এখনকার প্রজন্ম শৈশবেই মানসিক চাপ নিতে পারছে না,যার ফল হচ্ছে আত্মহত্যা এই খবরগুলো সংবাদমাধ্যমে আর ফেসবুকে দেখছি কদিন ধরে। আর যখন দেখছি এইজন্য শিক্ষক সমাজ দায়ী নিজেরও খারাপ লাগছে খুবই। এক্ষেত্রে শিক্ষক সমাজের প্রতি যেমন সতর্কীকরণ বার্তা যায় যে কোন ছাত্র বা ছাত্রীর প্রতি যে কোন কারণেই হোক প্রতিশোধমূলক আচরণ এতটাই হবে না যে সে তার শিক্ষাপ্রাঙ্গণকে জেলখানা বলে মনে করে। আমি নিজের ছাত্রীজীবনেও অনেক শিক্ষককে দেখেছি যারা সবসময় পক্ষপাতে অভ্যস্ত,আমাদের সময়ে মারধোরও ছিল সুতরাং কোন এক বিশেষ ছাত্র প্রায়শঃই নিগ্ৰহ এবং মারধোরের শিকার হত। এখন যেমন বাড়ির অভিভাবক,মিডিয়া অনেক সচেতন সে সময় টিচার মেরে পিঠের ছাল তুলে দিলেও ছেলেটির বলার তেমন জায়গা ছিল না। আবার কখনও অভিভাবকদের দল বেঁধে অকারণে টিচারকে কোন রাজনৈতিক কারণে হেনস্থা করতেও দেখেছি।
আমার সময় গেল,ছেলের স্কুল শুরু হল। দেখলাম পক্ষপাতিত্ব এবং টিউশনলোভী একদল শিক্ষক রয়েই গেলেন তখনও। টিউশন যদি তাঁর কাছে না পড়ো তাহলেই তুমি স্যারের নজরে কালো ভেড়া,রাগ এবং অত্যাচারের শিকার। এই শাসনে বিগড়োত ছেলেপুলে কারণ আমাদের মত কড়া অভিভাবক যাদের বাড়িতে তারা বাড়িতে এসব কথা খুব একটা বলত না। বাড়িতে লুকোনো এবং কড়া শাসনে একটা সময় তাদের বন্ধুত্ব হত মিথ্যের সাথে। অকারণে দোষী সাব্যস্ত হতে হতে ছোটখাটো কুকর্ম করতে অভ্যস্ত হত। এতো গেল ছাত্র যদি একটু সাহসী হয় তাদের কথা,যারা ভীতু অতটা চাপ নেওয়ার ক্ষমতা নেই তারা কী করবে?
তারা চুপচাপ হয়ে যায়,ভয় পায়,লজ্জা পায় ক্লাসরুমে বুলি হতে অগত্যা মায়ের কাছে বলে আর স্কুলে যেতে চায় না। মা চিন্তায় পড়েন কোথায় ভর্তি হবে এই সময়ে ছেলে? সুতরাং ঐ বুঝিসুঝিয়ে স্কুলে পাঠানো..কোণঠাসা ছাত্রকে আরও কোণঠাসা করে মজা পান শিক্ষক কখনও সহপাঠীরা। সবাই পারে না লড়তে তখন হেরোরা মরে যায়..কী হয় সমাজের? কিস্যু না,কত মানুষই তো মরছে। শুধু যার যায় তারই যায়।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা হল,সেই কবেই দৈহিক শাস্তি তো বন্ধ হয়েছেই তার সাথে বন্ধ হয়েছে মুখেও তাকে কোন খারাপ কথা বলা যাবে না যাতে সে মানসিকভাবে হেনস্থা হয়। মানে ঐ গাধা,গরু,ছাগল তোর মাথায় গোবর ভরা যা হাল চাষ কর ইত্যাদি। যা আমরা শুনেছি ঘরে বাইরে,আমার বাবা বলতেন ছাত্রদের যাদের মোষ ছিল. ' যাকে ভইসকো দুম মটকা। তোর পড়াশুনা কিচ্ছু হবে না।'
ছেলেটা মাথা নীচু করে থাকত,অন্য ছেলেরা হাসলে বকা খেত। আবার স্কুল ছুটির পর বিকেলে সেই ছেলেটাই এসে আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলত,' দিদিমণি মাস্টারমশাই বলেছেন বাজার থেকে আলু আনতে ব্যাগ দিন।' না ওদের মানসিক হেনস্থা হত না কারণ ওরা সন্ধ্যেবেলায় বাবার কাছে বিনা পয়সাতে ইংরেজী গ্ৰামার শিখতে আসত। বাবা ওদের খাতায় ছবির মত ফর্মূলা লিখে টেন্স শেখাতেন। ওদের বাবারা বলে যেতেন মাস্টারমশাই আপনার ছেলে যা খুশি করবেন,শুধু দেখবেন পরীক্ষাতে পাশ যেন হয়ে যায়।
পরীক্ষাতে পাশ হওয়া নিয়ে আমাদের ওয়েস্টবেঙ্গল বোর্ডের স্কুলগুলোতে আর ছাত্রছাত্রীদের চাপ নেই। চাপে থাকি আমাদের মত অখ্যাত বাংলা মাধ্যমে পড়ানো শিক্ষক শিক্ষিকারা। ওরা জানে কিছু না শিখেই আমরা গড়গড় করে এসকেলেটারে চেপে উঠে পড়বো কেলাশ এইট থেকে নাইনে..তারপর এইট কেলাশ পাশ করেছি সেই সাটিফিটিখানা নিয়ে ঢুকে পড়ব কোন কাজে। যাকে জিঞ্জাসা করি সেই বলে বিউটিশিয়ান হবে..মনে মনে বলি আহা বেশ বেশ তাই বা কম কী? ক্লাশ টেনে বোর্ডে লিখছি,পেছনে বয়ফ্রেন্ড কিস্যা চলছে। বললাম,' তোমরা এতগুলো মেয়ে মিলে যদি কথা বল,আমি কী করে কাজ করি বল তো? লেখো চুপ করে। নিজেরা যখন টিচার হবে তখন বুঝবে।'
- ' চটজলদি উত্তর এল,আমাদের দরকার নেই টিচার হওয়ার। আরেকজন বললো,চাই না টিচার হতে।'
রাগ করে বললাম,'পাবি টিচারের চাকরি তবে তো।'
-' আমাদের দরকার নেই পাবার।' অসম্মানিত হয়ে চুপ করে আবার লিখতে শুরু করলাম।
ক্লাশে পড়াতে মন দেয় না,লেখে না চুপ করে বসে থাকে। বললে বলে লিখব না। একটু জোরে বললে খাতা বন্ধ করে বলে বেশ করব লিখব না। স্কুলে গরহাজির থাকে প্রায়দিন,আমাদের সময়ে দূর আমাদের ছেলেমেয়েদের কোনদিন টিচার বাড়িতে ফোন করে ডাকবে ভাবিইনি। খোদ কলকতায় ছাত্রীদের বাড়িতে ফোন করে ডাকা হয় মানে চেষ্টা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা এবং অভিভাবিকারা ফোন ধরে না। একবছর স্কুলে গরহাজির থেকে আবার হঠাৎই একদিন আসে পড়বে বলে..আমরা ধন্য হয়ে যাই পরে দেখি পঁচিশ হাজারের জন্য আগমন। আর কী শেখাতে পারছি তা নাইবা বললাম,পাশ করতে হবে ওদের সে দায় ওদের নয়। আমাদের দায় পাশ করানোর।
এবার আসি মানসিক চাপ প্রসঙ্গে,মা টিভি দেখতে দিচ্ছে না,হাতে ফোন দিচ্ছে না সুইসাইড। পড়াশোনা করব না,রীল বানাবো রোজগার করব। পড়াশোনাতে অনেক চাপ,এত চাপ আর নেব না। পড়াশোনা শিখে রোজগারে অনেক চাপ। স্কুলে পরীক্ষার আগে আমাদের চাপ থাকত পাশের,ওদের নেই। পরীক্ষায় বড় বড় উত্তর লেখার হাত থেকে রেহাই। গার্ড দিতে গিয়ে দেখলাম কোশ্চেন পেপারের আর্ধেক মোটামুটি আমাদের হোমওয়ার্ক.. অথচ সেই মান্ধাতা কালে আমাদের ইয়া মোটা মোটা খাতা হয়ে যেত উত্তর লিখতে লিখতে,ফুলে উঠত মাঝের আঙুলের মাথা। স্কুলের পড়া নিয়ে চাপ নেই,এরপর সব পরীক্ষাই উঠে যাবে। আহা বাচ্চাদের বড় চাপ হচ্ছে এই ভেবে।খাওয়া দাওয়া আসছে পছন্দমত,হাতের কাছে ট্যাব,ফোন,স্মার্ট টিভি। বাড়িতে কোন চড়চাপড় নেই বিন্দাস জীবন,বকলে মারলে যদি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ে। কাউকে কাউকে আবার বলতে শুনি আমার মেয়েকে কোনদিনই বকতে মারতে হয়নি,পরে দেখেছি কোন সহবত শিক্ষাই হয়নি মেয়ের।
আমার মতে মানসিক চাপ নিতে অভ্যস্ত হওয়া উচিত সবারই কারণ দিন একভাবে কখনও কারও যায় না। আমরা চড় চাপড় বা ঠ্যাঙানি খেয়ে মরে যাবো এই কথাটা বলার উপায় ছিল না বললেই শুনতে হত এইসব সমাজের আবর্জনা বিদায় হওয়াই ভালো। তখনকার দিনে বাড়ি থেকে চলে যাবোর উত্তর ছিল দরজা খুলে দিয়ে এক্ষুনি বেরো বাড়ি থেকে হতভাগা বাঁদর। জুতোপেটা বা খড়মপেটা খায়নি এমন ছেলেপুলে কমই ছিল। আমার ঠাকুরদার ডায়ালগ ছিল খড়মপেটা করব,তাঁর পায়ে থাকত খড়ম। ছেলেমেয়েদের ছোট থেকেই অনেক দায়িত্বও নিতে হত সংসারের,এখনকার ছেলেমেয়েরা আর বড় হয় না..মা বাবারও বয়েস হয় না তাঁদের রিটায়ারমেন্টও হয় না। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের এক চাপমুক্ত জীবন দিতে চাই সারাক্ষণই বলি ওদের খুব চাপ,আমাদের দিনের মত কী আর এখন নাকি?
সত্যিই কী আমাদের জীবনে কোন চাপ ছিল না? নাকি আমাদের সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থাটা একদমই ফেলনা ছিল? আমাদের আরও অনেক পেছনে এই ভারতবর্ষে যে সব মনীষীদের জন্ম হয়েছিল তাঁদের জীবনে কোন সমস্যা আর চাপ ছিল না?
সত্যিই জীবন তখন অনেক কঠিন ছিল,তবে মানুষগুলো ছিল সরল তাদের তখনও আত্মকেন্দ্রিকতা আর আত্মসুখের দৈত্যগুলো গ্ৰাস করতে পারেনি। ছয় মাসের শিশু তখন কার্টুন দেখে সেরেল্যাক খেত না,চার বছরের বাচ্চা মেয়েটা একা একা বসে চিপস চিবোতে চিবোতে আয়ার সাথে বসে সিরিয়াল দেখত না। আমরা নিজেরা যত সুখ চেয়েছি চাপ তত বেড়েছে,যত জিনিস এনেছি জীবনে চাপ তত বেড়েছে,যত বেশি সম্পর্কে জড়িয়েছি চাপ তত বেড়েছে,যত বেশি জেনেছি চাপ তত বেড়েছে,যত একা হয়েছি ভালো থাকব বলে চাপ তত বেড়েছে। শুধু আমরা বুঝতে পারিনি। নিজেদের জীবনে যা পাইনি তা সন্তানকে বেশি করে দিতে চেয়ে কোথাও গিয়ে তাদের জেতার আনন্দে মশগুল করে দিচ্ছি না তো? জেতার সাথে সাথে হারটা মেনে নিতে শেখানোও জরুরী,পাওয়ার পাশাপাশি দিতে শেখানোটাও জরুরী। হিসেবী হতে শেখানোর পাশাপাশি তুমি কতটা পাচ্ছো আর কতটা দিচ্ছো তা বোঝানোও জরুরী। আর তেমনি শিখতে হবে চাপ নিতেও কারণ এটাই জীবন সব কিছু তোমার ইচ্ছেমত বা পছন্দমত হবে না,তোমাকে কমফোর্ট জোন নিজেকে বানাতে শিখতে হবে। হার মানলে তো তুমি হেরো,তার থেকে লড়াই করে নিজের জীবনের হিরো হও নিজেই।
Comments
Post a Comment