবার জন্য ক্রুজ ছিল আর সেই ক্রুজে করে ফিওডের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলে যাবো ফ্ল্যাম থেকে গুডভ্যাঙ্গেন। আর এই গুডভ্যাঙ্গেন থেকেই ছিল আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য বার্গেনে যাবার ট্রেন।
************************
ক্রুজ ছাড়তে একঘন্টা মত দেরি ছিল। সকলেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন ক্রুজে ওঠার জন্য। সবাই আশা করেন একটু ভালো জায়গা পাবার। আমরাও উঠে পড়লাম। মালপত্র রাখার নির্দিষ্ট জায়গায় মালপত্র রেখে এদিক ওদিক ঘুরে দেখতে লাগলাম। বাইরে হাওয়ার প্রচন্ড দাপট। তবে দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম বা বলা যেতে পারে আমাদের কাছে ছিল এটা লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স। কারণ এমন পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গভীর সমুদ্রের জল ভেঙে ভয়ঙ্কর গতিতে ফেনিল ধোঁয়া তুলে যাত্রার আনন্দ উপভোগ করার আলাদাই আনন্দ আছে। বাইরে যেমন হাওয়া তেমনি ঝাঁকুনি। আমরা ক্রুজের একদম তিনতলা পর্যন্ত উঠে দেখে এলাম। বেশ কিছু সময় বাইরে দাঁড়িয়ে দুপাশের পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করলাম অভিভূত হয়ে।
এরমধ্যেই আছে কিছু ছোট গ্ৰাম আর লোকালয়। অনেকটা সময় থাকার পর খুবই কাবু হয়ে পড়লাম ঠান্ডাতে। তখন ভেতরে এসে বসলাম। কিন্তু সেখানে গরম হলেও মন পড়ে রইল বাইরের দিকেই। তাই চেটেপুটে উপভোগ করতে লাগলাম বাইরের দৃশ্য কাঁচের ভেতর থেকেই। কিছুটা বাদে বাইরে এসে দেখলাম হাওয়ার বেগ খুবই বেড়েছে,মনে হচ্ছে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। দূরে গুডভ্যাঙ্গেন দেখা যাচ্ছে। আমাদের ওখানেই পৌঁছনোর কথা। কিন্তু এরমধ্যেই ঘোষণা হল যে প্রচন্ড হাওয়ার জন্য আমাদের ক্রুজ গুডভ্যাঙ্গেন যেতে পারবে না। আমাদের আবার ওরা ফ্ল্যামেই নিয়ে যাবে। আমরা চিন্তিত হলাম,অনেকেই হলেন চিন্তিত। তারপরেই ঘোষণা হল যে গুডভ্যাঙ্গেন যাবার জন্য উনারা বাসের ব্যবস্থা করে দেবেন। তাতে করেই আমরা পৌঁছে যাব গুডভ্যাঙ্গেন। যাক এবার নিশ্চিন্ত,আমাদের ট্রেন একটু রাতের দিকেই ছিল সুতরাং আর কোন চিন্তা নেই। এবার গরম কফি আর স্যান্ডউইচ খেয়ে নিজেদেরকে একটু ফ্রেশ করে নিলাম।
এখানে খাবার দাবারের দাম একটু বেশি। তবুও কিছু করার নেই প্রয়োজনে খেতেই হবে। আমরা আবার ফ্ল্যামে ফিরে এলাম। এখানে বাস ছিল,সেটায় নিজেদের লাগেজ রেখে উঠে বসলাম। বাস আমাদের একদম গুডভ্যাঙ্গেন স্টেশনে ছেড়ে দিল। এখানে এসে দেখে নিলাম আমাদের ট্রেন কত নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসবে সেটা দেখে সেখানে চলে এলাম। তখনও প্রায় ঘন্টা দেড়েক বাকি ট্রেন আসতে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। হঠাৎই একটা ট্রেন এল,এই ট্রেনও বার্গেনে যাবে তবে আমাদের ট্রেন এটা নয়। আমরা আর অপেক্ষা করলাম না,সবার সাথে এটাতেই উঠে পড়লাম।সীটও ছিল বসে পড়লাম। আমাদের সাথে টিকিট ছিল তাই কোন অসুবিধা হয়নি। আমরা বরং অনেকটা আগেই বার্গেনে এসে পৌঁছে গেলাম। বার্গেন স্টেশনটা বেশ পুরোনো আর সুন্দর। আমরা স্টেশনের বাইরে এসে ক্যাব পেয়ে গেলাম। এখানে অনেকেই নরওয়ের টাকা নেন,আবার কেউ ইউরোও নেন তবে সুবিধা হয় কার্ড থাকলে। গাড়ি ভাড়া এখানে একটু বেশি। হোটেল একদম ওল্ড টাউনের কাছেই ছিল। ছেলে ম্যাপ দেখে সব হোটেলই সুবিধাজনক জায়গাতে বুক করে দিয়েছিল। আমাদের হোটেলের উল্টোদিকে ছিল বার্গেনের বিখ্যাত ফিশ মার্কেট।
আমাদের হোটেলের নাম ছিল Scandic Torget Bergen..হোটেলের পজিশন খুবই ভালো,এখান থেকে সুন্দর হেঁটে হেঁটে শহরের অনেকটাই দেখা যায়। আর জানলা থেকে দেখা যায় পাহাড়ের কোলে কোলে সুন্দর বাড়িঘর,পোর্ট,জাহাজ,পথঘাট সবই।
তখন রাত্রি হয়েছে বেশ। আমরা খাওয়াদাওয়া করে সেদিনের মত বিছানায় আশ্রয় নিলাম। পরদিন আমাদের শহর ঘুরে দেখার পরিকল্পনা ছিল। এখানে আমরা দুই রাত্রি থাকব।
সকালে উঠে মন ভরে গেল জানলা দিয়ে দেখে। ছবির মত শহর একদম মন ভালো করে দিচ্ছে কিন্তু শুরু হয়েছে বৃষ্টি। আগেই জেনে এসেছি এখানে বৃষ্টি একটু খেয়ালী তারপর আমরা গেছি অক্টোবরে, তখন বৃষ্টি হয় মাঝেমধ্যে। যাক আমরা ব্রেকফাস্ট করতে চলে গেলাম। ইউরোপের শহরগুলোতে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট যেমন হয় এখানেও ঠিক তেমনি। সব রকমের আয়োজন আছে,যা খুশি খাও নিয়ে। ব্রেকফাস্ট শেষে বৃষ্টি আরও বাড়লো। হঠাৎই চোখে পড়লো বিগবাস হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরাও বৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে শহর দেখব বলে চেপে বসলাম বিগবাসে। এখানে আটচল্লিশ ঘন্টার টিকিট কাটলে বেশ কম পড়ে। আমরা তাই কাটলাম,তারপর চেপে বসলাম বাসের দোতলায়। এই বাসে চড়ে তুমি সারাদিন শহরে ঘুরে বেড়াতে পারো যতক্ষণ ওদের বাস চলবে। যেখানে ওরা স্টপেজ দেবে নামো। তারপর দেখা হলে আবার উঠে পড়ো অন্য বিগ বাসে,বা ঐ বাসেও। শুধু টিকিট যত্নে রাখতে হবে।
আমরা ঘুরে ঘুরে শহর দেখতে শুরু করলাম। একটা দুটো জায়গাতে নামলেও আবার বৃষ্টির জন্য উঠে বসলাম বাসে। একটা সময় নেমে পড়লাম বাস থেকে চলে এলাম Floien এর কাছে। এটা একটা লিফ্ট ট্রেনের মত দু কামরার বাহন যা একদম নিয়ে গেল আমাদের পাহাড়ের ওপরে। এখান থেকে শহরের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। কিন্তু হায়,সেই দুষ্টু বৃষ্টি আমাদের পেছন ছাড়লো না। গায়ের রেনকোট মনে হয় উড়ে যাবে হাওয়াতে। যাক কিছুটা সময় ওখানে কাটিয়ে নীচে নেমে এলাম।
তারপর চলে এলাম আমাদের হোটেলের উল্টোদিকে বার্গেন ফিশ মার্কেট দেখতে। ভেতরে পুরোটাই এসি সুতরাং বৃষ্টি আর ঠান্ডা কোনটাই আর লাগছে না। সত্যি এ এক অবাক করা মাছের বাজার। কী নেই এখানে! চিংড়ি আর কাঁকড়া দেখে চোখ স্বার্থক হল। একদম জ্যান্ত মাছ কেটে,রেঁধে খাওয়াবে তেমন ব্যবস্থাও আছে। আছে প্যাক করে বাড়ি নেবার ব্যবস্থাও। অনেকেই কিনছেন দেখলাম, কেউ বা খাচ্ছেন। আমরাও খাবো ঠিক করেছি,এই ভেবে ওখানেই ফিস অ্যান্ড চিপস রেস্তোরাঁয় লাইন দিয়ে ঢুকলাম। অনেকেই খাচ্ছেন বিশাল বিশাল প্ল্যাটারে,তা সত্যিই দেখার মত...চিংড়ি,ঝিনুক,কাঁকড়া,শামুক,অক্টোপাস, স্কুইড কী নেই সেখানে? আমরা পেটরোগা বাঙালী তাই হজমের সাধ্য আর সামর্থ দুই অনুযায়ী অর্ডার দিলাম ফিশ অ্যান্ড চিপস এবং আইসক্রিমের। কিছুটা বাদে এলো পেল্লাই সাইজের দুইখানা ফ্রাই এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অনেকটা। বাইরে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে,বৃষ্টি আর সমুদ্রের বয়ে যাওয়া উপভোগ করতে করতে বেশ লাগছিল খেতে। স্বাদটা কিন্তু খুবই ভালো ছিল এবং পরিমাণও অনেক। শেষে আইসক্রিম খেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আর বেরোলাম না,কারণ বৃষ্টি চলছেই। ঘরে বসেই দেখলাম পথঘাট আর প্রকৃতি। তবে সেই রাতে আমি আর কিছু খাইনি ঐ মাছভাজা খেয়ে পুরো পেট ভর্তি ছিল।
পরদিন আমাদের ফ্লাইট ছিল একটু বেলার দিকে। ভোরেই ঘুম ভাঙলো,দেখলাম বৃষ্টি নেই আর। সুতরাং ব্রেকফাস্ট না করেই চলে গেলাম ওল্ডটাউন ঘুরতে। আহা ছেলে কত সাধ করে এখানে হোটেল করেছে তা একটু পায়ে হেঁটে ঘুরব না ওল্ড টাউন তা হয় নাকি?
সেদিন রবিবার ছিল,চারদিকে গাড়ি আর লোকজন কম তাই দারুণ শান্তিতে দুজনে ঘুরলাম ওল্ডটাউন আর হোয়াইট স্ট্রীটে,যেখানে সব বাড়িই সাদা। তারপর আমাদের উত্তর কলকাতার গলির থেকেও সরু গলিপথ দিয়ে একদম চলে এলাম হোটেলের কাছে। হোটেলে এসে ব্রেকফাস্ট করে হাতে যেটুকু সময় ছিল সেটাকে কাজে লাগালাম। আগের দিনের টিকিট ছিলই সুতরাং আবার চেপে বসলাম বিগবাসে। আগেরদিন যে জায়গাগুলো দেখা হয়নি নেমে সেগুলো দেখব আজ সেই উদ্দেশ্যে। আগেরদিন বারবারই চোখ আটকে গেছিল একটা পার্কে,তাই সেখানেই নেমে পড়লাম। পার্কের মাঝে একটা সুন্দর লেক,চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়ে ছোটছোট বাড়ি। লেকে অসংখ্য পাখি আর হাঁস। কেউ বা ডাঙায় উঠে ডানা শুকোচ্ছে। পার্কের নাম Bergenhus মন জুড়িয়ে গেল এখানে এসে। তারপর কিছু সময় এদিক ওদিক ঘুরে নেমে পড়লাম হোটেলের সামনে। আমাদের বার্গেনে থাকা শেষ। তবে আজীবন চোখের ক্যামেরায় ধরা থাকবে এই অপূর্ব সুন্দর শহরের ছবিগুলো। লাগেজ নিয়ে অপেক্ষা করলাম ক্যাবের জন্য,তারপর ক্যাব নিয়ে সোজা এগোলাম এয়ারপোর্টের দিকে। অনেকটা দূর হোটেল থেকে এয়ারপোর্ট, ভাড়া সত্তর ইউরো মত পড়ল।
আমাদের Wildroeর ফ্লাইট ছিল,ছাড়ার সময় ছিল দুটো বেজে কুড়ি মিনিট এবং আলিসান্দ(Alesund) পৌঁছনোর কথা তিনটে পাঁচ মিনিটে।
ফ্লাইট ছাড়লো,ওপর থেকে বার্গেনকে দেখতে অপূর্ব লাগছিল। ঠিক যেন সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো কতগুলো সুন্দর দ্বীপের মত।
********************
Alesund পৌঁছে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে এলাম এয়ারপোর্ট থেকে। আগেই বলেছি এই ট্রিপের পুরোটাই আমাদের নিজেদের প্ল্যান করা তাই আমরা দুজনেই গেছিলাম এই ট্রিপে। আর যাতায়াত করেছি শহরের মধ্যে কখনও ক্যাব আর কখনও বাসে। এখানে দেখলাম বাস দাঁড়িয়ে, হোটেলের নাম দেখালাম ড্রাইভার উঠে বসতে বললেন। বাসে ওঠার সময়েই টিকিট করে সীটে বসতে হয়। ড্রাইভার ই সবটা করেন,আর গাইডেড টুরের বাস হলে গাইড থাকেন। আমরা বেশিরভাগ টিকিট ক্রেডিট কার্ডে কেটেছি,এটাই সহজ। ড্রাইভার বললেন আমাদের একদম হোটেলের কাছেই নামিয়ে দেবেন। নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম,অনেকটাই পথ এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল বুঝতে পারলাম এই পথ ক্যাবে আসার চেয়ে বাসে আসা সাশ্রয়কারী। আর এখানকার বাস সার্ভিস অত্যন্ত ভালো।
ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে বলে দিলেন কোনদিকে আমাদের হোটেল। আমাদের গুগল ম্যাপও অন ছিল তাই কোন অসুবিধা হল না একদম সুন্দর ভাবেই পৌঁছে গেলাম হোটেলে।
Alesund এ আমাদের হোটেলের নাম ছিল কোয়ালিটি হোটেল। একদম বুটিক টাইপের সুন্দর হোটেল। আর ভীষণ ভালো ব্যবহার ওদের। লিফ্টে করে ঘরে এসে তো চোখ জুড়িয়ে গেল। হ্যাঁ একটা কথা,এখানে মালপত্র বহন করার মত কাউকে পাওয়া যায় না,খুব সীমিত হোটেলে বেল বয় থাকে। সুতরাং বেশি মালপত্র না আনাই ভালো। ঘরের জানলার পর্দা সরিয়ে যখন সোফাতে বসলাম ঠিক মনে হল যেন সমুদ্রের ওপরে বসে আছি। নীচেই নীল সমুদ্রের জল আর দূরে জাহাজ ভাসছে,চুপটি করে বসে আছে একা কোন সাথী হারা swallow. আমাদের পায়ে সরষে,যদিও পায়ের অবস্থা ভালো নয় তবুও ঐ যে চরৈবেতি কথাটা স্মরণ করি সদাই। তাই ঘরে এসে একটু কফি খেয়েই কর্তা,গিন্নি বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরে দেখতে। সমুদ্রের পাড়ে চমৎকার শহর Alesund ঘরবাড়ি যেন ছবির মত। কিছু বাড়ি রঙবেরঙের আর সেগুলো যেন ভেসে রয়েছে সমুদ্রের গায়ে। অনেকগুলো হোটেল তারমধ্যে। শান্ত নিরিবিলি শহর,চারপাশ চুপচাপ। আমরা সমুদ্রের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম পরের দিন আমাদের ফিওড ক্রুজে যাওয়া ছিল সেই জায়গাটাও দেখে নিলাম। তবে আমাদের ঘোরাঘুরি শেষে ছিপছিপে বৃষ্টি নামলো তাই আমরা একটা ছোটখাটো ক্যাফেতে চলে এলাম। এখানে অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছিলো আমরা এখানেও ফিশ অ্যান্ড চিপস আর কফি নিলাম। দেখলাম বার্গেনের তুলনায় দাম কম। খাওয়া শেষে হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। সেদিনের মত দিন শেষ হল আমাদের। পরেরদিন আবার সারাদিনের ট্যুর আছে,এখান থেকে ফিওদের পথ ধরে আমরা ক্রুজে করে যাবো Geiranger,এটা নরওয়ের একটা ছোট্ট ছবির মত গ্ৰাম। ফিওদের যাত্রাপথ খুবই সুন্দর। আর আগেই বলেছি,ফিওড হচ্ছে সমুদ্রের অংশ,যে জলধারা দুটি পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে অর্থাৎ বয়ে চলেছে গিরিখাতের মাঝখান দিয়ে। এই জল অনেক গভীর কোথাও বা পঞ্চাশ ফিট মত গভীর।
সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম নিশ্চিন্তে,এখানকার ব্রেকফাস্ট বেশ ভালো ছিল। আর বিদেশের এই সমস্ত হোটেল থেকে আপনি একটা দুটো ফল নিয়ে বেরোতেই পারেন। আমরাও নিয়েছি যা আমাদের দুপুরে পেট ভরিয়ে রাখতে সাহায্য করত। কারণ আমি সব জায়গার সবরকম খাবার খেতে পারি না,তাছাড়া অনেকটা খরচ সাপেক্ষ হয় যা অনস্বীকার্য। আমরা আগের দিন বিকেলেই দেখে এসেছিলাম পোর্টের কোন জায়গা থেকে আমাদের ক্রুজ ছাড়বে,তাই দুজনে টুকটুক করে হেঁটে চলে এলাম সেখানে। আমাদের ক্রুজ ছাড়ার সময় ছিল সকাল নটায় আর ফেরা ছিল বিকেল পাঁচটায়। মাঝে Geiranger ঘুরে দেখার জন্য সময় ছিল দুই ঘন্টা। ভাড়া পড়েছিল নরওয়ে টাকাতে দুজনের NOk 3720
কোন খাওয়া ছিল না এখানে।
এই যাত্রাপথ ছিল অসাধারণ, দুপাশে পাহাড় আর ছোট ছোট গ্ৰাম এবং ফার্ম হাউস। অনেক বাড়ি আর ফার্ম হাউস এখন abandoned কিন্তু এই দেশের সরকার এগুলো হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আগে যখন রাস্তা তৈরি হয়নি তখন এই ফিওডের পথেই মানুষজন যাতায়াত করত। এখানে আছে প্রচুর পুরোনো ফার্ম হাউস,যেগুলোর ছাদে এখন ঘাস গজিয়ে গেছে। আছে কিছু ম্যারেজ হল,যেখানে অনেক অনেক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। এগুলো সবই ক্রুজে লাগানো স্ক্রীনে দেখানো হয় সুন্দরভাবে এবং বলা হয়। বেশ অনেকটা যাবার পর এল সেভেন সিসটার্স ফলস,যে জলধারায় সাতটি জলধারা মিলিত হয়ে ঝরে পড়ছে ফিওডের জলে। এই জলধারা মে জুন মাসে দেখার মত সুন্দর। আমরা অক্টোবরে গিয়েছিলাম তাই কিছুটা শীর্ণ জলধারা।
বেশ অনেকটা সময় পরে আমরা এসে পৌঁছে গেলাম গাইরেঙ্গার গ্ৰামে। সমুদ্র আর পাহাড়ে ঘেরা এক অপূর্ব সুন্দর গ্ৰাম এটি। আমাদের ক্রুজ এসে পোর্টে দাঁড়ালো,খুব ভালো করে দেখে নিলাম কোথায় দাঁড়ালো ক্রুজ। আগেই বলেছি আমরা দুজনেই গেছিলাম, সুতরাং প্রতি মুহূর্তে সাবধানী হতে হয়েছে। বয়েসেও আমরা যুবক যুবতী নই তাই হাঁটা চলা,খাওয়া দাওয়া সব ব্যাপারেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়েছে। কারণ আমাদের ট্রিপটা অনেক দিনের ছিল।
যে ক্রুজে আমরা ফ্ল্যামে উঠেছিলাম, এই ক্রুজ সেই তুলনায় অনেক ছোট। জনা কুড়ি সহযাত্রী ছিলেন। যে যেখানে খুশি বসতে পারে। বাইরে প্রচন্ড হাওয়া ছিল,তার মধ্যেও উঠেছিলাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি।
আমরা দুজন হেঁটে এগোতে লাগলাম গ্ৰামের দিকে। অনেক মানুষ ছোট গাড়ি নিলেন,যারা গাড়ি চালাতে পারেন তাদের জন্য দুজনে চড়ার মত ছোট গাড়ি আছে যা চালিয়ে পাহাড়ে উঠতে পারেন। ওপরে একটা ঝর্ণার উৎস আছে সেটা দেখতে। আমরা হেঁটেই ঝর্ণা যেখানে ঝরে পড়ছে সেখানে গেলাম। তারপর দেখলাম সেখানে কিছু ফার্ম হাউস,যেগুলোর ছাদে ঘাস হয়েছে এবং সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সমুদ্রে ঘেরা গাইরেঙ্গার সত্যিই অপূর্ব। এভাবেই প্রকৃতি দেখে আর স্যুভেনিয়র শপে কিছুটা সময় কাটিয়ে এবং খাবার খেয়ে আমরা চলে এলাম ক্রুজের কাছে। নির্দিষ্ট সময়ে ক্রুজ ছাড়লো,আবারও স্ক্রীনে দুপাশের বর্ণনা শুনতে শুনতে এবং দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ছবির মত বাড়িঘর দিয়ে সাজানো সমুদ্রের বুকে ভাসমান শহর Alesundএ।
ফেরার পথে আমরা আবার গতদিনের ক্যাফেতেই এলাম একটু কিছু খেতে। সত্যি কথা বলতে এদেশে এসে ফিস অ্যান্ড চিপসের প্রেমে পড়ে গেছি। খেয়েদেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আমাদের পরের দিন এখান থেকে চলে যাওয়া ছিল। ফ্লাইট অনেকটাই সকালে তাই খোঁজ নিলাম বাসের। শুনলাম এখানে প্রথম বাস সকাল পাঁচটাতে আসে,সকাল না বলে খুব ভোর বলাই ভালো। কারণ তখনও আলো ফোটে না।
হোটেলের থেকে আমাদের প্যাকড ব্রেকফাস্ট দেবে বলে দিল। সুতরাং সেদিন সকাল সকাল বিছানায় চলে গেলাম। আমরা চারটে চল্লিশ নাগাদ আমাদের প্যাকড ব্রেকফাস্ট নিয়ে আমাদের লাগেজ নিয়ে চলে এলাম বাসস্ট্যান্ড,তখন ছিপছিপে বৃষ্টি পড়ছে। আমরা শেডের তলায় দাঁড়ালাম,আরও কিছু সহযাত্রী এলেন। যথাসময়ে বাস এল,আমরা উঠে পড়লাম। এয়ারপোর্ট এলাম যখন তখনও আলো ফোটেনি ভালো করে।
আমাদের ফ্লাইট ছাড়ার সময় ছিল ছটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে আর সেই ফ্লাইট ট্রনডেহেম পৌঁছনোর কথা সকাল সাড়ে সাতটায়। এখানেও আমাদের Wildroe র ফ্লাইটই ছিল। এক একজনের ভাড়া পড়েছিল বারোশো চব্বিশ নরওয়ে কারেন্সি। চেকড লাগেজ নেওয়ার পরিমাণ ছিল চব্বিশ কেজি।
আমাদের যাত্রা শুরু হল ট্রনডেহেমের উদ্দেশ্যে, এইসব ফ্লাইটে স্যান্ডউইচ,কফি এই ধরণের হাল্কা খাবার দেওয়া হয়।
ট্রনডেহেম থেকে ট্রমসো যাবার কথা ছিল আমাদের। মাঝে অনেকটা সময় আমাদের লে ওভার ছিল ট্রনডেহেমে। সকাল সাড়ে সাতটায় আমরা ট্রনডেহেমে এলাম আমাদের ট্রমসো যাবার ফ্লাইট ছিল দুটো পঞ্চান্ন মিনিটে দুপুরবেলা। সুতরাং আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম যে এই সময়টা আমরা কাজে লাগিয়ে নেব। আমরা ট্রনডেহেমের কিছু দেখার জায়গা দেখা নেব। আমাদের চেকড লাগেজ একেবারেই ট্রমসোতে পাবো,সুতরাং আমরা কেবিন ব্যাগেজ নিয়েই ট্রনডেহেম এক্সপ্লোর করতে বেরিয়ে পড়লাম। এখানে প্রতি এয়ারপোর্টের সাথেই মোটামুটি ট্রেন সার্ভিস আছে তাই আমরা একদম চলে এলাম স্টেশনে,সেখানে টিকিট কেটে উঠে পড়লাম ট্রেনে। মোটামুটি আধঘণ্টা সফরের পর পৌঁছে গেলাম শহরে। কিন্তু সেদিনও বৃষ্টি পড়ছিল তাই আমরা বাসে না উঠে একটা ক্যাব নিলাম,সেই ক্যাবে করে চলে এলাম ওল্ড ব্রীজে। এই জায়গাটা অপূর্ব সুন্দর, একদম ছবির মত সুন্দর সাজানো। ক্যানেলের দুই ধারেই রয়েছে রঙবেরঙের সুন্দর বাড়িঘর। আর ব্রীজটাও খুব সুন্দর। ব্রীজকে রক্ষা করার জন্য এখানে সাইকেল ছাড়া কোন গাড়ি চলাচল করতে দেওয়া হয় না। তখন বৃষ্টি একটু কমছে। আমরা বেশ কিছুটা সময় এখানে কাটিয়ে চলে এলাম,চার্চের কাছে হেঁটে হেঁটে। চার্চ আর ওল্ড ব্রীজ কাছাকাছি সুতরাং অসুবিধা হল না। এই চার্চের নাম Nidaros Cathedral যা Gothic Cathedral.এই ক্যাথিড্রাল বানান King Olav ll সোপস্টোন দিয়ে বানানো এই চার্চের স্থাপত্য অসাধারণ। বাইরের কারুকার্য অসাধারণ দেখতে,একদম পুরোনো রোমান গোথিক ভাস্কর্যের কথা মনে করিয়ে দেয় এই ক্যাথিড্রাল।
ভেতরটা এতটাই বড় যাতে আঠেরোশো পঞ্চাশ জন মানুষ একসাথে বসতে পারেন। এখানে দুটো মিউজিকাল অরগ্যান আছে। এগুলো কয়্যার অরগ্যান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সত্যি কথা বলতে এত বড় মিউজিক্যাল অরগ্যান আমি এর আগে কখনও দেখিনি। বাইরের কারুকার্য যেমন সুন্দর,তেমন সুন্দর ভেতরের কারুকার্য। হয়ত ঘন্টার পর ঘন্টা এখানে থাকলেও মন ভরে না। আমরাও এখানে প্রায় ঘন্টাখানেক থেকে ফেরার উদ্যোগ নিলাম। এবার ফেরার সময় আমরা বাসেই স্টেশনে চলে এলাম। তারপর টিকিট কেটে আবার চলে এলাম আমাদের ট্রেন যেখানে আসবে সেই প্ল্যাটফর্মে।
**********************
চলে এলাম এয়ারপোর্ট, তো এখান থেকে আমাদের যাত্রা এবার ট্রমসোতে। যা নরওয়ের অন্যতম সুন্দর দেখার মত শহর। এছাড়াও এখান থেকে ভালো নর্দার্ন লাইট দেখা যায়। যদিও আমাদের এই সুযোগ ঝুলছিল সুতোর গোড়ায়। কারণ এই সময় মেঘ আর বৃষ্টি থাকে। আর মেঘে আকাশ ঢাকা থাকলে তো আকাশ খেলতেই পারবে না আলোর রঙে। সুতরাং সবটাই কপালের ওপর ভরসা। ট্রনডেহেম থেকে ট্রমসো পৌঁছতে মোটামুটি দুই ঘন্টার কাছাকাছি লাগে। এখানে ফ্লাইট ভাড়া আমাদের লেগেছিল 1684 Nok আপনারা চাইলে এটাকে আমাদের ভারতীয় মুদ্রাতে কনভার্ট করে দেখতে পারেন।
ট্রমসো এয়ারপোর্ট নেমেও আমরা বাস পেয়ে গেছিলাম, ড্রাইভার বললেন একদম হোটেলের সামনে দিয়েই বাস যাবে। আর ঠিক তাই আমরা নেমে গিয়েছিলাম হোটেলের সামনেই। আমাদের হোটেলের নাম ছিল Scandic Grand একদম মেইন রাস্তার ওপরেই ছিল হোটেল। সেদিনও আবহাওয়া খুব একটা ভালো ছিল না,বৃষ্টি শুরু হল সন্ধ্যের পর থেকেই। মনটা বেশ খারাপ হল,তবে কী নর্দার্ন লাইট দেখা হবে না? আমার কর্তা হোটেলে যে মেয়েটি বসেছিল তার সাথে কথা বলে পরেরদিন সন্ধেতে একটা ট্যুর বুক করলেন। মেয়েটি বললো,আগামীকাল চান্স আছে অরোরা দেখার। যাক যা আছে কপালে এই ভেবে রাতে উল্টোদিকের ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় খেতে গেলাম দুজনে। খাবার খুবই ভালো ছিল। অনেকদিন বাদে দেশীয় খাবারের স্বাদে মন ভালো হয়ে গেল।
পরেরদিন ভোরে উঠে দেখলাম আকাশ পরিস্কার, মনটা খুশি হয়ে গেল আনন্দে। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে দুজনে শহর দেখতে বেরোলাম। ট্রমসোর ব্রীজ পেরিয়ে চলে গেলাম ওপারে ট্রমসোর আর্কটিক চার্চ দেখতে। একদম অন্যরকম দেখতে এই চার্চ আর এখান থেকে শহরের ভিউ অসাধারণ। বেশ একটু উঁচু জায়গাতে এই চার্চ এবং ত্রিভুজাকৃতির এই চার্চের বাইরের রঙ সাদা আর ভেতরে যীশুর মূর্তি এবং কারুকার্য সবই রঙীন কাঁচের কোলাজ দিয়ে বানানো। এখানেও একটা অর্গান আছে যা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং ক্যারোলে বাজানো হয়। এই চার্চের প্রবেশ মূল্য আছে। ট্রনডেহেমের চার্চেরও প্রবেশ মূল্য ছিল। আমরা এখানে বেশ কিছুটা সময় বসেছিলাম কারণ ভেতরের পরিবেশ খুবই ভালো ছিল। তারপর চারপাশটা একটু ঘুরে দেখে আবার ওখান থেকে একটা ক্যাব নিয়ে চলে আসি ব্রীজ পেরিয়ে ওপারে যেখানে আমাদের থাকার জায়গা ছিল।
তবে আমরা হোটেলে গেলাম না,এখানে একটা আইস বার কেভ আছে সেটা দেখব বলে পোর্টের সামনেটাতেই নেমে পড়লাম। এখান থেকে আমাদের হোটেল পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। যেহেতু আইস কেভ দেরিতে খোলে তাই আমরা কিছুটা সময় সমুদ্রের পাড়ে পোর্টে বসে সময় কাটালাম। তারপর চলে এলাম একটা স্যুভেনিয়র শপে,এখানে জিনিসপত্রের দাম বেশ বেশি। ছোট ছোট ম্যাগনেটের দামই আমাদের ভারতীয় মুদ্রাতে প্রায় ছশো। গরমের জামাকাপড়ের দাম মোটামুটি আমাদের মুদ্রাতে দশ বারো হাজার থেকে শুরু। আমরা কিছু ম্যাগনেট আর নরওয়ের সিম্বলিক পুতুল কিনে বেরিয়ে এলাম। ততক্ষণে আইস কেভ খুলেছে,এখানে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। ভেতরটা পুরোটাই বরফে মোড়ানো তাই আমাদের বিশেষ পোশাক পরিয়ে দিল ওরা আর হাতে গ্লাভস। আমরা যখন সুইজারল্যান্ডের জুমফ্রাও গেছি তখনও আইসকেভে গেছি সেখানে আমাদের পোশাকেই গেছিলাম তবে এখানে আমাদের পোশাকের ওপরেই পরে নিলাম ওদের দেওয়া পোশাক। তারপর এলাম ভেতরে।
আমরা অক্টোবরে গেছি তখন ট্রমসোতে বরফ ছিল না। এক সপ্তাহ বাদেই ট্রমসো সেজে উঠেছিল অন্য রূপে। তাই বরফের গুহা দেখার উৎসাহ আমাদের ছিল। ভেতরে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল। প্রথমেই বাঁ দিকে আইসকেভ বার এরিয়া,সবটাই বরফের আর তারমধ্যে সাজানো সব পানীয়। আমাদের এক পেগ করে পানীয় কমপ্লিমেন্টারি ছিল তাই ওরা আমাদের জিজ্ঞেস করল আমরা কি নেব? তারপর আমাদের পছন্দের পানীয় সুন্দরভাবে পরিবেশন করল। শুধু তাই নয় আমাদের ছবিও তুলে দিল। আমরা ঘুরে ঘুরে পুরোটা দেখতে লাগলাম,বসার জায়গা থেকে দাবার বোর্ড সবটাই বরফের। বসার জন্য সিংহাসন মত করা আছে। কোথাও আছে আবার মিশরের অনুকরণে সাজসজ্জা।
ততক্ষণে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে আমাদের, আমরা অনেকটা সময় আনন্দের সাথে সেখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। সেদিন একটু দুপুরে বিশ্রাম নেবার ছিল কারণ আমাদের রাতে অরোরা চেজিং ছিল। অবশ্য তার আগে আমরা পরেরদিনের একটা ট্রিপের টিকিট কেটে নিলাম।
পরেরদিন আমরা ট্রমসো ছাড়বো,ফ্লাইট ছিল সন্ধ্যের দিকে। হোটেল ছেড়ে দিতে হবে বারোটায় তো বাকি সময়টা তো সেই এমনিতেই যাবে। তাই আমরা প্ল্যান করলাম সোমেরয় আইল্যান্ড যাব পরের দিন। সোমারয় সমুদ্রে ঘেরা এক সুন্দর দ্বীপ,যেখানে সমুদ্রের জল এত পরিস্কার যে একদম নীচ পর্যন্ত দেখা যায়। আর আছে অনেক কোরাল এখানে,এছাড়াও বরফের গুড়ো মাখা পাহাড় আর সমুদ্রে ঘেরা এই দ্বীপের সৌন্দর্যের কোন শেষ নেই।
তাই আমরা ভাবলাম সকালে আমাদের লাগেজ নিয়ে একদম বেরিয়ে যাবো তারপর আমাদের টুর শেষে নেমে যাবো এয়ারপোর্ট। ওদের সেভাবেই বলা হল। এখানে সব কিন্তু একদম সঠিক সময়ে হয় তাই কোন অসুবিধা নেই। ওরা আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে নামিয়ে দেবে এয়ারপোর্ট বলে দিল।
হোটেলে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যের জন্য তৈরি হলাম বিকেল হতেই। একটু বেশি শীতের পোশাক পরে নিলাম সেদিন লেয়ার বাই লেয়ার সাথে নিলাম মাফলার, টুপি আর গ্লাভস।
আমরা হোটেলের রিসেপশনে অপেক্ষা করলাম। একদম ঠিক সময়ে আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড,কাম সবকিছু মানে যেটা পরে বুঝেছি তিনি এলেন। একদম বিশাল লম্বা চওড়া সুগঠিত দেহ তার।
আমরা উঠে বসলাম গাড়িতে। আমাদের সহযাত্রী বেশিরভাগ ছিলেন ফিলিপিন্সের এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা মানুষজন। এছাড়াও ছিল আরেকটি দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার।
আমরা এগোতে লাগলাম,এদিকেও একটা ব্রীজ আছে। নরওয়ের সমুদ্রের ব্রীজগুলো সবই অনেকটা একইরকম সব ব্রীজের মাঝখানের অংশ উঁচু যাতে অনায়াসে তলা দিয়ে জাহাজ যাতায়াত করতে পারে।
আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড গাড়ি চালাতে চালাতেই সুন্দর কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন। কিছুটা বাদে আমাদের গাড়ি চলে এল ফিওডের ধারে। এই ফিওডের ধারের উঁচু জায়গাগুলো সুন্দর অরোরা দেখার জন্য। কিন্তু এই জায়গাটা দেখলাম উনার পছন্দ হল না কারণ এখানে আগেই কেউ একটা আগুন জ্বালিয়ে গেছে।
আবার আমরা চলতে শুরু করলাম বাইরে একটু বাদে অন্ধকার নামলো। আকাশ সেদিন মোটামুটি পরিস্কার,আমি মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছি যেন আমাদের এই মিশন সফল হয়। সবাই ব্যাগ্ৰ হয়ে জানলায় তাকিয়ে। বেশ কিছুটা বাদে গাড়ি এসে এক জায়গায় থামলো,এটাও ফিওডের ধারে। আমাদের ড্রাইভারের নাম ছিল অ্যানড্রিউস। আমাদের গাড়ি থেকে নামতে বলে সে খুলে ফেললো গাড়ির ডিকি দেখলাম সেখান থেকে প্রথমে আগুন জ্বালানোর ফারনেস এবং কাঠ নিয়ে জড়ো করলো একটা উঁচু ঢিবি মত জায়গাতে। তারপর সেখানে আগুন জ্বালালো আর গাড়িতে থাকা দুএকজন পুরুষের সহায়তায় সে ওখানে নিয়ে গেল কিছু ফোল্ডিং বসার টুল আর খাবার দাবার এবং পানীয়র ফ্লাক্স। কিছুটা সময়ের মধ্যেই একটা দারুণ পিকনিকের আয়োজন করে ফেললো সেখানে। বেশ হিমেল একটা রাত,নীচে ফিওডের জল আর তার মাঝে একটা শুনশান জনবিহীন জায়গাতে আমরা কয়েকজন। কী অদ্ভুত রোমাঞ্চকর যে লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারব না।
আমি সত্যি কথা বলতে একটু ভয় পাচ্ছিলাম ঐ উঁচু ঢিবিতে উঠতে এই অন্ধকারে। কিন্তু ঐ যে আনড্রিউস একদম সব ব্যাপারে আমাদের ত্রাতা সে আমাকে ধরে একদম তুলে দিল টর্চের আলোতে ঢিবির ওপরে। সবাই আমরা তখন এক্সাইটেড,অরোরা দেখতে পাবো তো? অ্যানড্রিউস শিকারির চোখ রেখেছে আকাশে আর বলছে আজ একদম চান্স আছে দেখার।
আগুনের শিখা তখন উজ্জ্বল,অ্যানড্রিউস আমাদের হাতে একটা করে বারবিকিউ স্টিক আর চিকেন সসেজ দিয়ে দিয়েছে। সাথে আছে পাউরুটি,সুতরাং চিকেন গরম আগুনে একটু তাতিয়ে নাও আর পাউরুটি দিয়ে খাও। সাথে আছে চা,কফি আর হট চকোলেট যার যা পছন্দ খাও। সত্যিই অবাক লাগলো দেখে যে একজন ড্রাইভার একা এত কিছু কিভাবে অ্যারেঞ্জ করছে। বারবারই গাড়িতে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে। একটু বাদেই আমরা সবাই অনুভব করলাম সে আসছে,আকাশ চিড়ে ফিওডের ওপারের পাহাড়ের মাথার পেছন থেকে আসছে আলোর ছটা যা ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে। প্রথমে একদিক দিয়ে,তারপর আরেক দিক দিয়ে আকাশ ফুঁড়ে আসছে আলোর মালা। এর নামই অরোরা,আর এই আলো দেখে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত। যেখানে ভেবেছিলাম কোন চান্স নেই অরোরা দেখার সেখানে আলোর এই চমকে আমরা সত্যিই চমকিত। আমাদের ফোনে ধরতে চেষ্টা করলাম সেই আলোর ছটা। তবে একথা ঠিক যে খালি চোখে দেখার চেয়ে ক্যামেরায় বেশি ভালো দেখা যায় অরোরা। আর আমরা ইন্টারনেটে যে সমস্ত ছবি দেখি অনেকটাই এডিটেড।
তাই ক্যামেরার লেন্সে দেখলাম অরোরা খুবই সুন্দর ভাবে। আকাশ জুড়ে তারার মালা ভীষণ স্পষ্ট আর চারদিক দিয়ে আসছে আলোর বিচ্ছুরণ। তবে এই বিচ্ছুরণ শীতের সময় আরও সুন্দর হয় কারণ তখন আকাশে মেঘ থাকে না।
আমাদের ড্রাইভার অ্যানড্রিউস তার বিশাল ক্যামেরায় বন্দী করছে আকাশের আলোর বিচ্ছুরণ। তার সাথে সমান উৎসাহে আমাদের ফটো তুলে দিচ্ছে। অনেকেই চলে গেলেন ফিওডের ধারে ছবি তুলতে,কারণ ওখানে অরোরাকে আরও ভালো করে দেখা যাচ্ছিলো। আমরা আর নামলাম না,অ্যানড্রিউস আমাদের ওখানেই একটু নীচের দিকে নামিয়ে ছবি তুলে দিল। তবে সবটাই ওর ক্যামেরাতে। আমাদের ক্যামেরায় অরোরা ধরা পড়লেও আমাদের ছবি অন্ধকারে ভালো আসছিল না।
বললো পরে ঐ ছবি আমরা পেয়ে যাব ওদের সাইটে। বাড়ি আসার পর ছেলে হোটেদে মেইল করে ছবি উদ্ধার করেছিল। যা ছবি এসেছে তাতেই আমাদের মন খুশ কারণ আসল ছবি তো দেখে এসেছি নিজের চোখেই।
অরোরার আলোর বিচ্ছুরণ কখনও হচ্ছে,আবার কখনও মেঘ উড়ে আসছে আকাশে। তখন আরেক পাশে আলোর মালা এই করতে করতে রাত হল,আমরা আমাদের ডিনার এরমধ্যেই সেরে ফেললাম। অ্যানড্রিউস মজা করে বললো,এমনি হয় যখন তোমরা চলে যাবে তখন অরোরা বেশি করে দেখা দেবে।
কী আর করা যাবে? আমরা মোটামুটি রাত একটা পর্যন্ত ওখানে থেকে এবার সেই উঁচু জায়গাটা থেকে নামলাম। অ্যানড্রিউস মালপত্র গুছিয়ে নিল,পুরো সাফ করে দিল জায়গাটা। কে বলবে এখানে কিছুটা আগে ক্যাম্পফায়ার হচ্ছিল। আমরা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, আবার আকাশ ফুঁড়ে এলো অরোরার আলোর খেলা। সবাই দেখলাম আনন্দে তারপর খুশি মনে প্রায় রাত্রি দুটো আড়াইটে নাগাদ ফিরলাম হোটেলে।
পরদিন আমাদের ট্রমসো ছেড়ে যাওয়ার দিন,সেদিন আমরা সোমারয় যাবো মালপত্র একদম নিয়ে আর ঐ গাড়ি আমাদের ড্রপ করবে এয়ারপোর্ট।
ব্রেকফাস্ট করে সময়ের আগেই হাজির হলাম সেখানে। আট সীটের গাড়িতে আমরা ছাড়া সকলেই বিদেশী। এখানেও ড্রাইভার নিজেই গাইড,সামনে ছোট্ট স্পীকার,আগের দিনের ব্রীজটা পেরিয়ে আমরা ওপারে এলাম। রাস্তার শোভা অপূর্ব, বাঁ পাশে বেশ জঙ্গল মত। হঠাৎই আমাদের এক সহযাত্রী বলে উঠলেন রেনডিয়ার। আমরা চোখ রাখলাম রাস্তায়। একটা বড় রেনডিয়ার রাস্তা ধরে হাঁটছে। আর দলবল পেছনে। আমাদের ড্রাইভার বললেন এই বড় ডিয়ারটা হচ্ছে প্যাক লিডার। সাথে আরও বললেন আমাদের নরওয়ে মিশন সাকসেসফুল কারণ আমরা অরোরা আর রেইনডিয়ার দুইই দেখলাম। বেশ কিছু পথ এগিয়ে গাড়ি থামলো এখানে পাথরের গায়ে আঁকা রয়েছে প্রাচীন যুগের গুহাচিত্র যেগুলো সাত হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। সত্যি কথা বলতে মানুষ তখন বাইসনের পুরো ছবি আঁকতে পারেনি কিন্তু তবুও মানুষের সৃষ্টির প্রতিভা তাকে থামতে দেয়নি।
সে নিজের দেখা অনুযায়ী খোদাই করে গেছে পাথরে।
আমরা এগিয়ে চললাম,পাশেই সমুদ্র তাই একবার গাড়ি থামল একটা ভিউ পয়েন্টে। জলের রঙ অপূর্ব সুন্দর আর স্বচ্ছ। একদম নীচ পর্যন্ত দেখা যায়। জলের তলায় সাদা কোরাল আর সরু সাদা বালি। চারপাশে পাহাড় আর কনকনে ঠান্ডা হাওয়া।
এখানেও একটা সুন্দর ব্রীজ পেরিয়ে সোমারয় ঢুকতে হয়। আমাদের গাড়ি আমাদের একটা রিসর্টে নিয়ে এল একদম জলের ওপর যেন ভাসছে সেটা। এখানেই আমরা দুপুরের লাঞ্চ সারলাম। প্রথমে গিয়ে গরম কফি নিলাম আর তারপর এল আমাদের লাঞ্চ স্যুপ,একটু স্ন্যাক্স আর ব্রেড। দেখলাম গোটা গোটা বড় দানার মুসুর ডালের স্যুপ, তাতে কাটা পেঁয়াজ আর কিছু হার্বস ভাসছে। বেশ লাগলো,শরীর গরম হল। লাঞ্চ করে এবার আবার ফেরার পালা চোখ জুড়নো সোমারয় দেখতে দেখতে। ফেরার পথে একটা সুন্দর ভিউ পয়েন্টে এলাম,চারদিকের পাহাড়ে তখন ঝুরো ঝুরো বরফ,আর সামনে সমুদ্র। আমাদের গাইড বললেন এখানে স্কী করতে পর্যটকরা আসেন শীতকালে।
এবার আমরা ফেরার পথে,গাড়ি আমাদের ফেরার পথে এয়ারপোর্ট নামিয়ে দিল। আমাদের হাতে অনেকটা সময় ছিল তখনও তাই আমরা একটু স্ন্যাক্স খেয়ে বাদবাকি ফর্মালিটি সারব।
আমরা এবার নরওয়ে ছাড়ব আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আরেক নতুন দেশ সেই দেশের নাম আইসল্যান্ড। তবে আইসল্যান্ড যাবার জন্য আবার আমাদের অসলো যেতে হবে আর সেখান থেকে ফ্লাইট বদলে আইসল্যান্ড। রাতে অসলো পৌঁছবো,আর ভোরে আইসল্যান্ড যাবার ফ্লাইট। হাতে খুব বেশি সময় না,ঐ সময়টা কোনভাবে এয়ারপোর্টে কাটিয়ে দিলেই হত তবে ছেলে মানলো না। সে আগেই রাতের কিছু সময়ের জন্য এয়ারপোর্টের কাছাকাছি আমাদের একটা হোটেল বুক করে দিয়েছিল।
এয়ারপোর্ট থেকে যে গাড়িতে হোটেলে গেলাম তা দেখে তো আমি সত্যিই অবাক। হোটেলে পৌঁছতে মোটামুটি দশটার কাছাকাছি বাজলো। পরেরদিন ছটা পনেরোতে আমাদের ফ্লাইট। ঠিক করেছি সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে যাবো হোটেল থেকে তাই সেই অনুযায়ী হোটেলে গাড়ির কথা বলে রাখলাম। আর ওরা বলে দিল আমাদের প্যাকড ব্রেকফাস্ট দিয়ে দেবে।
**************************
একটু কিছু খেয়ে শরীর এলিয়ে দিলাম ভোরে উঠবো বলে। পরদিন অন্ধকারের মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের দিকে। গাড়ি সময়েই এসেছিল। আমাদের অসলো থেকে আইসল্যান্ড যেতে সময় লাগবে একঘন্টা মত। যাক সব ফর্মালিটি সেরে উঠে বসলাম ফ্লাইটে। আমরা যাব রেইকাভিক। রেইকাভিক যখন পৌঁছলাম তখনও ভালো করে সেখানে আলো ফোটেনি। আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই বাস পেয়ে গেলাম তবে সেই বাসে করে বেশ কিছুটা আসার পর একটা ডিপো পড়লো সেখানে এসে আমাদের আবার বাস বদল করতে হল। এখানে এটাই নিয়ম। আমাদের হোটেলের নাম দেখিয়ে উঠে পড়লাম বাসে। মোটামুটি আধঘণ্টা সফরের পর ওরা আমাদের একটা বাসস্টপে নামালো দেখলাম আমাদের হোটেল একদম পাশেই সুতরাং চলে এলাম হোটেলে। কিন্তু তখনও চেক ইনের সময় হয়নি তাই আমরা মালপত্র রেখে বেরোলাম ঘুরতে। দেখলাম আবহাওয়া ভালো না একদমই তাই বিগবাসে উঠে শহর ঘুরবো ঠিক করলাম।
বিগবাসে উঠে শহর ঘুরতে শুরু করলাম,এখানের ল্যান্ডমার্ক এখানকার চার্চ যা দেখতে সম্পূর্ণ অন্যরকম। এছাড়া এখানে আছে একটা অদ্ভুত সুন্দর দেখতে নৌকো যা একদম সমুদ্রের ধারে আছে। সেখানেও অনেকে ছবি তোলেন। আমরাও বাস থেকে নেমে সেখানে ছবি তুললাম। তারপর আবার বাসে করে উঠে কিছুটা সময় শহর ঘোরাঘুরি করে চলে এলাম আইসল্যান্ডিক চার্চের কাছে। চার্চের স্থাপত্য অসাধারণ,ভেতরে অর্গান আছে। আমরা কিছুটা সময় সেটা দেখে টিকিট কেটে উঠে পড়লাম লিফ্টে করে চার্চের একদম ওপর তলায়। এখানে আছে বিশাল ঘন্টা যা প্রতি ঘন্টায় আর আধ ঘন্টাতে বাজে।
চারপাশে জানলা করা আছে যেগুলো দিয়ে খুবই সুন্দর বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। একদম পুরো রেইকাভিক শহরকে দেখা যায় সুন্দরভাবে।
ওপরে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা নেমে এলাম নীচে। তারপর চার্চ থেকে বেরিয়ে অপেক্ষা করলাম বিগবাসের জন্য,কিন্তু তার দেখা না পেয়ে অগত্যা ক্যাব ধরলাম কারণ বাইরে তখন বেশ জোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ক্যাবে করে অল্প সময়েই হোটেলে পৌঁছে গেলাম। ততক্ষণে আমাদের ঘরও দিয়ে দিয়েছে। বেড়াতে গেলে ক্লান্ত হওয়া মানা তাই আমরাও একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম অনেকটা সময়ের জার্নির পর,চুমুক দিলাম গরম কফিতে।জানলায় বসে দেখলাম বাইরেটা,একটু মন খারাপ হল কারণ বৃষ্টি তখনও পড়ছে। খানিক বাদে বিকেল হল কর্তা বায়না করলেন ঘরে বসে কী করবে চলো ঘুরে আসি রেনবো স্ট্রীটে। সুতরাং আবার ক্যাব বুক করলাম,ততক্ষণে বৃষ্টি একটু বিরাম নিয়েছে। আমাদের হোটেল থেকে রেনবো স্ট্রীট খুব দূর নয় তাই অল্প সময়ে চলে এলাম।আমরা এখনকার জেনারেশনের মত ম্যাপে খুব একটা দক্ষ নই তাই একটু বোকা বনলাম,আরে এই রাস্তা তো চার্চের উল্টোদিকেই ছিল।
রেনবো স্ট্রীটের পথ শুধু হাঁটার জন্য। রামধনু রঙ করা হয়েছে পথকে। চারদিকে ফুলে আর গাছে সাজানো সুন্দর পথ। দুপাশে আছে দোকান আর রেস্তোরাঁ। অনেকেই দারুণ মজাতে ফটোশুট করছেন। আমরাও ছবি তুলে চলে এলাম একটা রেস্তোরাঁয়,এখানে এসে আবার ফিস অ্যান্ড চিপসের অর্ডার দিলাম। এখানকার মাছ খুবই ভালো তাই এখানে এসে সবাই মোটামুটি মাছের নানা পদ খাচ্ছেন।
ততক্ষণে সন্ধ্যে নামলো,সন্ধ্যেবেলায় আইসল্যান্ডিক চার্চকে আলোতে সাজানো হয়েছে এবং সেই রং বদল হয়েছে তাই দেখতে অসাধারণ লাগছে। তখন ক্যাব পেতে বেশ অসুবিধা হল কারণ বৃষ্টি নেমেছে আবার। যাক অবশেষে একটা ক্যাব পেয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। এবার সত্যি ক্লান্ত লাগছে তাই শরীর এলিয়ে দিলাম বিছানায়। আমাদের এখানকার হোটেলের নাম ছিল মিডগার্ডার সেন্ট্রাল হোটেল।
পরের দিন আমাদের ট্রিপ ছিল আমরা পরের দিন ডায়মন্ড বিচ,গ্লেসিয়ার লেগুন আর ব্ল্যাক বীচ দেখতে যাবো তার সাথে ছিল সেলজাল্যান্ডফস নামে জলপ্রপাত দেখা। নির্দিষ্ট সময়ে পরের দিন প্রথমে একটা ছোট বাস এল তারপর সেই বাসে করে আমরা বাসডিপোতে গিয়ে বড় বাসে উঠলাম। এখানে বাসে বসলে অবশ্যই সীটবেল্ট পড়তে হয় না হলে চলবে না। ক্যাবেও পেছনে বসলেও দুজনকেই সীটবেল্ট লাগাতে হয়।
যাত্রা শুরু হল কিছুটা যাবার পর মনে হল যেন এক অন্য জগতে এসে পড়েছে। পুরো ভূমিটাই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত থেকে সৃষ্ট,চারদিকেই কালো কালো শক্ত জমাট লাভার পাহাড় আর গাছপালা বিহীন পাথুরে ভূমি যেখানে পাথরের ওপর শুধু মস হয়ে আছে। এই অন্যরকম ভূমিরূপ দেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে। মাইলের পর মাইল গোল গোল পাথরের ওপর জমেছে মস আর পাহাড়। মাঝে মাঝেই পাহাড়গুলো থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়া। তাই বোধহয় এই দেশকে ল্যান্ড অফ আইস অ্যান্ড ফায়ার বলা হয়।
অনেকটা যাবার পর আমাদের গাড়ি একটা ক্যাফেতে দাঁড়ালো একটু ব্রেক নিতে তারপর আবার এগিয়ে যাওয়া প্রথমেই এলাম আমরা ফলসের কাছে। অপূর্ব সুন্দর জলধারা ঝরে পড়ছে বেগে পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে। রোদ নেই,আবহাওয়া খারাপ তাই নাহলে এখানে জলধারায় রামধনু দেখা যায় আলোর বিচ্ছুরণে। অনেকেই স্নানের পোশাক পরে চলে গেলেন ভিজবেন বলে। আমরা অতটা সাহসী নই,তারপর দুজনে এসেছি তাই দূর থেকেই উপভোগ করলাম এখানকার সৌন্দর্য।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ডায়মন্ড বীচ,বাস থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম কালো বীচে ছড়ানো বড় বড় হীরে। কী ভাবছেন বড় বড় হীরে! আরে না,হীরের মত স্বচ্ছ বরফ ছড়ানো বীচে আর কিছু ভাবছে সমুদ্রে। ডায়মন্ড বীচের কাছেই আছে গ্লেসিয়ার লেগুন আমরা সেখানেও যাবো। আবহাওয়া তখন বেশ ভালো, আমরা খুবই আনন্দ করলাম ডায়মন্ড বীচে,ছবিও তুললাম আর মুগ্ধ হয়ে দেখলাম প্রকৃতিকে।
এরপর আমরা গেলাম গ্লেসিয়ার লেগুনের কাছে। আহা কী অপূর্ব রূপ,ঠিক যেন মনে হচ্ছে অ্যান্টার্টিকায় এসে গেছি অথবা কোন বিদেশী মুভির দৃশ্য দেখছি। চোখ ফেরানো যায় না। নীল জলে ভাসছে নীলচে আভা মাখা বরফ,কোথাও আবার তার গায়ে কালচে কালচে আগ্নেয়গিরির উড়ে আসা ছাইয়ের রেখা। এখানে গ্লেসিয়ার লেগুনের ট্যুর হয়,আমাদের ট্যুর ইনক্লুডেড ছিল। দেখলাম চাকা লাগানো বোট স্থলভাগ থেকে গড়িয়ে আসছে,এই বোটই আমাদের নিয়ে জলে নামবে। আমরা উঠে পড়লাম, শুরু হল আমাদের সফর। আহা এই দৃশ্য জন্মজন্মান্তরেও ভুলিবার নয়। নীল জলে মাথা তুলে রয়েছে বিরাট বিরাট গ্লেসিয়ার, সৌন্দর্য যে কী অপরূপ তা বলতে পারব না।
প্রায় ঘন্টাখানেক ভেসে রইলাম লেগুনে,চোখের পাতা পড়ল না যেন। হঠাৎই দেখলাম গ্লেসিয়ারে সিল রোদ পোহাচ্ছে। এভাবেই শেষ হল স্বপ্নের মত যাত্রাপথ। আবার আমাদের বাস চলতে শুরু করল পরবর্তী গন্তব্য ব্ল্যাকবীচ,তবে ব্ল্যাকবীচে পৌঁছাতে প্রায় বেলা পড়ে এল,তার সাথে মেঘলা আকাশ,হাওয়া আর টিপটিপ বৃষ্টি। গাইড সময় দিলেন খুব কম,মাত্র পনেরো মিনিট আর বারবার সাবধান করে দিলেন সমুদ্রের কাছে না যেতে। কারণ এখানে সমুদ্র বড়ই খামখেয়ালী,কখন রেগে যাবে কেউ বলতে পারে না। ব্ল্যাকবীচ পুরোটাই সৃষ্টি হয়েছে আগ্নেয়গিরির ছাই থেকে। আর সংলগ্ন গুহা আর বড় বড় পাথরের স্ল্যাব মত সবই সৃষ্টি হয়েছে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে। এখানকার বীচে পা রেখে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল,অসাধারণ কালো ছাই মাখা বালির রঙ। কিছুটা সময় ওখানে কাটিয়ে চলে এলাম গাড়িতে। কিছুটা বাদেই আঁধার নামলো। আমাদের হোটেলে পৌঁছতে প্রায় আটটা বাজলো,পরেরদিন আরেকটা ট্যুর আছে আমাদের তাই খাওয়াদাওয়া সেরে ফ্রেশ হয়ে বিছানা নিলাম। আইসল্যান্ডের হোটেলে আমাদের থাকার মেয়াদ তিন রাত্রির ছিল। এখানে সব কিছুই বেশ কস্টলি তাই হোটেলের ঘরও ছিল অন্য জায়গার চেয়ে তুলনামূলক একটু ছোট। তবে অন্যান্য সব ব্যবস্থা ভালোই ছিল।
পরেরদিন সকালে আমরা রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট করে হোটেলের সংলগ্ন বাসস্টপে দাঁড়ালাম। এখান থেকেই আমাদের পিকআপ ছিল।
নির্দিষ্ট সময়ের বেশ পরে বাস এল,মানে একটু লেট করল। আজ এখানকার আবহাওয়া বেশ খারাপ,বৃষ্টি হয়েছে সারারাত আর সকালেও বৃষ্টি চলছে। কিছু করার নেই আমাদের যেতেই হবে সুতরাং বৃষ্টির সাথে লড়াই করব বলে রেইনকোট ইত্যাদি নিয়েই বেরিয়েছি।
যাত্রাপথ খুবই সুন্দর,কিন্তু বৃষ্টির জন্য কাঁচ ঝাপসা তাই ছবি তুলতে পারলাম না। আমাদের গাড়ি বেশ কিছুটা চলার পর এসে দাঁড়ালো একটা ক্যাফে কাম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। গাইড আমাদের অনুসরণ করতে বললেন,এখানে কাঁচ পাতা আছে আর কাঁচের তলা দিয়ে খুব সুন্দর ভাবে ইউরোপ আর আমেরিকার প্লেট দেখা যায়। সত্যিই এক অবাক করা ব্যাপার। অনেকেই লাফ দিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাবার আনন্দ উপভোগ করছেন আমরাও করলাম।
আবার যাত্রা শুরু,এবার গাড়ি এসে দাঁড়ালো গিজার দেখাবে বলে। অবাক হবেন শুনে গিজার আবার কী? এই গীজার প্রাকৃতিক, মানে মাটির তলায় এখনও জায়গায় জায়গায় আছে আগ্নেয়গিরি উত্তপ্ত অবস্থায় আর তার উত্তাপেই ওপরের জল ফুটছে। কিছু জায়গাতে ভুস করে বাষ্প বিস্ফোরণ হয়ে অনেকটা সালফার মেশানো ধোঁয়া হয়ে বেরোচ্ছে। একটা জায়গাতে বেশ বড়সড় একটা ফুটন্ত গিজারের বাষ্প বেরোচ্ছে প্রতি দশ থেকে পনেরো মিনিট পরপরই আমরাও অপেক্ষা করলাম দেখব বলে। সত্যিই অবাক করা দৃশ্য। এক জায়গাতে জলে হাত দিয়ে দেখলাম জল ঠান্ডা,আমি ভেবেছিলাম গরম হবে। এই হচ্ছে আইসল্যান্ডিক ম্যাজিক যেখানে চলে বরফ আর আগুনের খেলা।
এরপরের গন্তব্য ছিল একটা গোল উল্টোনো কড়াইয়ের মত লেক দেখতে যাওয়া। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই লেক যার নাম ক্রেটার ট্রেইল। অনেকে নীচে নেমেছেন, তবে আমাদের গাইড ওপর থেকেই দেখতে বললেন। চারদিকে লাল শক্ত পাথর আর মাঝখানে সবুজ জলের গোল লেক অদ্ভুত সুন্দর।
তখন আবহাওয়া মোটামুটি ভালো হয়েছে। এরপর আবার যাত্রা শুরু করলাম কিছুটা বাদে পৌঁছে গেলাম এই ট্যুরের অন্যতম আকর্ষণ গালফস জলপ্রপাত দেখতে। এখানে পৌঁছনোর পর শুরু হল বৃষ্টি আর সাথে তীব্র হাওয়া। অনেকেই নীচে নামলেন কাছ থেকে এই জলরাশির সৌন্দর্য দেখতে। আমরা ওপরের ভিউ পয়েন্ট থেকেই উপভোগ করলাম এর সৌন্দর্য। চারদিকে কালো পাথুরে ভূমি আর তার মাঝে মাঝে পাথরের মধ্যে জন্মেছে মস এবং এরই মাঝ দিয়ে গভীর গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বেয়ে নীচে ঝরে পড়েছে এক উন্মত্ত সুন্দরী ঝর্ণা। এখানে কেউ পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই। তবে বৃষ্টির জন্য এখানেও সূর্যের ছটায় সৃষ্টি হওয়া রামধনুর রঙ আমরা মিস করলাম। তবে যা দেখলাম আর জলরাশির গর্জন শুনলাম তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজকের ট্রিপে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল Thingvellir National Park.
রেইকিয়াভিক থেকে ৪৯ কিমি পূর্বে অবস্থিতথিংভেলির জাতীয় উদ্যান, একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান , যা তার অপরিসীম ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের জন্য পরিচিত আইসল্যান্ডের একটি প্রধান আকর্ষণ। মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরার উপর অবস্থিত হওয়ায়, দর্শনার্থীরা উত্তর আমেরিকান এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন। ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আইসল্যান্ডের প্রথম সংসদ (আলথিংগি)-এর স্থান হওয়ায়, এটি গভীর সাংস্কৃতিক মূল্য বহন করে।
Comments
Post a Comment