আমার পরিবারে আপনাকে স্বাগত জানাই...আমি আপনার পরিবারে এলাম,আপনিও আসবেন আমার পরিবারে। ইত্যাদি অনেক কথা আমরা প্রায়শই দেখে থাকি। সত্যিই কী এই নেটজগতের মানুষজন আমাদের পরিবার হতে পারে? আমাদের দুঃখ,ব্যথা কী তাদের সেভাবে ছুঁয়ে যায়? অথচ আমরা আমাদের রাগ আর মন খারাপের মুহূর্তে অনেক ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করে ফেলি সেখানে কখনও লাইভ করে,বা লিখে। পরিবারের মত আগলে রাখা,পরিবারের পাশে থাকা সহজ কথা নয়। বন্ধু সবাই হতে পারে না বা বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার মুরোদ সবার থাকে না। যে সময়টা আমরা আমাদের স্বামী,সন্তান,মা,বাবা,দাদা,দিদি,মামা,পিশি,কাকুকে দিতে পারি সে সময়টা এখনকার যুগে আমরা অপচয় করে ফেলি অন্য পরিবারের জন্য যাদের অনেকেই আমাদের অপরিচিত। একটা কথা জানবেন অপরিচিত অনেক মানুষের আমাদের জানার ইচ্ছে থাকে। যেই আপনাকে জানা বোঝা শেষ,কথাও শেষ।তবুও ঐ যে আমার লেখা কটা কথাই আবার বলতে হয়, প্রয়োজন শেষে যারা রয়ে গেল পাশে তারাই আসল প্রিয়জন। এমন প্রিয়জন আমারও কয়েকজন আছেন। আমার মা,বাবা নেই তবুও আমি আমার যাঁরা প্রিয়জন আছেন,যাদের স্নেহ পেয়েছি বড় হবার এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁদের খোঁজ খবর নিই যতটা পারি। হয়ত আমি অপ্রয়োজনীয় তাঁদের কাছে তবুও সম্পর্কের সুতোটাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচতে চেষ্টা করি। অনেক সময়ই কাজ করে কৃতজ্ঞতা বোধ কারণ আমি তাঁদের কাছে অনেক ঋণী। আমার অনেক দুঃসময়ে তাঁরা পাশে ছিলেন। নিজের সংসারে সন্তানদের,পুত্রবধূকে আগলে রাখতে চেষ্টা করি নিজের মত। তবে এই যাত্রাপথ কী খুবই মসৃণ? কোন মান অভিমানই কী নেই? নিশ্চয় আছে। কিন্তু তবুও আমি আমার আসল পরিবার যারা আমার সব উৎপাত সহ্য করে রয়ে গেছে সাথে তাদেরকেই গুরুত্ব দিই সবসময়। ভালোবাসি আমার পিতৃমাতৃস্থানীয় গুরুজনদের,এদের শরীর খারাপে উদ্বিগ্ন হই,চোখে জল আসে। হয়ত কিছু করতে পারি না তবুও প্রার্থনা করি সবাই ভালো থাকুন। ফেসবুকে আমার প্রোফাইল ওনলি ফ্রেন্ড করা,সবাইকে জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয় তবে লেখার সূত্রে যাদের পেয়েছি,আমি জানি তারা কেউ আমার কোন পোস্টে খারাপ কিছু লিখবেন না। কারণ কারও বিশ্রীভাবে আক্রমণ নেবার মত মানসিক জোর বা ক্ষমতা আমার নেই। ফেসবুক জুড়ে যেমনভাবে আক্রমণাত্মক কমেন্ট দেখি তাতে মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি আমার মুখপত্রিকার তালিকার মানুষজন ভালো।
আমি ছোট থেকে টুকটাক লেখালেখি করতাম,তবে সেটুকু আমারই ছিল। কোনদিন কোন কিছুতেই প্রচারের আলোয় আসতে ভালো লাগত না। তবুও লেখার সূত্রেই এই ফেসবুকই আমাকে পরিচিতি দিল,কিছু মানুষ আমার লেখাকে ভালোবাসলেন। আমি কয়েকটা জায়গায় লিখতাম,কিছুদিন লেখার পর আমি দেখলাম সবাই বলে গিভ মি মোর। অর্থাৎ ঘরে বাইরে কাজের জায়গা এমনকি লেখার জায়গাতেও সবাই আরও চায়। কিছুদিন দৌড়োলাম,রোজ লিখি রোজ পোস্ট করি,কেউ পড়েন..কেউ না পড়ে বাঃ,দারুণ লিখে চলে যান। কাউকে দেখি নিজের জীবনের গল্পকথা আমাকে ধরে লিখিয়ে নিয়েও অন্য লেখকের লেখায় কমেন্টে থাকেন। যে প্ল্যাটফর্মে আমার আসন হঠাৎই এক নম্বরে হয়েছিল রোজ লিখেও সেখান থেকে আমার ডিমোশন হল। আর মেটা মশায় তো মর্জিতে চলেন,কখনও লাইক বাড়ান কখনও কমান।
পরিবার আর নিজের রুজিরোজগার সামলে লেখা,তাই সময় ঐ রাতটাই সুতরাং রাত জেগে শরীর খারাপও হল,হাতে যন্ত্রণা বাড়লো। শুরু হল চোখের সমস্যা। ঘর পড়ে রইলো অগোছালো,কতদিন খোলা হল না শাড়ি জামাকাপড়ের আলমারি। ঠিক করলাম আর দৌড়বো না, আমি পিছোতে শুরু করলাম,ঠিক করলাম ঘরে বাইরে নিজের জায়গা করতে অনেক দৌড়েছি তাই এবার থামব। ইচ্ছে হলে লিখব,না হলে লিখব না। এবার নিজে এক কাপ চা নিয়ে বসে প্রকৃতি দেখব। ভোরবেলা স্কুলে যাবার পথে আবার সূর্যের রাঙা রঙ দেখব। ভিক্টোরিয়ার মাথায় আলোর লুকোচুরি দেখব। ফোনে হাত দেব না। নিজের যন্ত্রণা,কষ্ট অনেক জমে থাকা কথাকে মনের মধ্যে রাখতে শিখলাম। আমি আমার মত করে চেষ্টা করলাম ভালো থাকতে। সবটাই কন্টেন্ট না করতে। আমার একটা পেজ ছিল,বহুদিন সেখানে এলাম না। অনেক মাস বাদে একদিন বেড়াতে যাবার একটা ভিডিও দিলাম দেখলাম অনেক মানুষ দেখেছেন। তখন মনে হল ভিডিওগুলো থাক ফেসবুকে,আমার পেজেই তো রাখছি কেউ দেখলে দেখুন না দেখলে নয়। সেই তো মুছেই ফেলি,অবাক হলাম,ফলোয়ার্স বাড়লো দ্রুত। আরও অবাক হলাম দেখে রাত জেগে কষ্ট করে লিখে প্রচুর পাঠক পেলেও ফলোয়ার্স বাড়েনি। বুঝলাম ঐ জন্য লোকে ভিডিও পোস্ট করে,মানে এগুলো লোকে খায়। তবে আমি তেমন দক্ষ নই এ ব্যাপারে। ঐ জায়গাগুলো একজায়গায় করে গান বা ভাঙা গলায় বকবক ছাড়া এ ব্যাপারে তেমন স্কিল আমার নেই। কখনও মেটার খামখেয়ালে ফলোয়ার্স বাড়ে,কখনও কমে। তা নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। আসলে সেলেব হতে ভয় পাই,সাধারণ মানুষ হয়ে দেখতে আর জানতে ভালো লাগে। ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াই আর স্মৃতি সঞ্চয় করি। অবসর সময় পরিবারের সাথে কাটাই,পছন্দের কাজকর্ম করি। পায়ের অসুবিধার জন্য পায়ের ব্যায়াম করি..ছেলেমেয়েদের ভালোবাসি,কখনও ঝগড়াও করি। বরের বাজার করে আনা জিনিসপত্র আর সংসার গুছোই কোমর বেঁধে। রাগ অভিমানও করি,রান্না করি পছন্দের। বন্ধুর সাথে হেথা হোথা বেড়াতে যাই,সেখানে একটা লাউডগা বা কুমড়োফুল দেখেও খুশি হই। অসম বয়েসী কোন দাদা,দিদির সাথে বেড়াতে গিয়ে জমিয়ে গল্প করি,কখনও বা শুধুই শুনি। তাতেও মেলে অনাবিল আনন্দ।
পরপর দুদিন দুটো আত্মহত্যা আবার মনকে নাড়া দিল খুব। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক পুরুষ পরিচালক আর একজন কমবয়েসী মহিলা কন্টেন্ট ক্রিয়টর। একজন হয়ত খ্যাতির শীর্ষে উঠে তারকা পরিবেস্টিত হয়ে পরিবার ছেড়েছিলেন তারপর ধীরে ধীরে কমেছে সেই খ্যাতির জ্যোতি। একলা হয়েছেন,যারা খোঁজ খবর নিতেন তাঁরা আর নেন না। আসলে আমরা ফ্লপ হয়ে যাই একটা সময়,সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যারা তোলে তারাই মই কেড়ে নেয়। আর তখনই আসে একাকীত্ব,আমরা একা হয়ে গেলে মাকে খুঁজে বেড়াই। আমার মত অনেকের জীবনেই মা তখন তারা হয়ে গেছেন,কখনও বা মায়ের মান অভিমান আর সেন্টিমেন্টে পাত্তা দেওয়ার সময়ও আমাদের থাকে না যখন আমরা উড়তে শিখি। কিন্তু ডানার জোর হারানোর সময় বড় মনে পড়ে মায়ের কথা বা প্রিয়জনের কথা যার কাছে দিনের শেষে মিলত আশ্রয়। কি জানি কী হয়েছিল? আমার মনে হয়েছে শুধু একাকীত্ব আর শূন্যতা,জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত একটা মানুষের আর যাবার কোন জায়গা ছিল না তাই এমন হয়েছে।
মনে রাখতে হবে সব পরিবারের মানুষজন আপন হয় না,সেটা আশা করাও অন্যায়। আজ আমার মন খারাপ বলে একটা পোস্ট দিলেন,অনেকে আহা উহু করলেও সমাধান কিছু হবে না। এমন আশাও করা উচিত নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা পাচ্ছেন মুঠোতে রাখুন তবে সোশ্যাল মিডিয়ার চক্করে নিজের চারপাশের মানুষজনকে দূরে ঠেলবেন না। যারা খ্যাতির শীর্ষে আছেন তাঁদের আলো দেখে অনেকেই ছুটে আসবেন আলেয়ার মত,সেই আলো কিন্তু ক্ষণিকের। নিজের একটা জায়গা রাখা খুব দরকার,সেটা আপনাকেই বুঝতে হবে নিজের বন্ধু হয়ে। একটা দুটো ভালো বন্ধু থাকা খুব দরকার। যেখানে থাকবে না কোন ইগো বা বড় ছোট হওয়ার খেলা। যেখানে কাঁদা যাবে,হো হো করে হাসা যাবে,আপনার দুঃখের পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে না গল্পের আকারে অন্য কারও কাছে। আর দরকার খুব নিজেকে ভালোবাসার আর চেনার,আপনার আইডেন্টিটি আপনি নিজে। কে আপনাকে বডি শেমিং করল বা খারাপ বললো তাতে কী এসে যায়?সাফল্যের আনন্দ যেমন উপভোগ করতে হয় ঠিক তেমনি বুক বাঁধতে হবে ব্যর্থতার দুঃখটুকু সইবার জন্যও। আর আমাদের চারপাশের মানুষদের প্রতিও আবেদন জানাবো,সমালোচনা হোক তবে তা যেন এমন না হয় যা বিষাক্ত এবং তীব্র বিষতুল্য।
যৌবনের সৌন্দর্য একদিন ঢলে পরবেই,কোন মেকআপ তাকে ঢাকতে পারবে না। তাই মনকে প্রস্তুত রাখতে হবে জরা,ব্যাধি ও মৃত্যুর জন্যও। মৃত্যুকে হঠাৎই ডেকে আনার চেয়ে তাকে আসতে দিন নিজের মত করে।
Comments
Post a Comment