কাবেরীর বিয়ের সময় একখানা বিরাট খাট দিয়েছিলেন বাবা,ঠিক যেন ফুটবল খেলার মাঠ। সত্যি কথা বলতে তখন নিজের বিয়ের শাড়ি,গয়না বা আসবাব তেমন পছন্দের কোন বালাই ছিল না। ঐ ওঠ ছুড়ি তোর বের মত অবস্থা। মায়েরা মাসি পিসিদের সাথে মিলেমিশে কিনতেন কয়েকটা শাড়ি,আর একখানা লাল টুকটুকে বেনারসী,না হলে কখনও কালচে লাল একটু চাপা রঙের মেয়েদের জন্য। ব্যাস মায়ের গয়নার বাক্সের কিছু গয়না আর স্যাকরার দোকানের গয়নাগাটি,বাবার পছন্দের খাট আলমারি,ড্রেসিং টেবিলে লোকজন খাইয়ে মোটামুটি বিয়েটা হয়ে যেত। বিয়ের আগে এখনকার মত নানা বাঙালী আর অবাঙ্গালী অনুষ্ঠানের মিলমিশ তখন ছিল না।
কাবেরী শ্বশুরবাড়ি এল,ওর ঘরে পাতা হল বাবার দেওয়া সেই বড় খাটখানা,আলমারি আর ড্রেসিং টেবিল। ফুলশয্যার রাতে সেই আয়নাতে নিজেকে দেখেছিল কাবেরী,তারপর এসে বসেছিল সাজানো খাটে। তবে ফুলশয্যার রাতে প্রকাশ তাকে বুকের মাঝটায় জাপ্টে ধরে রাতের অনেকটা সময় কাটিয়ে দিয়েছিল। রজনীগন্ধার সুবাস আর ভালোবাসার বাস দুইয়ে মিলে একটা ঘোরে কেটে গিয়েছিল রাতটা। প্রকাশ বলেছিল,'তোমার গায়ে কী মিষ্টি গন্ধ! কী মাখো তুমি?' একটু লজ্জা পেয়েছিল কাবেরী তারপর বলেছিল আজ গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছিল সাজানোর সময়। আমার খুব একটা গন্ধ মাখার অভ্যেস নেই..কখনও বিয়েবাড়ি গেলে মেখেছি। আমার তো ভালো লাগে মায়ের শাড়ির আর গায়ের গন্ধ,কেমন যেন মনকেমন করা আর ঠান্ডা ঠান্ডা।
প্রকাশ বলেছিল,' আর আমার ভালো লাগছে তোমার গায়ের গন্ধ,কেমন যেন মাতাল করা সুবাস। মনে হচ্ছে জড়িয়ে ধরে রাখি এভাবেই সারাক্ষণ বুকের মাঝে।'
লজ্জা পেয়েছিল কাবেরী তবে ধরা দিয়েছিল নিবিড় বাহুবন্ধনে,আর পেয়েছিল এক অপরিচিত গন্ধ। যে গন্ধ পেতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছিল তারপর থেকে।
বাবার দেওয়া বড় খাটখানায় তখন যেন অনেক জায়গা পড়ে থাকত ফাঁকা,দুটো শরীর প্রতি রাতেই গায়ে গায়ে ঘেঁষে শুয়ে থাকত তখন। একে অপরের খুব কাছাকাছি আর একদম গায়ে গায়ে। বরের বুকের কাছটিতে না শুলে ঘুম আসত না কাবেরীর,প্রকাশ মাথায় হাত বুলিয়ে কত ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে তাকে।
একটা সময়ে সেই খাট ভরলো তবুও প্রকাশের গায়ের কাছটিতে না শুলে যেন কাবেরীর ঘুম আসত না। সারাদিনের কতশত কাজের পর ছিল ঐটুকুই তার একান্ত আদরমাখা আশ্রয়। প্রকাশ কাছে টানলে বলত,'আজ বড্ড গরম,গা ধুয়ে এসেছি তবুও কী ঘাম আর গায়ে ঘামের গন্ধ।'
-' ওটাই তো আমার প্রিয়।'
-' কী,আমার ঘামের গন্ধ! তুমি একটা যাচ্ছেতাই।'
-' না,তোমার গায়ের সোদা গন্ধ।'
কাবেরী আবার আদরে জড়াতো প্রকাশকে হয়ত বা এক নিশ্চিন্ত অবলম্বনেও।
********************
বদলেছে ছবি,কাবেরীর বাবার দেওয়া সেই খাটে এখন যেন বড় জায়গা কম। আরও বেশি জায়গা হলে বোধহয় ভালো হত। নাকি খাটটা এত বড় না হলেই হয়ত ভালো হত। আজকাল এক শূন্যতা ঘিরে ধরে কাবেরীকে এই খাটে শুলেই। কাবেরীর ছোঁয়া বাঁচিয়ে প্রকাশ শুয়ে থাকে খাটের এক কোণে,অভিমানী কাবেরী প্রথমটা অভ্যেসে গা ঘেঁষে শুতে গিয়ে দেখেছে প্রকাশ বড় খাটটার একদম কোণে চলে যায়। কাবেরীর ভয় হয়,কে জানে হয়ত ওর ছোঁয়া বাঁচাতে গিয়ে মানুষটা আবার পড়ে না যায় খাট থেকে। ভুলেও ওর গায়ে হাত রাখে না মানুষটা,তাই ঐ খাটে শোয়া দুজন মানুষের মধ্যে এখন কত যোজন দূরত্ব। অথচ একটু ছোঁয়া আর গন্ধ নেওয়ার মধ্যেই কাবেরী এখনও দেখতে পায় কত অসুখ মুছে দেওয়া সুখের ছবি। কম বয়েসে অনেক কিছু চেয়ে চিন্তে নিলেও এখন ঐ ছোঁয়াটুকু চাইতেও বড় আত্মসম্মানে লাগে কাবেরীর। প্রথমটা কাবেরী ভেবেছিল হয়ত গরমের তাপে গা ঘেঁষে শুতে অসুবিধা হয় প্রকাশের,বয়স তো বাড়ছে তাই সহ্যক্ষমতাও কমছে। শীতে দুজনে শোবে সেই একান্ত আরামের বড়সড় কম্বলের তলায়,তখন নিশ্চয় আবার তারা কাছাকাছি আসবে একটু ওম পেতে। কিন্তু মাঘের কনকনে শীতে এক কম্বলের তলাতে শুয়েও কাবেরী যেন বড় একা। কম্বলটাও যেন বিশাল বড় বলে তার মনে হয় আজকাল। এক কম্বলের তলায় শুয়েও যেন দুই আলাদা জগতে বাস করে ওরা। প্রকাশ ঘুমিয়ে পড়ে শোবার সাথে সাথেই,কাবেরীর মনে পড়ে কত কথা। ঘুম আসতে প্রায়ই দেরি হয়। আর সকালে মনে হয় যেন রাজ্যের ক্লান্তি তার শরীরে। ছেলেরা বড় হয়ে যে যার চাকরিতে চলে যাবার পর কাবেরীর যেন শূন্য বাসা,আর এখন মনে হয় সেই বাসাতে ভালোবাসাটুকুও আর বেঁচে নেই। নিত্য নৈমিত্তিক কাজ করতে করতে কাবেরী যেন একটা যন্ত্র হয়ে গেছে। কে জানে সবই হয়ত এই হেমন্তবেলার পাতা ঝড়ে যাওয়ার শূন্যতা....
আজ কাবেরী বাড়িতে একা,প্রকাশ বন্ধুদের সাথে একটা নেমন্তন্ন বাড়িতে গেছে। সেখানে সারাদিন থেকে ফিরবে রাতে। নিজের সাথে ইচ্ছেমত কাটানোর জন্য একটা পুরো দিন আজ কাবেরীর কাছে। কিছু ঘন্টা সে অনেক সময়েই একা থাকে তবে আজ পুরো দিন তার কাছে। কাজ অকাজের কিছু ঝাঁপি খুলে বসে কাবেরী,কত কাজ জমে আছে চারদিকে। আজকাল দুজনেই যেন শরীর ছেড়েছে আলস্যে,নাকি সংসার থেকে মন উঠেছে কে জানে? হয়ত বা খুব তাড়াতাড়িই মনে হয়েছে এত সব করে আর কী হবে?
শূন্য বাসা ভরা একরাশ শূন্যতা কাবেরীর ঘরে। অথচ সবই আছে,কোথাও কোন অভাব নেই। আলমারি খুলে বসে কাবেরী,কত জিনিস অবহেলায় পড়ে আছে। অথচ এই কাবেরী এক সময় পরিপাটি হয়ে থাকত প্রকাশের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। সব কাজ সামলেও বিকেলে গা ধুয়ে নিজেকে সাজাতো,মুগ্ধতা দেখতে ভালোবাসত প্রকাশের চোখে। রাতে আবার জামাকাপড় ছেড়ে হাল্কা নরম রাতের পোশাকে সাজাতো নিজেকে।
আলমারি গোছাতে গোছাতে হঠাৎই নজর পড়ে কাবেরীর এক কোণে রাখা পোশাকটার দিকে। হাতে নিয়ে হারিয়ে যায় কাবেরী..বছর পাঁচেক আগে দুই ছেলেই তখন বাইরে পড়ছে তখন ওরা বেড়াতে গেছিল। সেই সময় প্রকাশ ওকে এই রাতে শোয়ার পোশাকটা এনে দিয়েছিল নিউ মার্কেট থেকে..তারপর অনেকটা মিষ্টি সুবাসে ভরে গিয়েছিল বেড়ানোর দিনগুলো। পোশাকটা হাতে নিয়ে আনমনা হয়ে যায় কাবেরী,কেন যেন একবুক কষ্ট হয়,চোখটা ভিজে যায়। কী করেছে ও? প্রকাশ কেন এত অনুভূতিহীন হয়ে গেছে? নাকি বয়েসের সাথে সাথে ভোঁতা হয়ে যায় অনুভূতিরাও,তাদেরও বোধহয় বয়েস হয়। মানুষ তখন শুধু আত্মতৃপ্তিতেই সুখ অনুভব করে।
একদিন তবুও অনেকটা অভিমান নিয়ে প্রকাশকে বলেছিল,' তোমার কী হয়েছে? আজকাল কেন এত দূরে থাকো আমার ছোঁয়া বাঁচিয়ে? আমার কোন দোষ মানে আমি কিছু করেছি?'
' কী করবে? কিছু হয়নি। বয়েস হচ্ছে,সময়ের সাথে সাথে একঘেয়েমি আসছে জীবনে। ভালো লাগে না।'
-' কী ভালো লাগে না আমাকে?'
-' কী বলছ! আছি তো নাকি একসাথে?'
-' হ্যাঁ আছো,কিন্তু কেন যেন সব বদলে গেল খুব তাড়াতাড়ি...'
আর বেশি কিছু বলতে পারে না কাবেরী,কেমন যেন আত্মসম্মানে লাগে ভালোবাসা ভিক্ষা চাইতে। রান্নাঘরে চা বানানোর ফাঁকে দুএক ফোঁটা নোনা জল ঝরে পড়ে চোখ বেয়ে।
আনমনা কাবেরী আবার হাত দেয় পোশাকটাতে। মনে মনে ভাবে যত্নে কত কিছু তুলে রেখেছে প্রিয়জনের উপহার হিসেবে...সময় বড় স্বার্থপর তাই তুলে রাখা ভালোবাসার জিনিসও কখনও পোকায় কাটে আবার কখনও ফেঁসে যায়। আয়নাতে পোশাকটা পরে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে কাবেরী। এই মাত্র একটা দুটো বছরেই শরীরে কত পরিবর্তন এসেছে তার,তবুও ভাগ্যিস শরীরের বদলটুকু মানিয়ে নিয়ে পোশাকটা বেশ ফিট করেছে এখনও। এটা পরে ফেলবে আর রাখবে না তুলে।
আজ স্নান করতে খেতে অনেকটা বেলা হয়ে যায় কাবেরীর। নিজের জন্য তেমন কিছু করতেও ইচ্ছে করেনি,ঐ যা ছিল হয়ে গেছে। প্রকাশ পৌঁছে একবার ফোন করেছিল,তারপর আর করেনি। কাবেরীও বিরক্ত করেনি,থাক একঘেয়েমি থেকে একটু দূরে। কথাগুলো ভেবে আবার গলাটা আটকে যায় কাবেরীর। ওদের জীবন কী সত্যিই একঘেয়ে হয়ে গেছে?
প্রকাশ খেয়েদেয়েই ফিরেছে রাতে,এসে পরিস্কার হয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। ' আজ অনেকদিন বাদে বেশ কাটলো,সবাই এসেছিল। বেশ ভালো খাইয়েছে।'
কাবেরী বলে,' আমি তো ভাবলাম অনেকটা রাত হল,এখনও আসছ না..কে জানে রাতে আসবে কিনা?'
প্রকাশ ভুরু কোচকায়,' আসব না কেন? থাকার কথা তো ছিল না। তুমি খেয়ে নাও।'
প্রকাশ ফোনের মুখে চোখ রাখতে রাখতে বলে। কাবেরীর তেমন খেতে ইচ্ছে করে না। বিকেল থেকেই ঘাড় পিঠে একটা ব্যথা। আজ অনেক বেশি কাজ করে ফেলেছে তাই হয়ত হবে। রান্নাঘর গুছিয়ে কাবেরী বাথরুমে ঢোকে,ধুয়ে ফেলতে চায় শরীর আর মনের ক্লান্তি দিনের শেষে। তারপর নিজেকে জড়ায় সেই প্রিয় রাত পোশাকে। বাথরুম থেকে শোবার ঘরে এসে দেখে প্রকাশ ঘুমিয়ে পড়েছে,বুঝতে পারে সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখ বুজে গেছে।
ড্রেসিং টেবিলে বসে রাতের পরিচর্যা সারে কাবেরী,সবই অনিয়মে বাঁধা হয়েছে আজকাল। তবুও আজকাল নিজেকে যত্নে পরিচর্যা করে কাবেরী। কিন্তু আজ মুখটা ধুয়ে এসে বড় ক্লান্ত লাগলো,নাইট ক্রিমটাও মুখে মাখতে ইচ্ছে হল না। ড্রেসিং টেবিলে রাখা লম্বা ময়েশ্চারাইজারের বোতলের মাথায় চাপ দিয়ে কিছুটা ক্রিম নিয়ে কোনরকমে থুপথাপ করে মুখে মেখে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হল। হাত পা যেন চলছে না হয়ত অনেকটাই শরীর খারাপ আর কিছুটা মনের ভেতরে একটা চাপা কষ্টতে। প্রকাশ বলে বড় বেশি ইমোশনাল কাবেরী। মেয়েদের এই একটাই সমস্যা সবেতেই চোখে জল আসে। কষ্ট পেয়েছিল কাবেরী তারপর একটা সময় একটু একটু করে চেষ্টা করেছে জলটুকু বাষ্প করে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতে। কিন্তু চোখেও বোধহয় আছে এক কাঁচের জানলা। যে জানলা দিয়ে সব জল বাষ্প করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিছু জমে থাকে সেই কাঁচে তারপর কখনও রাতের অন্ধকারে নির্ঘুম দুই চোখ দিয়ে ঝরে পড়ে ভেজায় বালিশ। সকালে কেউ জানতে পারে না রাতের বৃষ্টির কথা।
বাইরে বৃষ্টি নেমেছে,আজ কাবেরীর ভীষণ গান শুনতে ইচ্ছে করছে হয়ত এই রাতের পোশাকে নিজেকে জড়িয়েই মনে উস্কে উঠছে পুরোনো স্মৃতি। সেই গানটা যে গানটা একদিন কোন এক ঝড় বৃষ্টির রাতে অনেক রাত পর্যন্ত দুজনে না ঘুমিয়ে শুনেছিল।
প্রকাশ ঘুমোচ্ছে,ও একবার ঘুমোলে আর তেমন কিছু টের পায় না তাই আস্তে করে গান চালিয়ে দেয়।
গান বাজতে থাকে...
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,পরাণসখা বন্ধু হে আমার।
আহ বড় ভালো লাগছে হঠাৎই মনটা। একটা গান অথচ কত মধুর স্মৃতিমাখা। সেই গান তেমনই আছে সাজানো কথামালায় শুধু মনটাই বোধহয় আর নেই। আসলে আমরা নিজেরা মরার আগেই মনগুলোকে মেরে ফেলি। একটা ব্যথার ওষুধ খেয়ে শরীরের ব্যথা একটু কমে। গান শেষ হয়েছে,ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে চায় এবার শরীর।
***************
পরদিন ভোর হয়,চড়ুইগুলো এসে বারান্দায় ঘোরাঘুরি করে। ছোট কাঠবেড়ালির ছানা কয়েকবার পাইপের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে গেছে খাবারের খোঁজে কিন্তু কাবেরীর ঘুম ভাঙে না। কলিংবেলটা বারবার বাজছে,বিরক্ত হয় প্রকাশ কাবেরী করছে কী? বোধহয় দুধওয়ালা এসেছে। উঃ একটু যে ঘুমোবে তার উপায় নেই। হঠাৎই নজর পড়ে কাবেরী তখনও বিছানায়। একটু বিরক্ত হয়েই দরজা খুলতে যায় প্রকাশ। তারপর এসে ডাকে,' কাবেরী ওঠো,অনেক বেলা হয়েছে।'
সাড়া না পেয়ে আবার ডাকে তারপর গায়ে হাত দেয়। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় প্রকাশের কতদিন বাদে সে কাবেরীর হাতটা ধরেছে! হয়ত বা কত মাস...নাকি বছর?
গায়ে হাত দিয়ে বোঝে কাবেরীর গা গরম,জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সাড়া দেয় না কাবেরী।
দিশাহারা লাগে প্রকাশের হঠাৎই যেন সবটা এলোমেলো হয়ে যায়। আজ চড়ুইরা খাবার পায়নি,কাঠবেড়ালির বিস্কুট খাওয়া হয়নি। গাছেদের যত্ন হয়নি। প্রকাশেরও সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। রাতের পোশাক পরা এলোমেলো কাবেরীকে কোনরকমে চেঞ্জ করাতে গিয়ে হঠাৎই নজর পড়েছিল পোশাকটাতে। কাবেরী এটা এখনও রেখে দিয়েছে!কাল রাতে ওর দিকে তাকিয়েও দেখা হয়নি,একটা দুটো কথা বলে শুয়ে পড়েছিল। ওর কী তখনি শরীর খারাপ ছিল? সারাদিন অনেক যুদ্ধের পর রাতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে প্রকাশ। টেবিলে ঢাকা দেওয়া রুটি তরকারি মনে হয় কাজের মেয়েটা করে গেছে। অন্যদিন এসময় টেবিলে খাবার দিয়ে ডেকে হেঁকে অস্থির করত কাবেরী। কখনও বা খুব রাগও করত খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে বলে। চেঁচিয়ে বলত,' রইল ঢাকা দেওয়া খাবার। আমাকে মানুষ বলে মনে করোনা। ডাকছি কানে নাও না,উত্তরও দাও না।'
আজ বাড়ি নিস্তব্ধ কেউ আর ডাকার নেই। কাল ছেলে আসবে,সেও খুব অস্থির হয়ে বারবারই ফোন করেছে। কাবেরী আইসিউতে,একবার চোখ খুলেছিল তারপর আবার চোখ বুজেছিল।
এলোমেলো বিছানায় গা এলাতে যায় প্রকাশ,আজও দুপুর থেকে ছিপছিপে বৃষ্টি। এখন আরও বেড়েছে,মনটা অদ্ভুত একটা শূন্যতায় ভরে ওঠে প্রকাশের। আজ বারবারই বিছানাটা অদ্ভুত বড় লাগে প্রকাশের। অথচ একটা সময় কত কাবেরীকে বলেছে একটু সরে শুতে হাত পা ছড়িয়ে শোবার জন্য।
হঠাৎই ফোন বেজে ওঠে। ওহ্ কাবেরীর ফোনটা বালিশের পাশেই রয়ে গেছে। ছেলেটা আবার ফোন করেছে। ফোন ধরতেই চিন্তিত গলায় বলে,' তোমার ফোন বন্ধ কেন?'
-' চার্জ চলে গেছিল। এই দিয়েছি চার্জে।'
-' আমি কাল চলে আসছি। তুমি খেয়েছো তো? ফোনটা অন করে নিয়ো,পাশে রেখো।'
কাবেরীর ফোনটা রাখতে গিয়ে স্ক্রীনে চোখ পড়ে প্রকাশের থেমে যাওয়া গানটার দিকে। রাতে গান শুনছিল কাবেরী? প্রকাশ হাত দিতেই ইউটিউব জেগে ওঠে আর বেজে ওঠে আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার....
বড় প্রিয় গান ছিল কাবেরীর,বিয়ের পরপর এমন ঝড়বৃষ্টির রাতে ওর বুকের কাছে শুয়ে কতবার শুনেছে। ফোনটা বন্ধ করে, নিজের ফোনটা অন করে ঘুমোতে যায় প্রকাশ। তারপর একটা সময় চোখ বুজে আসে ক্লান্তিতে। ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে প্রকাশ একটা চওড়া লাল মেঝের বারান্দায় পাশাপাশি দুটো চেয়ারে ওরা বসে আছে। রাতের অন্ধকার নেমেছে,আর বাইরে শ্রাবণের অঝোর ধারায় বৃষ্টি। কাবেরীর হাতটা প্রকাশের হাতে। কাবেরীর হঠাৎই বলে ওঠে,' কতদিন বাদে তোমার হাতে হাত রেখে বৃষ্টি দেখতে দেখতে এই গানটা শুনছি।'
কোন দূর থেকে একটানা এক শব্দ ভেসে আসে। কাবেরী হাতটা ছাড়তে ইচ্ছে করে না প্রকাশের। কতদিন বাদে হাতটা ধরেছে.... আবার শব্দ হচ্ছে ।
ঘুম ভেঙে যায় প্রকাশের ইশ্ ফোনটা বেজে কেটে গেল। ...এখনই ফোনটা বাজতে হল!
কী ভালো একটা স্বপ্ন দেখছিল। কাবেরী সুস্থ হয়ে এলে ওকে নিয়ে ঠিক শান্তিনিকেতনে যাবে। এভাবেই বসে গান শুনবে। কাবেরী একদিন বলছিল..
ফোনটা আবার বাজে...' হ্যালো,আপনি একবার চলে আসবেন হসপিটালে। পেশেন্ট হঠাৎ খারাপ হয়েছে।'
বুকটা হঠাৎই কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায় প্রকাশের স্বপ্ন আর বাস্তব সব মিলে মাথাটা গুলিয়ে যায়। ঘড়ির দিকে তাকায় প্রকাশ প্রায় পৌনে পাঁচটা বাজে।
Comments
Post a Comment